এই প্রস্তাবেও কংগ্রেস রাজি হতে পারলো না। ১৯২৮ সালে সর্বদলীয় কনফারেন্সে মতিলাল নেহেরুকে ভার দেওয়া হলো একটা রিপোর্ট দাখিল করতে, যাতে হিন্দু মুসলমান সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ রিপোর্ট আরও বিভেদ সৃষ্টি করল।
এর পরেই কলিকাতায় সর্বদলীয় সম্মেলন ডাকা হলো নেহেরু রিপোর্ট সম্বন্ধে আলোচনা ও তা গ্রহণ করার জন্য। মি. জিন্না তখন কতকগুলি সংশোধনী প্রস্তাব দিলেন এবং দুনিয়ার বহুদেশের শাসনতন্ত্রও সেখানে উল্লেখ করলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তার একটি সংশোধনী প্রস্তাবও গ্রহণ করা হল না। তিনি চোখের পানি ফেলে বের হয়ে এসেছিলেন। মি. জিন্নাকে হিন্দু মুসলমানের ‘মিলনের দূত’ বলা হতো। এর পরেই ছোট ছোট যে দলাদলি মুসলমানদের মধ্যে ছিল তা শেষ হয়ে গেল। স্যার মহম্মদ সফি ও মি. জিন্নার দল একতাবদ্ধ হয়ে ১৯২৮ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম কনফারেন্স ডাকলেন দিল্লীতে। সেখানে তাঁদের পুরানা দাবি ফেডারেল সরকারের প্রস্তাব দিলেন এবং ভবিষ্যতে মুসলমানদের দাবি কি হবে সেগুলিও গ্রহণ করলেন। সেখানে তারা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। এরপরেই জিন্না সাহেবের ১৪ দফা বের হলো। এতে ছিল, ‘It pointed out that no constitution would be acceptable to muslims unless and until it is based on federal principles with residuary powers vested in the province.’
১৯৩০-৩১ সালে যে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স বিলাতে হয় তাতে ভারতের মুসলমানদের পক্ষ থেকে এই একই দাবি স্যার সফি করেছিলেন। এমনকি মওলানা মহম্মদ আলি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী র্যামজে ম্যাকডােনাল্ডের কাছে ১৯৩১ সালে এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে, মুসলমানদের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ফেডারেল শাসনতন্ত্র—যেখানে প্রদেশগুলি পাবে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন।
১৯৩৭ সালে কয়েকটা প্রদেশে কংগ্রেস শাসিত মুসলমানদের উপর ভাল ব্যবহার করা হলো না। আলোচনা হয়েছিল প্রদেশে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হউক। কংগ্রেস রাজি হয় নাই। তার পরেই ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব মুসলিম লীগ গ্রহণ করে। যার ফলে আজ ভারতবর্ষ দুই দেশে ভাগ হয়েছে।
