আমি বইয়ের মধ্যে মন দিলাম। মেট এসে হাজির, স্যার ডাব খাবেন না? বললাম, আনো। পেটের ব্যথা, পেট খারাপ হয়েই থাকে। তাই ডাব মাঝে মাঝে খাই। ডাব খেয়ে পাইপ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আবার ফুলের বাগানে। একটা মাত্র বন্ধু ফুলের বাগান। ওকে আমি ভালবাসতে আরম্ভ করেছি। যাদের ভালবাসি ও স্নেহ করি, তারা তো কাছে থেকেও অনেক দূরে। ইচ্ছা করলে তো দেখাও পাওয়া যায় না। তাই তাদের কথা বার বার মনে পড়লেও মনেই রাখতে হয়। স্ত্রী ছেলেমেয়েদের সাথে তো মাসে দু’বার দেখা হয় আর কারও সাথে তো দেখা করারও উপায় নাই। শুধু মনে মনে তাদের মঙ্গল কামনা করা ছাড়া উপায় কি!
গোসল করে খেয়ে বিছানায় আশ্রয় নিলাম। মতিয়ার নামে একটা ছেলে আমাদের সেল এরিয়ার পানি দেয়। বাড়ি টাঙ্গাইল, স্কুলে পড়তো। দুই পক্ষে ফুটবল খেলা নিয়ে গোলমাল হয় এবং একটা খুন হয়। সেই মামলায় ছয় বৎসর জেল হয়েছে। আমার কাছে এসে বলল, জেলার সাহেবকে একটু বলে দিতে ম্যাট্রিক পরীক্ষা জেল থেকে দিতে চায়, তার অনুমতির বন্দোবস্ত করতে। বললাম, জেলার সাহেব আসলে অনুরোধ করব—যদি শোনেন। ছেলেটা এখানে এসে কাগজ পড়ে। শুনলাম ওকে জেলের আইন ভঙ্গ করার জন্য জেলার সাহেব একবার শাস্তি দিয়েছেন, তাই অনুমতি দিতে চান না। রাগ করে আছেন। জেলার সাহেব ওকে নিজের অফিসে প্রথমে নিয়েছিলেন, সেখানে গোলমাল করার জন্য তাড়াইয়া দিয়েছেন। তবুও ওকে বললাম, জেলার সাহেব আসলে অনুরোধ করব।
কাগজ এল। মর্নিং নিউজে দেখলাম জনাব খান আবদুস সবুর খান বলেছেন বাংলাদেশের লোক আওয়ামী লীগের ধাপ্পা ধরে ফেলেছে, জুলুম প্রতিরোধ দিবস কেহই পালন করে নাই। পিন্ডি চলেছেন, তার নেতাকে খুশি করতে পারবেন একথা বলে। তাই হাওয়াই জাহাজের আড্ডায় সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ঐ কথা। এসব কথা বলে বাঙালির দাবি আর দমাতে পারবেন না, এ কথা ভাল করে জেনে রাখুন সবুর সাহেব। জেল, জুলুম, মামলা সমানে চালাইয়াছেন। কাগজ বন্ধ করেছেন, এতেই গণআন্দোলন বন্ধ হয় না, সেরকম ভেবে থাকলে ভুল করেছেন।
মর্নিং নিউজ সবুর সাহেবের নামের দুই পাশেই ‘খান’ লাগাইয়াছে। পশ্চিম পাকিস্তানি কায়দা। আগে ছিল আবদুস সবুর খান, এখন হয়েছেন খান আবদুস সবুর খান। চমৎকার, এই তো চাই! পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষিত লোকেরা যে গোপনে গোপনে হাসেন একথা বুঝেও বোঝেন না এই ভদ্রলোকেরা। এই মুসলিম লীগের এক নেতা সীমান্ত প্রদেশে যেয়ে তার পূর্ব-পুরুষের গোরস্থান খুঁজেছিলেন। আজ সবুর সাহেব বোধ হয় ওদিকে অন্য কিছু খোঁজ করছেন?
