হাকিম সাহেবও নাকি সিআইডির উপর রাগ করেছে কয়েকবার। আজ যখন কোর্টে নিয়ে বলেছে, আজ মামলা হবে না, একরারী কোর্টে আসে নাইতখনই এরা প্রতিবাদ করে বলেছে, আমাদের এখানেই রেখে দিন আমরা আর জেলে যাবো না। আর যায় কোথা ! গ্যাস পার্টি এনে এরা কোর্টে যেখানে জালের বেড়ার মধ্যে ছিল সেখানে টিয়ার গ্যাস ছেড়ে দিল। কোনো দয়া মায়া নাই। বাকি মানুষ পালাবার পথ পায় নাই। অনেকে চক্ষু মেলতেই পারে না। অনেকে বমি করতে করতে বেহুশ হয়ে গেছে। ছয় জনের অবস্থা নাকি খারাপ। জেল হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ইনসাফ কি এদেশ থেকে একেবারেই উঠে গেল? যাহার যাহা ইচ্ছা তাহাই করে। কিছু কিছু কর্মচারী এতো বেড়ে গেছে, মনে করে, যা ইচ্ছা করতে পারে। শুধু লাট সাহেবকে খুশি রাখতে হবে। ফলাফল যে শুভ হবে না সে বুঝি! তবে পাকিস্তানকে এরা কোথায় নিয়ে চলেছে! ভাবলাম সাত-আট বত্সর যদি একটা মামলা চলে তারপরে যদি শাস্তি হয় তবে অবস্থা কি হয়! ভুগতেই হবে তোমাদের। তোমরা যে স্বাধীন দেশের নাগরিক’! ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান তোমাদের রাষ্ট্র! ভুগতেই হবে তোমাদের দেশের খাতিরে। ইহকালে কষ্ট করলে কি হবে, পরকালে অনেক কিছু পাবা। হুরপরি, চিন্তা নাই।
মুড়ি খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছে কারাগারে। কাঁচা মরিচ, পিঁয়াজ, আদা আর সরিষার তৈল দিয়ে একবার মাখালে যে কি মজা তাহা আমি তো প্রকাশ করতে পারি না। আমার না খেলে চলে না। সিপাহি জমাদার সাহেবরা যাদের ডিউটি পড়ে তারা মেটকে বলে চুপি চুপি মুড়ি খেয়ে নেয়। যদি বড় সাহেবরা দেখে! আমি দেখেও দেখি না, কারণ মেটকে বলে দিয়েছি মুড়ি চাইলে ‘না’ বলবা না।
আমি মুড়ি খেতে বসলেই আমার নেতা শহীদ সাহেবের কথা মনে পড়ে। আজ তুমি কোথায়? তোমার মানিক মিয়া, মুজিব ও কর্মীরা কারাগারে বন্দি, অন্যায়ভাবে জুলুম চলছে চারিদিকে, হাহাকার করছে দেশের লোকেরা। তোমার হাতে গড়া ইত্তেফাক আজ বন্ধ। পাকিস্তান আজ এতিম। জানি তোমার দোয়া আছে আমাদের উপরে। জয় জনগণের হবে, কিন্তু জনগণ তোমার সেবা পাবে না।
১৭ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ রবিবার
বাদলা ঘাসগুলি আমার দুর্বার বাগানটা নষ্ট করে দিতেছে। কত যে তুলে টী আবার কয়েকজন কয়েদি নিয়ে বাদলা ঘাস ধ্বংসের অভিযান শুরু করলাম। অনেক তুললাম আজ। কয়েদিরা আজ তাদের কাপড় পরিষ্কার করবে। বেশি সময় রাখা যায় না, তাই তারা চলে গেল। আমি কিছু সময় আরও কাজ করলাম ফুলের বাগানে। তারপর পাইপ নিয়ে বই নিয়ে বসে পড়লাম। ভুড়ি হতে চলেছে আমার বসে থাকতে থাকতে। ভীষণ খারাপ লাগে ভুঁড়ি হলে। ব্যায়াম করবার উপায় নাই, হাঁটুতে বেদনা। বিকালে হাঁটাচলা করি, একলা কত সময় হাঁটা যায়! ভাল লাগে না, তাই আবার চুপ করে বসে থাকি।
খবর এল আওয়ামী লীগের আর এক নেতাকে নিয়ে এসেছে ধরে। বলল, জালাল সাহেব। বুঝতে বাকি রইল না মোল্লা জালালউদ্দিন, এডভোকেট। ঢাকার প্রায় সকলকেই আনা হয়েছে, জালালই প্রতিষ্ঠানের একটিং সেক্রেটারীর ভার নিবে। ওকেই সেক্রেটারী করার কথা আমি বলেছিলাম। অফিসটা বোধ হয় বন্ধ করতেই চায়। কেই বা চালাবে, সকলকেই তো গ্রেপ্তার করেছে। কয়েকজন তো এবড়ো হয়ে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হতে পারবেন না। কর্মীদের অবস্থা কি হবে, কে চালাবে! টাকা কোথায় পাবে?
