৫ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ মঙ্গলবার
জমাদার ও সিপাহি সাহেবরা মুড়ি খেতে চায়। মুড়ি জেলখানার কয়েদিরা চোখেও দেখে না। মেটকে বললাম, মুড়ি-কাঁচা মরিচ ও পিয়াজ দিয়ে তৈয়ার কর। পূর্বেই আমি দেখাইয়া দিয়েছি কী করে তৈয়ার করতে হয়। নিজেও জানি কিছুটা। সাধারণ কয়েদিরা যারা আমার এখানে কাজ করে তাদের জন্যও বানাও। পাশের সেলে যে কয়জন জেল হতে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি আছে তাদেরও দিতে হবে। খেয়েদেয়ে ‘ডন’ কাগজ পড়তে লাগলাম। পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক খবরই পাওয়া যায়।
বৃষ্টি নেমেছে ভীষণভাবে, আর থামতেই চায় না। মশারিটা সকালে ধোপা দফায় পাঠিয়ে দিয়েছি, রৌদ্র দেখে। এখন কী উপায় করি? আজ বোধ হয় মশক বাহিনীর আক্রমণ আমাকে নীরবে সহ্য করতে হবে।
মোনায়েম খান সাহেব আবার হুমকি দিয়েছেন। সাবধান! সত্য কথা কেহ লিখতে ও বলতে পারবা না। চাউলের দাম বেশি বাড়ে নাই-বেড়েছে কিছুটা, তবে ভয়ের কোনো কারণ নাই। অনেক সিপাহি ছুটি ভোগ করে বাড়ি থেকে এসেছে। তাদের কাছেও শুনলাম ৫০ থেকে ৬০ টাকাও দাম উঠেছে চাউলের মন। সত্য কথা চাপা দেওয়ার এই চেষ্টা কেন? আপনার সরকারের কী ক্ষতি হতেছে! চাউল তো আপনার গুদামে যথেষ্ট আছে, আর ভয় কি? ছেড়ে দেন। বাজারে, অথবা রেশনিং প্রথা গ্রামে গ্রামে প্রচলন করুন। খাজনা আদায় বন্ধ করুন। বিনা পয়সায় কিছু চাউল গরিবদের মধ্যে বিলি করুন, কোনো গোলমাল থাকবে না।
কাগজগুলিকেও তিনি হুমকি দিয়াছেন। জনগণ বোধ হয় বেশি ভয় আর করবে না। বেশি বাড়লে ঝড়ে ভেঙে পড়ে। আপনার দিনও ফুরাইয়া এসেছে। পশ্চিম পাকিস্তানে একটি বাড়ি এই সুযোগে করে রাখুন। সুবিধা হবে, না হলে অনেক বিপদে বোধ হয় পড়তে হবে ভবিষ্যতে।
আজ একজন জেল কর্মচারী আমাকে জেলের দুর্নীতির কথা বলেছিল। কিছুদিন পূর্বে একজন অর্থশালী লোককে এনেছিল জেল দিয়ে। তাদের ডিভিশন দেওয়া হয় নাই। একজনের বেশি বয়স। আর যায় কোথায়? পানি আনতে হুকুম হলো, বেচারারা পারে না, কাঁদতে থাকে। তখন কয়েদির মধ্য থেকে কিছু দালাল এসে বলে, যদি কিছু টাকা দিতে পারেন, তবে ভাল কাজের বন্দোবস্ত করে দিতে পারি। কোনো কষ্ট হবে না, বসে বসে লেখাপড়া করতে পারবেন বা হাসপাতালে রাখার বন্দোবস্ত করে দেওয়া যাবে। বেচারা বোকার মতো বলে, জেলখানায় টাকা পাব কোথায়? তখন ঐ দালালই বুঝাইয়া দেয়: একখানা কাগজ এনে দিবে, বাইরে তার লোকের কাছে লিখে দিতে হবে অমুকের সাথে দেখা করে টাকা দিয়ে যেতে; নতুবা বাঁচবো না। যাদের টাকা আছে তারা তো কোনোমতে জোগাড় করে এনে দেয়, আর যাদের নাই তাদের কোনো কিছু বিক্রি করে অথবা যেভাবে পারে জোগাড় করে দিতে হবে।
