সে হাসপাতালে চলে গেল। আমি মনে মনে ওর আরোগ্য কামনা করে বিদায় নিলাম।
একজন জমাদার সাহেব আমার এখানে ডিউটি দেয়। সিপাহির কাছ থেকে শুনলাম জমাদার সাহেব তার এক ছেলেকে এম. এসসি পড়াইতেছে। এবার পরীক্ষা দিবে। আমি তাকে ডেকে বললাম, ভাই খুব ভাল কাজ করেছেন। এত অল্প বেতন পেয়েও ছেলেকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, আপনাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। বলল, ‘স্যার, আমার ছেলেটাও ভাল। প্রাইভেট টিউশনি করে কিছু টাকা উপার্জন করে নিজের পড়ার খরচ চালাইয়া আমাকেও সাহায্য করে। তার কথা শুনে আমার খুব আনন্দ হলো।
সূর্য অস্ত গেল। আমিও আমার নীড়ে ফিরে এলাম। দুই তিন দিন হলো রাতে তিন চার বার ঘুম ভেঙে যায়। আর আজে বাজে স্বপ্ন দেখি। শরীরটা ভাল না, পাইলস ও গ্যাস্ট্রিক কষ্ট দেয়।
৪ঠা জুলাই ১৯৬৬ ॥ সোমবার
রাত্রে ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম আড়াইটা বাজে। আমি উঠে বসে পাইপ ধরালাম। আপন মনে পাইপ টানতে আরম্ভ করলাম। মশারির বাইরে বসার কি উপায় আছে! মশক শ্ৰেণী সাঁড়াশির মতো আক্রমণ করে। তবে একটা গুণ আছে এই জেলখানার মশক শ্রেণীর, শূল বসিয়ে রক্ত খেতে থাকে চুপচাপ। একদিনের জন্যও বুনু বুনু শব্দ শুনি নাই। তারা ডাকাডাকিতে নাই, নীরবে কাজ সারতেই পছন্দ করে। কয়েদিরা যেমন অত্যাচার সহ্য করে, মার খায়, সেল বন্ধ হয়, ডাণ্ডাবেড়ি পরে, হাতকড়ি লাগায়—প্রতিবাদ করার উপায় নাই, কথা বলার উপায় নাই। নীরবে সহ্য করে যায়। তাই বুঝি মশক বাহিনী বড় সাহেবদের খুশি করার জন্য শব্দ না করেই শূল বসাইয়া দেয়। জেলখানায় কত রক্ত খাবে? যত মশাই হউক, মশারিতো কয়েদিরা পাবে না। বোধ হয় তিন হাজার কয়েদির মধ্যে দুই শত কয়েদি মশারি পায়। রাজবন্দি আর যারা ডিভিশন পায় তারাই মশারি পায়। প্রথম যখন এসেছিলাম মশার আমদানি এত ছিল না।
খবর পেলাম গত রাতে ৬১ জন বিড়ি শ্রমিককে বন্দি করে আনা হয়েছে। তারা কি অন্যায় করেছে জানি না। তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। বিড়ির পাতা আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে প্রায় তিন চার লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে। তারা ও তাদের সংসারের সকলেই না খেয়ে দিন কাটাতেছে। সরকার পাতা বন্ধ করে দিলেন কিন্তু তাদের কাজের বন্দোবস্ত করার কথা চিন্তা করলেন না। সরকারের কোনো দায়িত্বও নাই বলে মনে হয়। আবার তাদের গ্রেপ্তার করাও শুরু হয়েছে। যারা জনগণের কাজের দায়িত্ব নিতে পারে না বেকার করার দায়িত্ব নিশ্চয়ই তাদের নাই। জুলুম করেই চলেছে। সিরাজগঞ্জের এই সকল শ্রমিক লাট বাহাদুরের কাছে দাবি করে ভাতের পরিবর্তে লাঠির আঘাত ও টিয়ার গ্যাস খেয়েছে। গ্রেপ্তার চলেছে সমানে। বাড়িতে যেয়ে