সরকার পিছন দরজা দিয়ে বন্ধ করতে চায়। লাভ হবে না। সকলকে এক সাথে আনছে না, এক একজন করে নিয়ে আসছে। সব কয়জন সেক্রেটারীকে নিয়ে এসেছে, এখন একমাত্র মহিলা সম্পাদিকা আমেনা বেগম আছে।
জেলখাটা ও কষ্টকরা শিখতে দেও, এতে কর্মীদের মধ্যে ত্যাগের প্রেরণা জাগবে। ত্যাগই তো দরকার। ত্যাগের ভিতর দিয়েই জনগণের মুক্তি আসবে। জালালকে ১০ সেলে রাখা হয়েছে। দেখা হবার উপায় নাই আমার সাথে। এখন আর আমাকে আঘাত করতে পারে না। চঞ্চলও আমি হই না। আমার কতগুলি বইপত্র আই বি Withheld করেছে। আমাকে খবর দিয়েছে Reader’s Digest, টাইমস, নিউজউইক এবং রাশিয়ার চিঠি’, কোনো বইই পড়তে দিবে না। পূর্বেও দেয় নাই। নভেল পড়তে দেয়। প্রেমের গল্প যত পার পড়ো। একজন রাজনীতিক এগুলি পড়ে সময় নষ্ট করে কি করে! কত অধঃপতন হয়েছে আমাদের কিছুসংখ্যক সরকারি কর্মচারীর। রাজনীতির গন্ধ যে বইতে আছে তার কোনো বই-ই জেলে আসতে দিবে না। জ্ঞান অর্জন করতে পারব না, কারণ আমাদের যারা শাসন করে তারা সকলেই মহাজ্ঞানী ও গুণী!
আজ আমি বাবুর্চিগিরি করেছি। কলিজা দিয়েছিল, পাকাতে হবে। আমি ও বাবুর্চি দুইজনই প্রায় সমান। কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান। তবু ধারণা করে নিয়ে পাকালাম, মনে হলো মন্দ হয় নাই। খাইলাম কিছুটা।
এক একটা মূল্যবান দিন চলে যেতেছে জীবনের। কোনো কাজেই লাগছে না। কারাগারে বসে দিনগুলি কাটাইয়া দিতেছি।
১৮ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ সোমবার
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ প্রায় সকলেই কারাগারে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হতেছে। নরসিংদী আওয়ামী লীগের দুইজন কর্মীকেও গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে। কাহাকেও আর বাইরে রাখবে না। তবুও দেখে আনন্দই হলো যে, ২৩ তারিখে ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করেছে। কাজ করে যেতে হবে। ৬ দফা দাবির সাথে কোনো আপোষ হবে না। আমাদেরও রাজনীতির এই শেষ। কোনো কিছুই আওয়ামী লীগ কর্মীরা চায় না। তারা শুধু চায় জনগণ তাদের অধিকার আদায় করুক।
