২৭শে জুন ১৯৬৬ ॥ সোমবার
নিজের শরীরও ভাল না; বাবুর্চি কেরামত আলীরও রাত্রে খুব জ্বর হয়েছে। বললাম হাসপাতালে যেতে, রাজি হলো না। দেখলাম জ্বর এখনও আছে। নতুন লোক এনে পাকাইতে দিলে মুখে দেওয়া যাবে না। কোনোমতে একে শিখাইয়া নিয়েছি।
ডাক্তার এলে ওষুধ দিলাম। শুয়েই রইল, শুয়ে শুয়ে দেখাইয়া দিল, একজন ফালতু কোনোমতে পাক করে আনল।
আজ আমার পড়তে ভাল লাগছে না, মাথা ঘুরছে। পাশেই নতুন বিশ-এর ২নং ব্লক, পাঁচটা সেল। কয়েকজন নামকরা কয়েদি, একজন মোক্তার বাবু, পটুয়াখালী বাড়ি—আর নুরুদ্দিন নামে ডাকাতি মামলার আসামি একজন নতুন কয়েদিকে এখানে আনা হয়েছে। তার বাড়ি গোয়ালন্দ মহকুমায়। ভদ্রলোকের ছেলে, বাড়ির অবস্থা ভাল, লেখাপড়াও জানে। রাত্রে শুয়ে শুয়ে তার গান শুনছিলাম। চমৎকার গান গায়। ভারী সুন্দর গলা। যদি সত্যিই সাধনা করত তাহলে বাংলাদেশের বিখ্যাত গায়কদের অন্যতম গায়ক হতো। আইন মানে না। কথা শোনে না। যথেষ্ট মার খেয়েছে এই কারাগারে এসে। কাউকেই মানে না, যা মুখে আসে তাই বলে। সমস্ত মার্ক কেটে দিয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। কোনো মার্ক পাবে না। তিনমাসে কয়েদিরা ১৮ দিন থেকে ২৩ দিন পর্যন্ত মার্ক পেয়ে থাকে। মানে ভালভাবে জেল খাটলে আইন ভঙ্গ না করলে কয়েদিদের নয় মাস সাড়ে নয় মাসে বৎসর। যত মার্ক শুরুতে পেয়েছিল তা আবার কেড়ে নিয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। পুরা দশ বৎসর খাটতে হবে। ভালভাবে থাকলে সাত বৎসর বা কাছাকাছি জেল খাটলেই খালাস পেত। এখন ওকে পুরা জেল খাটতে হবে। আমাকে বলে, পুরাই খেটে যাব। আর যাবারও ইচ্ছা নাই। মরলেও ভাল হতো। বাবা ভাইরা কোনো খবর নেয় না। ডাকাতি ও খুনের মামলায় জেল হয়ে তাদের ইজ্জত মেরেছি। একবার ওর মা ফরিদপুর জেলে দেখতে এসেছিল। তাকেও নিষেধ করে দিয়েছে। ২২ বৎসর বয়সে জেলে এসেছে। স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গিয়েছে ৭/৮ বৎসর পর্যন্ত কয়েদির খাওয়া খেয়ে, মশার কামড় সহ্য করে। স্বভাবের জন্য অত্যাচার সহ্য করে করে স্বাস্থ্য নষ্ট করে ফেলেছে। সকলেই বলে, ‘লোক সাংঘাতিক’!
