রাশিয়া উত্তর ভিয়েতনাম সরকারকে সামরিক সাহায্য প্রেরণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাশিয়া পূর্ব থেকেই অনেক সাহায্য দিয়াছে। আমেরিকানরা যতই নিজকে শক্তিশালী মনে করুন, রাশিয়া যখন হ্যানয় সরকারকে সাহায্য করতে আরম্ভ করেছে তখন যুদ্ধে জয়লাভ কখনই করতে পারবে না। এর পরিণতিও ভয়াবহ হবে। একমাত্র সমাধান হলো তাদের ভিয়েতনাম থেকে চলে আসা। ভিয়েতনামের জনসাধারণ নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নিবে।
২৫শে আগস্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা হতে জনাব শোয়েব বিদায় গ্রহণ করে বিশ্বব্যাংকের চাকরি গ্রহণ করবেন। শেষ পর্যন্ত শোয়েব সাহেবকেও যেতে হলো। ভুট্টো সাহেবকে তাড়ানোয় চীনা লবীর লোকেরা খুব অসন্তুষ্ট হয়েছেন। নিশ্চয়ই আমেরিকানদের চাপে তাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। শোয়েব সাহেবকে তাড়াইয়া দেখালেন যে আমেরিকানদেরও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ধার ধারেন না। তাই আমেরিকা লবীর নেতা শোয়েবকেও তাড়াইলেন। এটা শোয়েবের সাথে পরামর্শ করেই করা হয়েছে বলে মনে হয়—জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। তাকে জায়গা মতোই পাঠান হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা। মনে হয় চাকরী পাকাপাকিই ছিল। আমেরিকানদের দালালি করেছেন মন প্রাণ দিয়ে। পাকিস্তানকে বন্ধক দিয়েছেন তার একটু প্রতিদান তো জনাব শোয়েব পাবেনই!
সকালেই খবর পেলাম চটকল শ্রমিক ফেডারেশন সেক্রেটারি জনাব মান্নান জামিন পেয়েছে। আজই চলে যাবে, আমার সামনেই বিশ সেলে ছিল, সাধারণ কয়েদি করে রাখা হয়েছিল। রাতে ও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতো। শুনতাম রাতভর জেগে বসে থাকত। ডিপিআর অস্ত্র নিক্ষেপ করে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখতেও পারতো। যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত যেতে দিয়েছে। এত কষ্ট করার পরও মান্নানের মুখে হাসি দেখেছি। মোটেই ভয় পায় নাই। তার উপর আমার বিশ্বাস আছে-শ্রমিকদের স্বার্থ বিসর্জন সে দিবে না, তথাকথিত শ্রমিক নেতাদের মতো।
আজ বিকালে পাবনার রামললিতকে ঢাকা জেল থেকে অন্যত্র পাঠাইয়া দিয়েছে।
বিকালে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। আমি বারান্দায়ই পায়চারী করতেছিলাম। বৃষ্টি কিছু কম হয়েছে, দেখা গেল রণেশ বাবু যেতেছেন। তাকে আদাব করে বিদায় দিলাম, আর বললাম, যদি পাবনা জেলে যান তবে বন্ধু মোশতাককে বলবেন, চিন্তা না করতে। আমাদের ত্যাগ বৃথা যাবে না।
জমাদার সাহেব তালাবন্ধ করতে এলেন। বৃষ্টির দিন তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিয়ে বিদায় হলেন।
১৪ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার
১৭৮৯ সালের ১২ই জুলাই ফরাসি দেশে শুরু হয় বিপ্লব। প্যারি নগরীর জনসাধারণ সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার পতাকা হাতে সামনে এগিয়ে যায় এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করে। ১৪ই জুলাই বাস্তিল কারাগার ভেঙ্গে রাজবন্দিদের মুক্ত করে এবং রাজতন্ত্র ধ্বংস করে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৭ বৎসর পরেও এই দিনটি শুধু ফ্রান্সের জনসাধারণই শ্রদ্ধার সাথে উদযাপন করে না, দুনিয়ার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী জনসাধারণও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
তাই কারাগারের এই নির্জন কুঠিতে বসে আমি সালাম জানাই সেই আত্মত্যাগী বিপ্লবীদের, যারা প্যারি শহরে গণতন্ত্রের পতাকা উড়িয়েছিলেন। ভবিষ্যৎ দুনিয়ার মুক্তিকামী জনসাধারণ এই দিনটার কথা কোনোদিনই ভুলতে পারে না।
গতকাল পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্টের পূর্ণ বেঞ্চ পাকিস্তান দেশরক্ষা বিধি বলে অনেক ব্যক্তির ২২টা রীট আবেদন বাতিল করে দেন।
দেশরক্ষা বিধি বলে নিম্নলিখিত নেতৃবৃন্দকে আটক রাখা হয়েছে। কতকাল এদের রাখবে কে জানে?
