দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বোধ হয় দুই তিন মিনিট হবে। এক জেলে থেকেও আমরা রাজনৈতিক বন্দি বলে একে অন্যের সাথে দেখা বা কথা বলতে পারি না। আমার সাথে তো কাহাকেও কথা বলতে দেয় না।
খবরের কাগজ এসেছে অনেক বেলায়। কোনো সংবাদই নাই। তবে আতাউর রহমান সাহেবের একটি বিবৃতি আছে খাদ্য সমস্যার উপর মোনায়েম খাঁ সাহেব সরকারি প্রেস নোটের প্রতিবাদ করে। ঘরে বসে বিবৃতি দিয়ে চাউলের দাম কমানো যায় না। সক্রিয় কর্মপন্থা দরকার। সে সাহস জনাবদের নাই। বিবৃতি ও বক্তৃতা দিয়েই নেতা হয়ে থাকতে চান আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ।
১২ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ মঙ্গলবার
ভালই লাগে না, কি যে করব বুঝে উঠতে পারি না। মাথা ব্যথাটা এখন অনেক কমেছে। খবরের কাগজে পড়বার মতো কিছু থাকে না। একঘেয়ে। সংবাদ। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব কি বললেন, কি করবেন, কোথায় গেলেন, কার সাথে দেখা করলেন, দেশের উন্নতি, অগ্রগতি, গুদাম ভরা খাদ্য, অভাব নাই, বিরাট বিরাট প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে, কাজ শুরু হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছু তথাকথিত মুসলিম লীগের নেতারা এক ঈমান, এক রাষ্ট্র, এক মুসলমান, এক দেশ, এক নেতা বলে সর্বক্ষণ গলা ফাটাচ্ছে। আবার কেহ কেহ বাঙালি মুসলমানদের পাকিস্তানের উপর আনুগত্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কেহ কেহ মুরব্বিয়ানাচালে দেশপ্রেমিকের সার্টিফিকেটও দিয়ে থাকেন। দুনিয়ায় নাকি পাকিস্তানের সম্মান এতো বেড়ে গেছে যে আসমান প্রায় ধরে ফেলেছে। নানা বেহুদা প্রশংসা, তবুও তাই পড়তে হবে। সময় যে কাটে না। ডন কাগজও দেখলাম, যদি পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো ভাল খবর পাওয়া যায় নাই! ঐ একই প্যামফ্রেট। আমার তো মনে হয় সরকার বিরাট প্ল্যান নিয়ে চলেছে। শেষ পর্যন্ত দেশে একদলীয় সরকার করতে চেষ্টা করবে। ভুল হবে এ চেষ্টা করলে। ভীষণ আত্মকলহ ও বিশৃঙ্খলা শুরু হবে কেহ তা দমাতে পারবে না। আমাদের মতো রাজনীতিবিদরা অনেকে পিছনে পড়ে থাকবে। কারণ তালে তাল মিলায়ে চলতে পারবে না।
দুপুরে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। কারণ মাথার ব্যথা যেন আর না হয়। একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আধা ঘণ্টার উপর হবে। উঠে আবার কাগজ নিয়ে পড়তে পড়তে সিকিউরিটি সিপাই এসে বলল, আপনার সাক্ষাৎ আছে, চলুন। বললাম, কে এসেছে। বলতে পারে না। ভাবলাম উকিল সাহেবরা এসেছেন। এডভোকেট রব সাহেব ও আবুল হোসেন সাহেব এসেছেন। তাঁদের সাথে আলাপ করতে করতে দেখি আরেকটা সাক্ষাৎ দিয়েছে আমার বেগমের সাথে। রব সাহেবকে বললাম, হাইকোর্টে রীট পিটিশন করতে- কেন মোশতাক, তাজউদ্দীন, নূরুল ইসলাম ও অন্যান্য নেতাদের মফস্বল জেলে আলাদা আলাদা করে