২৬ সেলে সিকিউরিটি বন্দিরা থাকেন। ১৯৫৮ সালে গ্রেপ্তার হয়ে এখনও আছেন। সরকার ছাড়বার নাম নিচ্ছেন না। তারাও জানেন না কি করে মাথা নত করতে হয়। অনেকেই আছেন যারা ইংরেজ আমলেও দুই চার বার জেল খেটেছেন।
সেই ২৬ সেল থেকে আমার জন্য কুমড়ার ডগা, ঝিংগা, কাকরোল পাঠিয়েছেন। তাঁদের বাগানে হয়েছে, আমাকে রেখে খায় কেমন করে! আমার কাছে পাঠাতে হলে পাঁচটি সেল অতিক্রম করে আসতে হয়, দূরও কম না। বোধ হয় বলে-কয়ে পাঠিয়েছেন। তারা যে আমার কথা মনে করেন আর আমার কথা চিন্তা করেন, এতেই মনটা আনন্দে ভরে গেল। এঁরা ত্যাগী রাজবন্দি দেশের জন্য বহু কিছু ত্যাগ করছেন। জীবনের সবকিছু দিয়ে গেলেন এই নিষ্ঠুর কারাগারে। আমি তাদের সালাম পাঠালাম। তারা জানেন, আমাকে একলা রেখেছে, খুবই কষ্ট হয়, তাই বোধ হয় তাঁদের এই সহানুভূতি।
আজ ফলি মাছ দিয়েছে। বাবুর্চি বলল, কোপতা করতে হবে। বাবুর্চি জানে না, কেমন করে করতে হয়, আমিও জানি না। তবু করতে হবে। বললাম, বোধ হয় এইভাবে করতে হয়। বাবুর্চি ও আমি পরামর্শ করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করলাম। সেইভাবেই করা হলো। যখন খেতে শুরু করলাম মনে হলো কোপতা তো হয় নাই, তবে একটা নতুন পদ হয়েছে। কি আর করা যায়, চুপ করে খেয়ে নিলাম। বললাম, বাবারা, বাড়িতে যে রকম খাই তার ধারে কাছ দিয়েও যায় নাই। যাহা হউক খেয়ে ফেল, ফলি মাছ তো!’ মনে মনে হাসলাম, পাস করা বাবুর্চি আমি! ভাগ্য ভাল, বাইরের লোক ছিল না, থাকলে কোপতা আমার মাথায় ঢালতো। এই সময়ই মনে হলো একলা হয়ে
সুবিধাই হয়েছে।
খবরের কাগজ এসেছে। ভাসানী সাহেবের রাজনৈতিক অসুখ ভাল হয়ে গেছে। যখন গুলি চলছিল, আন্দোলন চলছিল, গ্রেপ্তার সমানে সমানে চলেছে তখন দেখলাম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবার দেখলাম দুই তিন দিন পরে কোথায় যেতে ছিলেন পড়ে যেয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছেন। হঠাৎ অসুস্থ মানুষ আবার বাড়ির বাহির হলেন কি করে? যখন আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য কর্মীরা কারাগারে—এক নারায়ণগঞ্জে সাড়ে তিনশত লোকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ঝুলছে, তখনও কথা বলেন না। আওয়ামী লীগ যখন জুলুম প্রতিরোধ দিবস পালন করল তখন একদল ভাসানীপন্থী প্রগতিবাদী(!) এই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে সরকারের সাথে হাত ও গলা মিলিয়েছে। এখন তিনি হঠাৎ আবার সর্বদলীয় যুক্তফ্রন্ট করবার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন এবং নিজে ময়দানে নামবেন।