১। মিয়া মানজার বশীর, ২। খাজা সিদ্দিকুল হাসান, ৩। চৌধুরী কলিমুদ্দিন, ৪। মহম্মদ ইসমাইল, ৫। সিকান্দার হায়াত, ৬। সরদার মহম্মদ জাফরুল্লা, ৭। নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ, ৮। মালিক গোলাম জিলানী, ৯। খাজা মহম্মদ রফিক, ১০। সরদার শওকত হায়াৎ, ১১। খাজা আহম্মদ সাফদার, ১২। চৌধুরী মহম্মদ হোসেন, ১৩। আবু সাঈদ এনতার, ১৪। সৈয়দ মকসুদ, ১৫। জনাব আবদুল আজিজ, ১৬। খলিফা শাহনেওয়াজ, ১৭। মাহবুব মোস্তফা, ১৮। কমর ইদরিস, ১৯। সালাউদ্দিন শেখ, ২০। হেলাল আহম্মদ শেখ এবং ২১। মাহমুদ আহমেদ সিন্ধী।
আজ ঢাকা জেলের ডিআইজি সাহেব কয়েদিদের দেখতে ভিতরে এসেছিলেন। আমাকেও দেখতে এসেছিলেন, কিছু সময় বসেছিলেনও। ধর্মকথা আলোচনা করলেন। বললাম, ইসলামের কথা আলোচনা করে কি লাভ? পাকিস্তানের নাম তো ইসলামিক রিপাবলিক রাখা হয়েছে। দেখুন না ‘ইসলামের’ আদর্শ চারিদিকে কায়েমের ধাক্কায় ঘুষ, অত্যাচার, জুলুম, বেঈনসাফি, মিথ্যাচার, শোষণ এমনভাবে বেড়ে চলেছে যে যারা আল্লায় বিশ্বাস করে না, তারাও নিশ্চয়ই হাসবে আমাদের অবস্থা দেখে। দেখুন না রাশিয়ায় যেখানে ধর্ম বিশ্বাস করে না সেখানে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেষ্টা করছে, ঘুষ, শোষণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মানুষের বাঁচবার অধিকার স্বীকার করেছে।
গ্রেট বৃটেনে দেখুন, ন্যায়ের রাজ্য কায়েম করেছে। বেকার থাকলে সরকার থেকে ভাতা দেওয়া হয়-যে পর্যন্ত কাজের বন্দোবস্ত না করতে পারে। বৃদ্ধ অথবা অচল হয়ে পড়লেও পেনশন দেওয়া হয়। চিকিৎসার এবং ঔষধের জন্য এক পয়সাও খরচ করতে হয় না। বাচ্চা হলে দুধ খাওয়ার জন্য সরকার অর্থ দিয়ে সাহায্য করে, যাতে শিশু দুর্বল হয়ে না পড়ে। অন্যায়ভাবে কাহাকেও কারাগারে বন্দি করতে পারে না।