আজ যারা ৬ দফার দাবি যথা স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে আলাদা করার দাবি বলে উড়াইয়া দিতে চায় বা অত্যাচার করে বন্ধ করতে চায় এই আন্দোলনকে, তারা খুবই ভুল পথে চলছে। ছয় দফা জনগণের দাবি। পূর্ব পাকিস্তানের বাঁচা মরার দাৰি। এটাকে জোর করে দাবান যাবে না। দেশের অমঙ্গল করা হবে একে চাপা দেবার চেষ্টা করলে। কংগ্রেস যে ভুল করেছিল প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও ফেডারেল শাসনতন্ত্র না মেনে আমাদের শাসকগোষ্ঠীও সেই ভুল করতে চলেছেন। যখন ভুল বুঝবে তখন আর সময় থাকবে না। আমরা পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাস করি, তবে আমাদের ন্যায্য দাবিও চাই, অন্যকে দিতেও চাই। কলোনি বা বাজার হিসেবে বাস করতে চাই না। নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার চাই।
৩রা জুলাই ১৯৬৬ ।। রবিবার
সকালে বৃষ্টি হওয়ার পরে দিনটা একটু ভালই হয়েছে। রৌদ্র উঠেছে। বিছানাগুলি রৌদ্রে দেওয়া দরকার, তাই বের করে রৌদ্রে দিলাম।
মানিক ভাইকে বিজলি পাখা দেওয়ার হুকুম দিয়েছে। বেচারা একটু আরামে ঘুমাতে পারবেন। মানিক ভাই কষ্ট সহ্য করতে পারেন। যে কোনো কষ্টের জন্য যে তিনি প্রস্তুত আছেন, আমি জানি। তবু তাঁর স্বাস্থ্য ভাল না। জীবনে বহু কষ্ট স্বীকার করেছেন। স্বাস্থ্য একবার নষ্ট হলে আর এ বয়সে ভাল হবে না। এই ভাবনাই আমার ছিল। ১০ সেল সম্বন্ধে আলোচনা পূর্বে করেছি, সেখানেই আমার সহকর্মীদের রাখা হয়েছে শুধু কষ্ট দিবার জন্য।
আজ আর খবরের কাগজ আসবে না। মিলাদুন্নবীর জন্য বন্ধ। দিন কাটানো খুবই কষ্টকর হবে। আমি তো একাকী আছি, বই আর কাগজই আমার বন্ধু। এর মধ্যেই আমি নিজকে ডুবাইয়া রাখি। পুরানা কয়েকটা ইত্তেফাক কাগজ বের করে পড়তে শুরু করলাম।
জেল কর্তৃপক্ষ যে মাছ আমাকে দিয়েছিল তা খাওয়ার অযোগ্য। ফেরত দিয়ে দিলাম। আমার কাছে সামান্য যা ছিল তাই পাক করতে বললাম। কোনোমতে খাওয়া দাওয়া সেরে বই নিয়ে বসলাম। দুপুর বেলা ঘুমের সাথে আমি রীতিমত যুদ্ধ করি। পড়তে পড়তে ঘুম এলে বাইরে যেয়ে একটু ঘোরাঘুরি করতেছিলাম দেখি যে চটকল ফেডারেশনের সেক্রেটারি আবদুল মান্নানকে নিয়ে যায়। শুনলাম বাজার আনতে গেটে নিয়ে যেতেছে। বাইরে গাছের নিচে বসলেই কাক মহারাজরা বদ কর্ম করে মাথা থেকে সমস্ত শরীর নষ্ট করে দেয়। জেলে কাকের উৎপাত একটু বেশি। কয়েকদিন পূর্বে একটা ধনুক বানাইয়াছি। ধনুকটাকে আমি ‘বন্দুক’ বলে থাকি। ইটের গুঁড়া দিয়ে কাক বাহিনীদের আমি আক্রমণ করলেই ওরা পালাতে থাকে। আবার ফিরে আসে। কিছু সময় কাক মেরেও কাটাইয়া থাকি।
বিকালে যখন বেড়াচ্ছিলাম দেখি ঢাকার ন্যাপ কর্মী আবদুল হালিমকে হাসপাতালে নিয়ে চলেছে। দুই দিন থেকে ওর জ্বর। নূতন ২০ সেলের ১ নম্বর ব্লকে হালিম ও আর চারজন থাকেন। খুব নিকটে হলেও দেখা বা কথা বলার উপায় নাই। দরজা অন্য দিক থেকে। আমি এগিয়ে যেয়ে ওর মাথায় হাত দিলাম, খুবই জ্বর। বললাম, হালিম তুমি যে দলই কর পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তোমার দান আছে। ১৯৪৯ সালে তুমি আমার সাথে আওয়ামী লীগ করেছ, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছ। তোমার যদি কোনো জিনিসের প্রয়োজন হয় খবর দিও, লজ্জা করো না। তোমার ত্যাগকে আমি শ্রদ্ধা করি।’