মওলানা সাহেব পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে আইয়ুব খানকে সমর্থন করে চলেছেন। মওলানা সাহেবের সাথে যদি যুক্তফ্রন্ট করতে হয় তবে আইয়ুব সাহেবই বা কি অন্যায় করেছেন? মওলানা সাহেব তো দেশের সমস্যার চিন্তা করেন না। বৈদেশিক নীতি নিয়ে ব্যস্ত। দেশে গণআন্দোলন বা দেশের জনগণের দাবি পূরণ ছাড়া বৈদেশিক নীতিরও কোনো পরিবর্তন হতে পারে না। জনগণের সরকার কায়েম হলেই, জনগণ যে বৈদেশিক নীতি অবলম্বন করতে বলবে, নির্বাচিত নেতারা তাহাই করতে বাধ্য। ডিক্টেটর যখন দেশের শাসন ক্ষমতা অধিকার করেছে এবং একটা গোষ্ঠীর স্বার্থেই বৈদেশিক নীতি ও দেশের নীতি পরিচালনা করছে তার কাছ থেকে কি করে এই দাবি আদায় করবেন আমি বুঝতে পারছি না। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যখন তাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি, খাদ্য, রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে তখন পিছন থেকে ছুরিকাঘাত করে এখন এসেছেন যুক্তফ্রন্ট করতে! আওয়ামী লীগের প্রায় সকল নেতা ও কর্মীই কারাগারে বন্দি। কেহ কেহ আত্মগোপন করে কাজ করছে, এখন যে কয়েকজন বাইরে আছে তারা কিছুতেই এদের সাথে যোগদান করতে পারে না। আর ছয় দফা দাবি ছেড়ে দিয়ে কোনো নিম্নতম কর্মসূচি মেনে নিতে পারে না। ছয় দফাই হলো নিম্নতম কর্মসূচি। কোনো আপোষ নাই। জনগণ যখন এগিয়ে এসেছে তখন দাবি আদায় হবেই। আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করে যাবে। জনগণকে আর ধোঁকা দেওয়া চলবে না। অনেক জগাখিচুড়ি পাকানো হয়ে গেছে। আর না। ভাসানী সাহেব এগিয়ে যান আইয়ুব সাহেবের দল নিয়ে। এখন তো তিনি সুখেই আছেন, আর কেন মানুষকে ধোঁকা দেওয়া? আওয়ামী লীগ বা তার নেতারা যদি ছয় দফা দাবি ত্যাগ করে আপোষ করতে চান তারা ভুল করবেন। কারণ তাহলে জনগণ তাদেরও ত্যাগ করবে।
চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, মানিক বাবু ও আবদুল মান্নানের জন্য হাইকোর্টে রীট পিটিশন করা হইয়াছে। বিচারে কি হয় দেখা যাক।
২৯শে জুন ১৯৬৬ ॥ বুধবার
ঘুম ভাঙলো বৃষ্টির পানি গায়ে লেগে, মশারির একটা অংশ ভিজে গিয়াছে। খুব ঘুমিয়েছিলাম, টের পাই নাই। বৃষ্টি হতেছে, মুষল ধারে। যখন বৃষ্টির খুব প্রয়োজন ছিল তখন হয় নাই, এখন যখন বৃষ্টির প্রয়োজন নাই তখন খুব হতেছে। বন্যায় দেশের খুবই ক্ষতি হয়েছে। চাউল তেল ও অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়েই চলেছে। মোনায়েম খান সাহেবের বক্তৃতায় পেট ভরে যাবে সকলের। তিনি বলেন, আল্লাহর তরফ থেকে বন্যা হয়েছে। কষ্টের ভিতর দিয়ে খোদা লোককে পরীক্ষা করে থাকেন। কি আর বলা যায়! বন্যা কনট্রোল করতে পারে আজকাল দুনিয়াতে। অনেক দেশে করেছেও। একটু চক্ষু খুলে দেখলে ভাল হয়। ভদ্রলোকের দোষ কি? কিই-বা জানেন আর কিই-বা বলবেন। খান সাহেব এদিক দিয়ে ভাল লোক, স্বীকার করেন যে। তিনি নূরুল আমীন সাহেবের হুকুমে গুন্ডামি করে বেড়াতেন। এখন তিনি লাট হয়েছেন। ভাল কথা। গুন্ডার পরে পান্ডা। পাড়ার পরে নেতা, এইতো হলো নেতার ডেফিনেশন।
