মনকে শক্ত করতে আমার কিছু সময় লাগল। ভাবলাম সকল সময় ক্ষমা করা উচিত না। ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ, কিন্তু জালেমকে ক্ষমা করা দুর্বলতারই লক্ষণ। ইসলামে ঠিক কথাই বলেছে, ক্ষমা করতে পার ভাল না করতে পারলে, হাতের পরিবর্তে হাত, চক্ষুর পরিবর্তে চক্ষু নিতে আপত্তি নাই।
আজ আরও একটা ছেলেকে সাতাশ সেল থেকে নিয়ে এসেছে পুরানা বিশ সেলে। ম্যাট্রিক দেবে। নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় বাড়ি। মাথায় আঘাত পেয়েছিল। ধরে নিয়ে ভীষণভাবে মারপিট করেছে। অনেকে জখম নিয়েই কারাগারে এসেছে। খাজা মহীউদ্দিন আমাকে তার পিঠটা দেখালো, এখনও দাগ রয়ে গেছে। তাকে ধরে এনে মেরেছে। শুনলাম ইপিআর-এর লোকগুলি এদের মারধর করে নাই। তারা বেঙ্গল পুলিশকে মিছামিছি গুলি করার জন্য জনসাধারণের সামনেই গালাগালি করেছে। এখনও বহুলোক জেলে আছে। নারায়ণগঞ্জে মামলায় এখনও গ্রেপ্তার চলছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই বাচ্চা ছেলের দল। কি কষ্টেই যে এরা আছে, বলব কি? বলবার ভাষা নাই। একই কাপড় পরে জেলে এসেছে। দিনের পর দিন সেই কাপড় পরেই রয়েছে।
সন্ধ্যার সময় এক সিপাহি আমাকে বলল, দেশের কথা কি বলব স্যার! কয়েকদিন পূর্বে ফরিদপুরের একটা মেয়েলোক আমার এক বন্ধুর কাছে ১৩ দিনের একটা ছেলেকে ১০ টাকায় বিক্রি করে দিয়ে গিয়াছে। এমনিই দিয়ে যেতে চেয়েছিল, বন্ধু ১০ টাকা দিয়ে দিল। কোনো কথা না বলে ছোট্ট মেয়ের হাত ধরে সে চলে গেল। একটা কথাও বলল না। শুধু বলল, আমি মাঝে মাঝে দেখতে চাই ছেলেটা ভাল আছে। আরও বলল, অনেক গ্রামের কচু গাছ ও গাছের পাতাও বোধ হয় নাই। বললাম, এইতো আইয়ুব খান সাহেবের উন্নয়ন কাজের নমুনা। মোনায়েম খাঁ সাহেবের ভাষায় চাউলের অভাব হবে না, গুদামে যথেষ্ট আছে। যে দেশের মা ছেলে বিক্রি করে পেটের দায়ে, যে দেশের মেয়েরা ইজ্জত দিয়ে পেট বাঁচায়, সে দেশও স্বাধীন এবং সভ্য দেশ! গুটিকয়েক লোকের সম্পদ বাড়লেই জাতীয় সম্পদ বাড়া হয় বলে যারা গর্ব করে তাদের সম্বন্ধে কি-ইবা বলব!