যেয়ে কর্মীদের গ্রেপ্তার করে জেল দিতে শুরু করেছে। আমার মনে হয় পাকিস্তানকে একটা কারাগার ঘোষণা করলেই ভাল হয়, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানকে। জেলের মধ্যে সকলকে ভাত ও কাপড় দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। দেশটাকে জেলখানা ঘোষণা করে সকলের খাওয়ার ও থাকার বন্দোবস্ত করার দায়িত্ব নিলেই তো সব গোলমাল থেমে যায়। আর মায়ের সামনে কচি শিশুও না খেয়ে ধুকে ধুকে মরবে না। তোমাদের জুলুম যতই জোরে চলবে, গণআন্দোলনও ততই জোরে শুরু হবে। অত্যাচার চরমে পৌছলে, গণআন্দোলনও চরমে পৌছবে। দেখে খুশি হয়েছি। পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর নবাব কালাবাগ সাহেবের আমন্ত্রণক্রমে কয়েকজন সম্পাদক, মালিক এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা তার সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি বলেছেন, যদি ৫ই জুলাই ধর্মঘট বন্ধ রাখা হয় তাহলে জনাব তফাজ্জল হোসেনের গ্রেপ্তার ও নিউনেশন প্রেসের বাজেয়াপ্তের ব্যাপারে একটা সন্তোষজনক মীমাংসার জন্য তিনি চেষ্টা করতে রাজি আছেন, এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথেও আলোচনা করবেন। তাই সাংবাদিকরা ধর্মঘট স্থগিত রেখেছেন আগামী ২০শে জুলাই পর্যন্ত।
আমার মনে হয় একটা কিছু হবে, কারণ নবাব কালাবাগকে আমি জানি, তাঁর সাথে মতের মিল আমার না থাকলেও তিনি যা বলেন, করতে চেষ্টা করেন। নবাব সাহেব ও আমি একসাথে প্রায় সাড়ে তিন বত্সর পার্লামেন্টের সদস্য ছিলাম। তিনি পূর্ব বাংলার গভর্ণর সাহেবের মতো ফালতু কথা বেশি বলেন না।
আজ থেকে ডন কাগজ আমাকে দেওয়া শুরু করেছে। তবে একদিন দেরিতে পাই। এতে আমার দুঃখ নাই, কাগজ যে দেয় এটাইতো ভাগ্যের কথা! যে লোকের পাল্লায় পূর্ব বাংলার লোক পড়েছে, সে কতদূর নিয়ে যায় বলা কষ্টকর।
বিকাল সাড়ে চারটার সময় ডেপুটি জেলার সাহেব এলেন। বললেন, কেমন আছেন? জমাদার সাহেবকে ডেকে যেন কি বললেন, তারপরই বাঁশি বেজে উঠল। পাগলা ঘণ্টা, আর যায় কোথা! দৌড়াদৌড়ি পড়ে গেল। কয়েদিরা যার যার ঘরে চলে গেল। তালাবন্ধ হয়ে গেল। ফৌজ নিয়ে বন্দুক নিয়ে সার্জেন্ট সাহেব ঢুকলেন সেল এরিয়ায়, যেখানে আমি থাকি। বন্দুকের গুলি হতে লাগল, ফাঁকা গুলি। আধ ঘণ্টা পরে আবার ঘন্টা পড়ল, সব ঠিক আছে। একে জেলে ‘মাস কাবারী’ বলে। মাসে একবার করে কয়েদিদের ভয় দেখাবার জন্য এরকম করা হয়। আমরা তো ভয় পেয়ে বসেই আছি। আবার কেন বাবা!
জেলার সাহেব এলেন। তাকে বললাম, আপনার জেলে সাধারণ কয়েদিদের উপর জুলুম চলেছে, খাওয়া-দাওয়াও ভাল হতেছে না। আশা করি আপনি খেয়াল রাখবেন। বদনাম আপনাকেই মানুষ করবে। আর বদ দোয়াও করবে আপনাকে। জেলার সাহেব কয়েদিদের উপর নিজে কোনো অত্যাচার করেন না, সে আমি জানি।
