ডিপুটি জেলার সাহেব এলেন। কিছু সময় পরে জমাদার সাহেব তার ফৌজ নিয়ে হাজির। আমার ঘর তালাশ করবে। কোনো কিছু বেআইনি লুকাইয়া রাখি কি না? এটা জেলের নিয়ম। রাজবন্দিদের ঘরগুলি সপ্তাহে একবার করে তালাশি দেওয়া হয়ে থাকে। তবে আমার ঘর তালাশি বেশি করে না। এসে দেখে যায়। কারণ জানে বেআইনি কাজ আমি করি না। আর বেআইনি জিনিস আমার কাছে থাকে না। তবে আসলেই আমি নিজেই বলি বের হয়ে যেতেছি, আপনারা তালাশ করে দেখে নিন। ইচ্ছা করলে এরা শরীর তল্লাশি করতে পারে, তবে জেলার ও ডিপুটি জেলার ছাড়া অন্য কেহ পারে না। সিপাহিরা ঘরের ভিতর আসল না, শুধু জমাদার সাহেব ভিতরে এসে ঘুরে গেলেন।
আমি বললাম, প্রত্যেক সপ্তাহে আসেন কিছুই পান না। একবার বলবেন, আমি কিছু বেআইনি মাল রেখে দিব। এরা খোঁজ করে কোনো চিঠিপত্র বাইরে পাঠাই কিনা? কোনো অস্ত্রপাতি আনি কিনা বাইরে থেকে, যা দিয়ে পালাতে পারি। রাজবন্দি অস্ত্রপাতি আনে এ খবর আমার জানা নাই। তবে অনেক সময় চিঠিপত্র পাওয়া গেছে রাজবন্দিদের কাছ থেকে। এরা এক সেল থেকে অন্য সেলে যোগাযোগ রাখে। এক এরিয়া থেকে অন্য এরিয়ার সাথেও যোগাযোগ রাখে। যখন জেল কর্তৃপক্ষ অথবা সরকারের সাথে বোঝাপড়া করতে চায় তখন যাতে একসাথে করতে পারে। সেজন্যই যোগাযোগটা করে। আজকাল তাহাও করে না। কারণ বিচার কোথায়?
জমাদার চলে গেলেন। ডিপুটি জেলার সাহেব বসলেন কিছু সময়। আমার সহকর্মীদের উপর সরকারের এই ব্যবহারের কথা বললাম। আওয়ামী লীগ কর্মীদের ও মানিক ভাইকে যে অবস্থায় রেখেছে দুষ্ট প্রকৃতির কয়েদিদেরও সেভাবে রাখা হয় না। এদের বলে লাভ নাই জানি, কারণ, গ্রেপ্তার করে জেলগেটে পৌঁছাইয়া হুকুম দিয়ে যায় কোথায় কাদের রাখা হবে।
যদি জেল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করে তবে পাকের বন্দোবস্ত বন্দিদের হাতেই দিতে পারে। বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তা করছে না। আমার সাথে আমার দলের কাহারও এক জেলে থেকেও দেখা হয় না। আমি একদিকে আর অন্যরা অন্যদিকে। বোধ হয় জেলের মধ্যে দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও নাই। সরকারের হুকুম আমার কাছে কাহাকেও দেওয়া হইবে না, কাহারও সাথে যোগাযোগ রাখতে পারব না। আমার খবর বন্দি নেতা কর্মীরা পায় কিনা জানি না, তবে ওদের খবর আমি রাখি, কি অবস্থায়—তাদের রাখা হয়েছে।
ডিপুটি জেলার সাহেব চলে গেলেন। রবিবার ছুটির দিন। তবুও এদের ছুটি নাই, অনেক কাজ। নারায়ণগঞ্জ থেকে চটকল ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি আবদুল মান্নানকে নিয়ে এসেছে। জামিন দেয় নাই, নারায়ণগঞ্জে মামলায় তাকে আসামি করেছে। ভদ্রলোক কাছেও ছিল না। শুনলাম নারায়ণগঞ্জে মশা কামড়াইয়া তার হাত মুখ ফুলাইয়া দিয়াছে। আরও বহু লোককে গ্রেপ্তার করে নারায়ণগঞ্জ জেলে রেখেছে। অনেক ছাত্রও আছে। জামিন পায় নাই। কাপড় দেয় নাই, ডিভিশন দেয় নাই। প্রত্যেকটা লোক অর্ধেক হয়ে গেছে। তিন শতের উপর লোককে আসামি করেছে। যাকেই পেয়েছে গ্রেপ্তার করে জেলে দিতেছে।
