বিকালে চা খাবার সময় সিকিউরিটি জমাদার সাহেবকে আসতে দেখে ভাবলাম বোধহয় বেগম সাহেবা এসেছেন। গত তারিখে আসতে পারেন নাই অসুস্থতার জন্য। চলিয়ে, বেগম সাহেবা আয়া। আমি কি আর দেরি করি? তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবি পরেই হাঁটা দিলাম গেটের দিকে। সেই পুরান দৃশ্য। রাসেল হাচিনার কোলে। আমাকে দেখে বলছে, আব্বা! আমি যেতেই কোলে এল। কে কে মেরেছে নালিশ হলো। খরগোস কিভাবে মারা গেছে, কিভাবে দাঁড়াইয়া থাকে দেখালো। রেণুকে জিজ্ঞাসা করলাম, খুব জ্বরে ভুগেছ। এখন কেমন আছ?
‘পায়ে এখনও ব্যথা। তবে জ্বর এখন ভালই।’
বললাম, ‘ঠান্ডা লাগাইও না’।
আমার চারটা ছেলেমেয়ে স্কুল থেকে এসেছে। ছেলে দুইটাই বাসায় ফিরেছে। মেয়ে দুইটার একজন কলেজ থেকে, আর একজন স্কুল থেকে সোজা এসেছে। ছোট ছেলেটা রাস্তায় দাঁড়াইয়া থাকে কখন আমি গেটে আসবো।
ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, মা, আব্বা, ভাইবোনদের খোঁজ-খবর নিলাম। মা ঢাকা আসতে চান না। এতদূর আসতে তার কষ্ট হবে—কারণ অসুস্থ। আবার বয়সও হয়েছে। আব্বা বাড়িতে। তারও কষ্ট হয় সকলের চেয়ে বেশি। একলা আছেন। আজ অনেক সময় কথা বললাম। সবই আমাদের সাংসারিক খবর এবং আমি কিভাবে জেলে থাকি তার বিষয়। বাচ্চারা দেখতে চায় কোথায় থাকি আমি। বললাম, বড় হও, মানুষ হও দেখতে পারবা। সময় হয়ে গেছে, যেতে দিতে হবে। ফিরে এলাম আমার জায়গায়। হরলিক্স ও আম নিয়ে এসেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, আমার জন্য না এনে বাচ্চাদের কিনে দেও তো।
সন্ধ্যা হয়ে এল। ওদের বিদায় দিয়ে আমার স্থানে আমি ফিরে এলাম। মনে মনে বললাম, আমার জন্য চিন্তা করে লাভ কি? তোমরা সুখে থাক। আমি যে পথ বেছে নিয়েছি সেটা কষ্টের পথ।
৭ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার
নতুন বিশ সেলের দোতালায় একটা ব্লকে একজন কয়েদিকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। একে ‘জাল সেল’ বলা হয়। একে তো সেল, তার উপর আবার জাল দিয়ে সামনেটা ঘেরা। ওকে একদিন আমি দেখেছি। আমার জায়গার কাছ দিয়েই দোতালার সিঁড়ি। চেহারাটা যে একদিন খুব ভাল ছিল সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নাই। লোকটার নাম নেছার খা। আজ ১৭ বৎসর জেলে আছে। যাদের যাবজ্জীবন জেল হয় তাদেরও ১২/১৩ বৎসরের বেশি খাটতে হয় না। একে ১৭ বৎসর রাখা হয়েছে কেন? খবর নিয়ে জানতে পারলাম, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল তখন জেল-মন্ত্রী এসেছিলেন জেল তদারক করতে। আট সেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল তাকে যাতে সে মন্ত্রী বাহাদুরের কাছে নালিশ করতে না পারে জেলের দুর্নীতি সম্বন্ধে। কারণ লোকটা বড় সাহসী, মুখের উপর সত্য কথা বলে দেয়। যখন মন্ত্রী সাহেব সেই সেলের পাশ দিয়ে যেতেছিলেন সে দেয়ালে উঠে চিল্কার করে বলেছিল, ‘স্যার আমার নালিশ আছে।‘