একবার টাকা দিলে আর উপায় নাই। টাকা পেয়ে কয়েকদিন ভালই থাকার বন্দোবস্ত করল। আবার জুলুম। জেল কর্মচারী বেচারা ভাল মানুষ। এসব পথে হাঁটে না। অনেক গল্পই আমার সঙ্গে করল। আমি তো এসব ঘটনা বহু জানি। কারণ কারাগার তো আমার পুরানা সাথী। এমন কি গরিব কয়েদিদেরও টাকা এনে দিতে হয় মহকুমা জেলগুলিতে। সে অনেক ইতিহাস, লেখা কষ্টকর। আবার অনেক ভদ্রলোক আছে সিপাহি জমাদারদের ভিতর, যারা না থাকলে কয়েদিরা জেল খাটতে পারত না। নিজেদের সামান্য বেতন থেকেও কয়েদিদের কিছু কিছু জিনিস এনে দেয়। আবার সাহায্যও করে আদরও করে।
বিকালে বৃষ্টি থামলে বের হলাম ঘর থেকে। ধনুক আছে কাকের উৎপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। ওদের কিছু তাড়া করে বসে কাগজ পড়তে পড়তে দিন কাটাইয়া দিলাম।
৬ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ বুধবার
নাস্তা খেতে বসে দেখলাম, রুটি দুই টুকরা ছাড়া আর কিছুই নাই। বললাম, খেতে আমার ইচ্ছা নাই। কারণ সকালে চা খেয়েছি। কিন্তু মেট কি শোনে? খেতেই হবে কিছু। এক টুকরা রুটি আর জেলখানার একটা কলা খেয়ে নিলাম। জেলখানার কলা কেন বললাম প্রশ্ন আসতে পারে। কন্ট্রাক্টর কয়েদিদের জন্য আনে বাজারের সবচেয়ে ছোট কলা। কারণ যারা আপত্তি করবে, তারা আপত্তি করা দরকার মনে করে না।
গত কালের কাগজ নিয়ে বসলাম। আবার মেট এসে হাজির, ‘আর কিছু খাবেন না? এতে চলবে কি করে?’ বললাম, বাবা মাফ করো। তোমার জন্য অস্থির হয়ে পড়লাম। শুধু খাই খাই। কিছু সময় পরে মুড়ি নিয়ে এল। যে দুইটা ছেলে পরীক্ষা দিতেছে তাদের মধ্যে একজনের ভোর রাত থেকে বমি ও সকালে পাতলা পায়খানা হয়েছে। আমাকে খবর দিয়েছে একটা ডাবের দরকার। আমার কাছে ডাব ছিল, পাঠাইয়া দিলাম। আর ডাক্তারকে খবর দিতে বললাম। ডাক্তার সাহেব এলেন, ওষুধ দিলেন, বেচারা একটু সুস্থ বোধ করল এবং পরীক্ষা দিতে গেল। ভালভাবে পরীক্ষা দিক এটাই কামনা করলাম।
কাগজ এল। দেখি ইন্দোনেশিয়ার পিপলস কংগ্রেস আজ সুকর্ণকে আজীবন প্রেসিডেন্ট পদ হইতে অপসারিত করিয়াছে, তবে তিনি আগামী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই অন্যতম বিশাল রাষ্ট্রে আজ কমিউনিজম, লেনিনবাদ ও মার্কসবাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়াছে। পিপলস কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে-প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ সম্মতি দান করিয়াছেন। কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের বাড়াবাড়ির জন্যই আজ ইন্দোনেশিয়া এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হইয়াছে। তাড়াতাড়ি করে ক্ষমতা দখল করতে যেয়েই এই অঘটন ঘটাল, লক্ষ লক্ষ কম্যুনিস্ট কর্মীদের জীবন দিতে হলো। এখন গ্রেপ্তার ও অত্যাচার সহ্য করতে হতেছে। দুনিয়ার ডিক্টেটরদের চোখ খুলে যাওয়া উচিত। মনে হয় সুকর্ণকে আজ দয়া করে প্রেসিডেন্ট রাখা হয়েছে। কোনো ক্ষমতাই তার নাই। তার নিজের কথাগুলিকে নিজেরই হজম করতে হতেছে। আজ জাতিসংঘ, অর্থনৈতিক ব্যাংক ও অন্যান্য সঙ্গুলির সদস্য হবার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আজ আবার সাম্রাজ্যবাদের খপ্পরে তাকে পড়তে হবে বলে মনে হয়।