রেখেছে? আর আমাকে কোন আইনের বলে Solitary confinement-এ রাখা হয়েছে! জেল আইনে দু’ মাসের বেশি কাউকেও রাখতে পারে না। একাকী এক জায়গায় রাখা উচিত না। রব সাহেব আইন দেখে রীট পিটিশন করবেন বললেন। তারপরই আমার বেগম ও বাচ্চারা এল। হঠাৎ দেখা পাওয়ার অনুমতি পেল কি করে! রব সাহেব চলে গেলেন। আমি কিছু সময় বাচ্চাদের সাথে আলাপ করলাম। মাকে আব্বা খুলনা থেকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন। অনেকটা ভাল এখন, তবে আপাততঃ ঢাকা আসবে না। রেণু বলল, কামাল খুব লেখাপড়া আরম্ভ করেছে। আগামীবারে ম্যাট্রিক দিবে। সকলকে মন দিয়ে পড়তে বলে বিদায় নিলাম। বেশি সময় কথা বলার উপায় নাই- ছোট্ট কামরা জেল অফিসের, বিজলি পাখা বন্ধ। ছোট্ট বাচ্চাটা গরমে কষ্ট পাচ্ছে। ছোট মেয়েটা স্কুল থেকে এসেছে। বিদায় নিয়ে রওয়ানা হলে গেটে দাঁড়াইয়া ওদের বিদায় দিলাম। গেট পার হয়েও রাসেল হাত তুলে আমার কাছ থেকে বিদায় নিল। বোধ হয় বুঝে গিয়েছে এটা ওর বাবার বাড়ি, জীবনভর এখানেই থাকবে!
অনেক খাবার নিয়ে এসেছিল। সন্ধ্যায় কিছু কিছু বন্ধু-বান্ধবদের দিলাম। আবার রাতেও খাবার সময় আশে পাশে কিছু দিলাম, কারণ নষ্ট হয়ে যাবে।
রাতে আমার আব্বাকে স্বপ্নে দেখে জেগে উঠলাম। আব্বার চেহারা মলিন হয়ে গেছে বলে মনে হলো। ভোর রাতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আবারও স্বপ্নে দেখি নবাবজাদা নছরুল্লাহ খানকে। অনেক বুড়া হয়ে গেছেন, দাড়ি পেকে গেছে। আর কিছুই আমার মনে নাই। উঠতে অনেক দেরি হলো ঘুম থেকে।
১৩ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ বুধবার
একই সমস্যা একই সমাধান, গুলি করা। ভারতবর্ষে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাইয়া আটজনকে হত্যা করেছে। কয়েকশত লোক গ্রেপ্তার হয়েছে। জনসাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বামপন্থী দলগুলির ডাকে প্রতিবাদ দিবস পালন করতে যেয়ে গুলি খেয়ে জীবন দিল। শত শত কর্মী গ্রেপ্তার হলো। কংগ্রেস নেতারা সারাজীবন জেল খেটেছিলেন। গুলির আঘাত নিজেরাও সহ্য করেছেন। আজ স্বাধীনতা পাওয়ার পরে তারাই আবার জনগণের উপর গুলি করতে একটুও কার্পণ্য করেন না। আমরা দুইটা রাষ্ট্র পাশাপাশি। অত্যাচার আর গুলি করতে কেহ কাহারও চেয়ে কম নয়। গুলি করে গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না। ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা স্থায়ী শান্তি চুক্তি করে নেওয়া। তখন পাকিস্তান ও ভারত সামরিক খাতে অর্থ ব্যয় না করে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অর্থ ব্যয় করতে পারত। দুই দেশের জনগণও উপকৃত হত। ভারত যখন গণতন্ত্রের পূজারি বলে নিজকে মনে করে তখন কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিতে কেন আপত্তি করছে? এতে একদিন দুইটি দেশই এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে বাধ্য হবে।