বাঙালি জাতটা এত নিরীহ, না খেয়ে মরে যায় কিন্তু কেড়ে খেতে আজও শিখে নাই। আর ভবিষ্যতেও খাবে সে আশা করাও ভুল। চুপ করে শুয়ে চিন্তা করতে লাগলাম গ্রামের কথা, বস্তির কথা। গ্রামে গ্রামে আনন্দ ছিল, গান বাজনা ছিল, জেয়াফত হতো, লাঠি খেলা হতো, মিলাদ মাহফিল হতো। আজ আর গ্রামের কিছুই নাই। মনে হয় যেন মৃত্যুর করাল ছায়া আস্তে আস্তে গ্রামগুলিকে প্রায় গ্রাস করে নিয়ে চলেছে। অভাবের তাড়নায়, দুঃখের জ্বালায় আদম সন্তান গ্রাম ছেড়ে চলেছে শহরের দিকে। অনেকক্ষণ শুয়ে শুয়ে ছোটবেলার কত কাহিনীই না মনে পড়ল। কারণ আমি তো গ্রামেরই ছেলে। গ্রামকে আমি ভালবাসি।
৯ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ শনিবার
ভিয়েতনামের হ্যানয় ও হাইফং-এ আবারও বোমাবর্ষণ করেছে আমেরিকা। জাতীয় পরিষদে একটা মুলতবি প্রস্তাব হ্যানয় ও হাইয়াং বোমাবর্ষণের ব্যাপার নিয়ে এনেছিল বিরোধী দল। স্পিকার নাকচ করেছেন, অন্য দেশের ঘরোয়া ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করা উচিত না বলে। কিন্তু বিশ্বশান্তি নিয়ে তো আলোচনা করা যায়। পাকিস্তান সরকারের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির নমুনা!
আইন মন্ত্রী জাফর সাহেব বলেছেন, সরকার উদ্বিগ্ন। চমৎকার কথা। আমি খুশি হয়েছিলাম এই মুলতবি প্রস্তাব এনেছিল বলে। দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখনই অত্যাচার করে, আওয়ামী লীগ তার প্রতিবাদ করে এবং নিজের দেশের সাম্রাজ্যবাদের দালালদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম চালাইয়া যায়। চীন আজ বহুদিন পর্যন্ত শুধু হুমকি মেরেই চলেছে। কখন সাহায্য করবে? যখন ভিয়েতনামের জনগণ অত্যাচারে, নির্বিচারে গুলির আঘাতে মৃত্যুবরণ করবে তখন বোধ হয় একবার যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে তাড়াতে না পারলে জনগণ শান্তির সাথে বাস করতে পারে না। এই সব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধেও আজ আমেরিকার অনেক প্রগতিশীল মানুষ তীব্র প্রতিবাদ করিতেছে। সুদূর মার্কিন দেশেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তবুও চক্ষু খুলছে না জনসন সরকারের।
আমাদের পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তিনটা কাগজের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছে। একটা সংবাদ, পূর্ব পাকিস্তানের কাগজ, আর দুইটা নওয়াই ওয়াক্ত’ ও ‘কোহিস্তান’-পশ্চিম পাকিস্তানের। প্রায় সকল কাগজকেই সরকার ছলে বলে কৌশলে নিজের সমর্থক করে নিয়েছে। যে দু’চারটা কাগজ এখনও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে জনগণের দাবি দাওয়া তুলে ধরছে তাদের শেষ করার পন্থা অবলম্বন করেছে সরকার। ইত্তেফাক প্রেস তো বাজেয়াপ্ত। ঢাকার কাগজের মধ্যে মর্নিং নিউজ, দৈনিক পাকিস্তান, পয়গাম, পাসবান সরকারের সমর্থক কাগজ। প্রথমোক্ত দুটাই প্রেস ট্রাস্টের। ইত্তেফাক তালাবন্ধ। সংবাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে শেষ করার অবস্থা। পাকিস্তান অবজারভার তো যখন যেমন, তখন তেমন, হায় হোসেন, হায় হোসেনের দলে। কখন যে আঘাত আসে বলা যায় না।
এক কথায় বাংলাদেশে বিরোধী দলের কোনো কাগজ থাকতে পারবে না। এই সমস্ত থেকে বুঝতে পারা যায় সরকার কোনদিকে চলেছে। এক দলীয় সরকার গঠন করার চেষ্টা করলেই তো ভাল হয়। এই সমস্ত অত্যাচার জুলুম করে লাভ কি? যারা পারবে গোপনে রাজনীতি করবে। আর যারা পারবে না চুপ করে সংসার করবে। দেশকে ধ্বংসের দিকে এরা নিয়ে চলেছে। ফলাফল ভয়াবহ হবে।
