আজ সকাল থেকে আমি দূর্বা ঘাস কাটায় নেমে যাই। ঘাস কাটা মেশিন আনা হয়েছে। নতুন ঘাস কাটতে অসুবিধা হয়। আমি তদারক করতে থাকি আর কয়েদিরা কেটে চলেছে। ঝাড়ুদারদের দিয়ে পরিষ্কার করাই। আজ দিনটা কাজের মধ্যে থেকে ভালই লাগছিল। দুপুরে কাগজ পড়ে, আবার বিকালেও এই একই কাজ করে, একটা বাগান সুন্দর করে কেটে তৈরি করেছি। এর পরে যখন ঘাসটা আবার উঠবে তখন আরো সুন্দর হবে।
১০ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ রবিবার
আমি যেখানে থাকি তার সাথেই নূতন বিশ সেলের ২ নম্বর ব্লক। রবিবার ছুটির দিন গানের জলসা বসেছে। নূরু ভালই গান গায়।
আমি আরাম কেদারায় বারান্দার পাশে আরামে বসলাম, গান শুনব বলে। জেলের ভিতর আর একজন কয়েদি আছে, নাম বেলাল। ঢাকা শহরেই বাড়ি, ভাল গজল ও কাওয়ালি গান গায়। সে ফুলের বাগানের পাহারা, আমার বাগানে আজ কাজ করতে আসবে। ৯ টায় এসে সেও হাজির হয়। তার কাছ থেকেও কাওয়ালি শুনলাম কয়েকটা। এদের তবলা হলো এ্যালমুনিয়ামের থালা। থালা বাজাইয়া গান করে। বেলালের গলাটা একটু খারাপ হয়েছে কাওয়ালি গাইতে গাইতে। তার সুযোগ আছে, সব জায়গায় যাইতে পারে। তাই যেখানে যায় সিপাহি জমাদাররা ওকে ধরে কাওয়ালি শোনে। নূরুর বাংলা গান শুনলাম। খুবই সুন্দর গলা। তালও ঠিক আছে। ভাবলাম হতভাগাটা জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে। জেলে পড়ে নানারকম অত্যাচার সহ্য করে আর জেলের খাওয়া খেয়েও গলাটাকে এখনও কিছুটা ঠিক রেখেছে। ধন্যবাদ দিতে হয়। গাইতে কষ্ট হয় বুঝতে পারি। শক্তি না থাকলে গান আসবে কোথা থেকে? তবুও বড় ভাল লাগল ওর গান শুনে। বিশেষ করে পল্লীগীতি ও চমৎকার গায়।
বেলাল বলে গেল, “স্যার কেবল ‘পাহারা’ হয়েছি। আপনার কাছে এসে কাওয়ালি গেয়েছি শুনলে কি আর রক্ষা আছে?” আমি ওকে রক্ষা করতে পারি? আমিও তো ওর চেয়েও সাংঘাতিক কয়েদি! কেউ আমার সাথে কথা বলতে বা মিশতে পারবে না। একদম সরকারের হুকুম। বাগানে কাজ করতে এসেছিল তাই বোধ হয় একটু সুযোগ পেলাম ওর কাওয়ালি শুনতে।
আইয়ুব সাহেবের সরকারের শুভ সংবাদ, দেশের জন্য শুভ কিনা, বলা কষ্টকর। কনসর্টিয়াম ১৯৬৬-৬৭ সালে পাকিস্তানকে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মনে রাখা দরকার, এই ডলার সবই ঋণ নেওয়া হলো। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের কপালে কি আছে আমরা জানি না, তবে সুদ সহ টাকা পূর্ব পাকিস্তানকেই বেশি ফেরত দিতে হবে।
ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্তশাসন শেষ হয়ে গেল। ভবিষ্যতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ডান্ডা চালাইতে সক্ষম হইবেন। অবস্থা যে কি হবে! বোধ হয় শিক্ষিত সমাজ একটু ঘাবড়াইয়া গিয়াছেন। ভয় নাই, কলম ফেলে দিন। লাঠি, ছোরা চালান শিখুন। আর কিছু তেল কিনুন রাতে ও দিনে যখনই দরকার হবে নিয়ে হাজির হবেন। লেখাপড়ার দরকার নাই। প্রমোশন পাবেন, তারপরে মন্ত্রী হতেও পারবেন।