‘জাতীয় সরকার’ অত্যাচার করো, ফলাফল একদিন পেতে হবে, বেশি দেরি নাই। তখন আবার ‘নিষ্ঠুর’ বলিও না। কাহারা এই অত্যাচার করছেবাঙালিরা, চাকরির জন্য। এরা বোঝে না কাদের জন্য এই লোকগুলি জীবন দিল? কার জন্য এরা কষ্ট ভোগ করছে? এদের অনেকেরই ছেলেমেয়ে না খেয়ে কষ্ট পেতেছে। কিছুদিন পরে বের হয়ে দেখবে কেউ নাই, সব শেষ। যে লোকটা উপার্জন করে, দিন মজুরি করে সংসার চালাতে তাকে আটকিয়ে রাখলে তার ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা মা না খেয়ে থাকবে। আস্তে আস্তে মরে শেষ হয়ে যাবে। এই খবর কি সরকার জানে না? আমাদের দেশের এই শিক্ষিত চাকরিজীবীদের মধ্যে কিছুসংখ্যক লোক আছে পদোন্নতির জন্য তারা কত যে সংসার ধ্বংস করেছে তার কি কোনো সীমা আছে?
খাজা মহীউদ্দিন পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে। আর একটা ছেলেমিলকী তাকে অনুমতি দেওয়া হয় নাই। জেল কর্তৃপক্ষ ঢাকার এসডিওকে জানাইয়াছিল। তিনি বলেছিলেন, ডিসি সাহেবের সাথে পরামর্শ করে জানাবেন। আগামীকাল সকালে পরীক্ষা শুরু হবে। কোনো খবর এসডিও সাহেব দেন নাই। বোধ হয় ঢাকার ডিসি সাহেব গভর্নর সাহেবের অতি প্রিয় লোক। অনুমতি দেন নাই। খুব মুখ কালো করে দাঁড়িয়েছিল ছেলেটা। একটা বৎসর নষ্ট হয়ে গেল। ফিস দিয়েছে, সকল কিছু প্রস্তুত, কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেয় নাই।
পুরানা ২০ সেলে তাকে বললাম দূর থেকে, ‘ভেব না ভাই। আমাকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাহির করে দিয়েছিল। যারা বাহির করে দিয়েছেন তাদের অনেকেই আমার কাছে এসেছিলেন। ক্ষমা করে দিয়েছিলাম—পরে শোধ নিতে পারতাম, নেই নাই। খোদার উপর নির্ভর করো।’ খাজা মহীউদ্দিন যে কি খেয়ে পরীক্ষা দিবে তাই ভাবলাম। ডিপুটি জেলার সাহেবকে বললাম, একটু খেয়াল রাখবেন ছেলেটার দিকে। আমার কাছে তো কিছু কিছু জিনিস আছে কিন্তু দেবার তো হুকুম নাই। তবুও ভাবলাম, বেআইনি হলেও আমাকে কিছু দিতে হবে। দেখা হয়েছিল। আমার সেলের কাছ দিয়ে যেতে হয়। আমি এগিয়ে যেয়ে ওকে আদর করে বললাম, ‘ভেব না, তুমি পাশ করবা। মাথা ঠান্ডা করে লেখবা।’
আজ বাজার থেকে আমার খাবার টাকা বাঁচিয়ে দু’টা মুরগি এনেছি। বাগান দিয়ে এরা ঘুরে বেড়ায়। সূর্য অস্ত গেল, আমরাও খাঁচায় ঢুকলাম। বাড়িওয়ালা বাইরে থেকে খাচার মুখটা বন্ধ করে দিল। বোধহয় মনে মনে বলল, আরামে থাক, চোর ডাকাতের ভয় নাই, পাহারা রাখলাম।