আমি বললাম, নুরু কেন জীবন নষ্ট করলে বলতে পার? বাবা-মার মুখে চুনকালি দিলে, বংশের ইজ্জত নষ্ট করলে, কারাগারে কষ্ট করলে, কি লাভ হলো? তোমাকে জেলেও সকলেই খারাপ বলে। যে কয়দিন থাক, ভালভাবে থাক, তাড়াতাড়ি জেল খেটে বাড়ি যাও। বাবা-মার কাছে ফিরে যাও, আর এ পথে পা বাড়িও না। বলল, স্যার আমার দুঃখের কথা না-ই শুনলেন। চেষ্টা করব আপনার কথা রাখতে, তবে কি মুখে আর বাবা-মার কাছে যাবো? তাই গোলমাল করে পুরা জেল খাটতে চাই। বাইরে যেয়ে আর হবে কি? মরতে পারলে ভাল হয়। আমি বললাম, তোমার জেল থেকে বের হবার পূর্বে (সম্ভাবনা কম) যদি আমি বের হই, তবে দেখা করো। তোমার বাবা ও ভাইকে আমি চিঠি দিব। কিন্তু বের হলে কিছুদিন বাড়ির বাইরে যেতে পারবা না এবং ঐ কুপথে আর পা বাড়িও না। সে বলল, আপনার কাছে আমাকে নিয়ে নেন। আমি বললাম, আমার আপত্তি নাই। তোমাকে আমার কাছে দিবে না। গান গাও নুরু, তোমার গান শুনি, ভাল লাগছে তো আমারও। অনেক গান গাইল, বললাম, ‘বাংলার মাটির সাথে যার সম্বন্ধ আছে সেই গান গাও।’ আমি বারান্দায় মাটিতে বসে পড়লাম। নুরু ওর সেলের বারান্দার কাছে বসে গান করতে শুরু করল। অনেকক্ষণ গান শুনলাম। পরে আবার হাঁটতে লাগলাম।
ভাত খেয়ে একটা গল্পের বই পড়ছিলাম। কাগজ এল, কাগজ পেয়ে বইটা রেখে দিলাম। কাগজ এলেই হাসেম মিয়া জেলের মেম্বর, পাহারাও বরিশাল বাড়ি, একবার প্রেসিডেন্ট ছিল ইউনিয়ন বোর্ডের; আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালিয়ে ৬ বৎসর জেল খেটে এসেছে সে, মতিয়ার রহমান টাঙ্গাইল বাড়ি ও রফিক আমার এখানকার ছাপাইয়া—এরা ছুটে আসে কাগজ পড়তে। বোঝার মতো লেখাপড়া এরা সকলেই জানে। তাই বাংলা কাগজগুলি ওদের দিয়ে দিই পড়তে। খবর কিছুই থাকে না আজকাল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এত বেশি যে কেহই কিছু লেখতে সাহস পায় না।
বিকালে সিভিল সার্জন সাহেব আমাকে দেখতে এলেন। বললাম, ভালই আছি। তবে জেল কোড অনুযায়ী কোনো লোককে দুই মাসের বেশি একলা থাকতে দেওয়া নিষেধ, অথচ আমাকে একলা রাখা হতেছে। এর বেশি বললাম না কারণ ডাক্তার হিসাবে চমৎকার লোক। রোগীকে রোগী হিসেবেই দেখেন। কাহাকেও কয়েদি হিসেবে দেখেন না। কয়েদিরা যাতে ভালভাবে ঔষধ পায়, খাওয়া পায় তার দিকে যথেষ্ট নজর আছে।
কিছু সময় পরে বের হয়ে পড়লাম ঘর থেকে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। দেখলাম জেলার সাহেব আসছেন। কয়েক মিনিট বসে তিনি চলে গেলেন। আমার বাগানের প্রশংসাও করলেন।
আবার একাকী ঘুরতে ঘুরতে সময় হয়ে এল। আজকে দশমিনিট দেরি হলো দরজা বন্ধ করতে। রাজবন্দিদের দরজা বন্ধ করা উচিত না। ইংরেজের সময়ও অনেক কাল পর্যন্ত রাজবন্দিদের দরজা বন্ধ করার হুকুম ছিল না।
দরজা বন্ধ কেন? গলা টিপে মারো, তাতেও আমাদের কোনো আপত্তি নাই। শুধু শোষণ বন্ধ কর। জনগণের অধিকার ফেরত দাও।
২৮শে জুন ১৯৬৬ ॥ মঙ্গলবার
কি বিপদেই না পড়েছি! বাবুর্চি বেচারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, পাক করবে কে? নতুন একজন আনলে আবারও আমার কয়েকদিন না খেয়ে থাকতে হবে। আমার তো তেমন কোনো ধারণাও নাই, তবুও বাবুর্চিকে নিয়ে একটা পাক প্রণালী আবিষ্কার করেছি। মেট বলল, একটা মুরগি এনেছিলাম, ডিম দিয়েছে। খুব খুশি জেলখানায় আবার মুরগিতে ডিম দেয়? বললাম, খুব ভাল, রেখে দেও, মুরগিকে বাচ্চা দেওয়াব। ডিম কিন্তু খাওয়া চলবে না।