শুধু ভাবি, ব্যাপারটা কি হলো? কোথায় যেতেছি।
৩.২ ১১ই জুলাই-২০শে জুলাই ১৯৬৬
সকাল থেকেই মাথা ভার হয়ে আছে, ঠিক হয়ে বসতেই পারছি না। এই অবস্থায় অনেক সময় কাটাইয়া দিলাম বারান্দায়। ইজিচেয়ারে বসে চোখ বুজে পড়ে রইলাম। কিছু খেতেও ইচ্ছা করছে না। প্রায় ১১টার সময় ডাক্তার সাহেব এলেন, বললাম আমার অবস্থা। তিনি বললেন রক্তচাপটা দেখতে হবে। রক্তচাপ আমার নাই (ব্লাড প্রেসার যাকে বলা হয়)। কোনোদিন তো ছিল না। দেখা যাক কি হয়! এই খুঁতখুঁতে ব্যারাম বেশি কষ্ট দেয়। যদি কিছু একটা হয় ভালভাবে হয়েই শেষ হয়ে যাওয়াই উচিত। চোখ বুজে থাকলে ভাল লাগে। মেট বার বার তাগিদ দিতেছে কিছু খাবার জন্য। সকালে তো কিছু খেয়েছি, আবার কি? হঠাৎ মেজাজটা খারাপ করে ফেললাম। পরে দুঃখিত হলাম। বললাম, ভাল লাগে না কিছুই খেতে। আমার বেগমের দৌলতে কোনো জিনিসের তো আর অভাব নাই। বিস্কুট, হরলিকস, আম, এমন কি মোরব্বা পর্যন্ত তিনি পাঠান। নিজে আমি বেশি কিছু খাই না, কারণ ইচ্ছা হয় না। আবার ভয়ও হয় যদি পেট খারাপ হয়ে পড়ে। আবারও একদিন রক্ত পড়েছে। পাইলস ভাল হয়ে গিয়াছিল, আবার হলো। উপায় তো নাই। আমি একলাই শুধু ভুগি না কয়েদিরা প্রত্যেকই কোনো না কোনো ব্যারামে ভোগে। বিশেষ করে রাজবন্দিরা, কারণ এদের তো কোনো কাজ নাই। খাও শুয়ে থাক আর বদহজমে ভোগ, তারপর একটা একটা করে রোগে তোমাকে আক্রমণ করুক এইতো সরকার চায়। স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাক। আরামপ্রিয় হয়ে উঠুক। বাইরে গেলে আর কাজ করতে পারবে না।
আজ পাবনার রণেশ মৈত্রের সাথে আমার হঠাৎ দেখা হলো। ল’ পরীক্ষা দিতে পাবনা থেকে আনা হয়েছিল। দুই একদিনের মধ্যে চলে যাবেন এখান থেকে। বললাম, আপনার ছেলেমেয়ের কি খবর? বললেন, কি আর খবর, না খেয়েই বোধ হয় মারা যাবে। স্ত্রী ম্যাট্রিক পাশ কাজ কর্ম কিছু একটা পেলে বাঁচতে পারতো; কিন্তু উপায় কি! একে তো হিন্দু হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, তারপর রাজবন্দি, কাজ কেউই দিবে না। একটা বাচ্চা আছে। বন্ধু-বান্ধব সাহায্য করে কিছু কিছু, তাতেই চালাইয়া নিতে হয়। গ্রামের বাড়িতে থাকার উপায় নাই। মৈত্র কথাগুলি হাসতে হাসতে বললেন। মনে হলো তাঁর মুখ দেখে এ হাসি বড় দুঃখের হাসি।
সন্ধ্যায় তালা বন্ধ করার সময় বাইরের দরজাটা একটু খুলেছিল, তাই দেখা হয়ে গেল হঠাৎ। আবার বললাম, “পাবনা যাবেন বোধ হয়। বন্ধু মোশতাককে পাবনায় জেলে নেওয়া হয়েছিল। বোধ হয় সেখানেই আছে, কেমন আছে জানি না। তাকে খবর দিতে বলবেন।