মন্ত্রী সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে এই লোকটা?’ তাঁকে বলা হয়েছিল লোকটা পাগল। তারপর মন্ত্রী সাহেব চলে যাওয়ার পরে যা ঘটবার তাই ঘটল। তখনকার দিনের বড় সাহেবের হুকুমে জেলখানার পাগলাগারদ ৪০ সেলে এনে বন্দি করা হলো। এবং ঘোষণা করা হলো সে পাগল হয়ে গেছে। পাগলের তো কোনো নির্দিষ্ট সময় নাই। যতদিন ভাল না হবে এবং সিভিল সার্জন সাহেব সার্টিফিকেট দিয়ে সরকারের কাছে না লিখবেন ততদিন ছাড়া পেতে পারে না। এতদিন তাকে পাগল করেই রাখা হয়েছে, যদিও সে পাগল না। এভাবে রাখলে ভাল মানুষও পাগল হয়ে যায়। নতুন সিভিল সার্জন সাহেব এসে ঘোষণা করেছেন, সে পাগল না। তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে লিখেছেন। বোধ হয় শীঘ্রই মুক্তির হুকুম আসবে।
আমার কাছে খুবই খারাপ লাগল। আমাদের সরকারের সময়ই এই অত্যাচার হয়েছিল এজন্য লোকটা এখনও ভুগছে। এর পরেও আমি তিনবার জেলে এসেছি। কেহই এ ঘটনা আমাকে বলে নাই। আর বললেও কি করতে পারতাম? এখন যারা জেল কর্তৃপক্ষ আছেন তারা এদের ছাড়তে দেরি করেছেন। পাগল বলে মুক্তি দেবার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের হাতে নাই। মানুষ এমন নিষ্ঠুর হতে পারে! যে ভদ্রলোক আমাদের সময় প্রমোশন পেয়েছিলেন, তিনি এই নীচু কাজটা করেছিলেন।
১১টার সময় ডিআইজি জনাব ওবায়দুল্লা দেখতে এসেছেন সেল এরিয়ায়। আমার কাছে আসলে তিনি দুই চার মিনিট বসেন। আজ অনেকক্ষণ বসলেন। হাদিস শরীফ নিয়ে আলোচনা করলেন। খানে দজ্জাল ইমাম মেহেদী আসবেন। ঈসা নবীও আর একবার আসবেন। এজ্জাজ, মাজুজও হাজির হবে। দুনিয়া প্রায়ই ধ্বংস হয়ে যাবে-আরও অনেক কিছু বলেন। আমিও দু’একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি বললেন, রসুলআল্লার জন্মের ১৪ শত বছর পর দুনিয়ায় কি হয় বলা কষ্টকর। তিনি যখন উঠলেন তখন আমি বললাম খানে দজ্জাল তো দুনিয়ায় এসেছে, ইমাম মেহেদীর খবর কি? তিনি বুঝলেন আমি কাকে ইঙ্গিত করলাম। হেসে দিয়ে বিদায় নিলেন, কোনো কথা আর বললেন না।
আমি আমার কাজে আত্মনিয়োগ করলাম এবং আর একবার চায়ের প্রয়োজন জানালাম। মুড়ি ও চা এসে হাজির হলো। যথারীতি মুড়ি নিধন করিয়া বই নিয়া বসলাম।
মনে মনে ভাবলাম, আজও দুনিয়ায় মানুষ অনেক আজগুবি কথা বিশ্বাস করে? বিশ্বাস না করে উপায় কি? কিল খাওয়ার ভয় আছে। যাক, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।
৮ই জুলাই ১৯৬৬ ।। শুক্রবার
প্রাতঃভ্রমণ করছি এমন সময় হাসপাতালের দিকে চেয়ে দেখি শাহাবুদ্দিন চৌধুরী সাহেব তাকাইয়া আছেন। আমাকে হাত ইশারা দিয়ে দেরি করতে বলে হঠাৎ চলে গেলেন ভিতরে। তিনটা ছেলেকে কোলে করে কয়েকজন কয়েদি নিয়ে এল বাইরে। দেখলাম একজনের হাত কেটে ফেলেছে, একজনের বুকের কাছে গুলি লেগেছিল, আর একজন হাঁটতেই পারে না কোলে করেই রেখেছে। বাইরের হাসপাতাল থেকে এদের এনেছে। অত্যাচার করে, মারপিট করে, গুলি করে জখম করেছে। এদের জীবন শেষ করে দিয়েছে, তারপর আবার আসামি করে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে এসেছে। কি নিষ্ঠুর এই দুনিয়া! এরাই তো আমাদের ভাই, চাচা, প্রতিবেশী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায় হলে এদের বংশধররা সুযোগ সুবিধা পাবে। এদেরকে বাদ দিয়ে তো কেউ অধিকার ভোগ করবে না। যারা মৃত্যুবরণ করল আর যারা পঙ্গু হয়ে কারাগারে এসেছে, জীবনভর কষ্ট করবে আমাদের সকলের জন্যই। কেন এই অত্যাচার? কেনই বা এই জুলুম! অত্যাচার কতকাল চলবে!