ন্যাপের অন্যতম এমপিএ আহমেদুল কবির সাহেব ৫ একর জমির খাজনা মওকুফ করতে দাবি করেছেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আমি চার বৎসর পূর্বে ২৫ বিঘা জমির উপর থেকে খাজনা মওকুফ করার দাবি করে অনেক জনসভা ও আন্দোলন করেছি। এমন কি সর্বদলীয় বিরোধীদলের ১২ দফা দাবির মধ্যেও আওয়ামী লীগের এই দাবি গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিলাম। যদিও মরহুম খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব প্রথমে আপত্তি করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। ন্যাপের কোনো কোনো নেতা ৬ দফা গোপনে গোপনে সমর্থন করলেও লজ্জায় বলেন না, আর কেউ কেউ এর বিরুদ্ধাচরণ করেন। দিন আসছে ৬ দফা ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি না মেনে এদেশে রাজনীতি করতে হবে না। তবে রাজনীতিকে ব্যবসা হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন অনেকেই।
বিকালে খবর পেলাম মিজান খুব ঘুমাচ্ছে। বোধ হয় ওকে রাতে ঘুমাতে দেয় নাই।
সন্ধ্যায় দেখলাম পুরানা বিশ সেলে নারায়ণগঞ্জের খাজা মহীউদ্দিনকে নিয়ে এসেছে। ওর বিরুদ্ধে অনেকগুলি মামলা দিয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশে ওকে পরীক্ষা দিতে অনুমতি দিয়েছে। ডিভিশন দেয় নাই। ভীষণ মশা, পরশু পরীক্ষা, মশারিও নাই। তাড়াতাড়ি একটা মশারির বন্দোবস্ত করে ওকে পাঠিয়ে দিলাম। আমার কাছাকাছি যখন এসে গেছে একটা কিছু বন্দোবস্ত করা যাবে। বেশি কষ্ট হবে না। খাজা মহীউদ্দিন খুব শক্তিশালী ও সাহসী কর্মী দেখলাম। একটুও ভয় পায় নাই। বুকে বল আছে। যদি দেশের কাজ করে যায় তবে এ ছেলে একদিন নামকরা নেতা হবে, এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নাই। ত্যাগ করার যখন প্রাণ আছে, আদর্শ যখন ঠিক আছে, বুকে যখন সাহস আছে একদিন তার প্রাপ্য দেশবাসী দেবেই।
২৬শে জুন ১৯৬৬ ॥ রবিবার
ভোর রাত্র থেকেই মাথা ভার ভার লাগছিল। বিছানা ছাড়তেই মাথার ব্যথা বেড়ে গেল। আমার মাথায় যন্ত্রণা হলে অসহ্য হয়ে উঠে। অনেকক্ষণ বাইরে বসে রইলাম, চা খেলাম, কিছুতেই কমছিল না। ওষুধ আমার কাছে আছে, ‘স্যারিডন’, কিন্তু সহজে খেতে চাই না। আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুলে বেশি লাগে তাই অনেকক্ষণ বাইরে যেয়ে হাঁটতে লাগলাম। বাতাসে ভালই লাগছিল। ব্যথা একটু কম কম লাগছিল।
আজ তো রবিবার। কয়েদিরা কাপড় পরিষ্কার করবে। ঠিক করেছি, স্যারিডন সহজে খাব না। মেট ও পাহারা কাহাকেও কিছু বললাম না। প্রায় দশটার দিকে আরাম লাগছিল। বাইরে থাকতে মাথা ব্যথায় অনেক সময় কষ্ট পেতাম। স্যারিডন দুই তিনটা খেয়ে চুপ করে থাকতাম। আধা ঘণ্টা পরেই ভাল হয়ে যেতাম। আবার কাজে নেমে পড়তাম। রেণু স্যারিডন খেতে দিতে চাইত না। ভীষণ আপত্তি করত। বলত, হার্ট দুর্বল হয়ে যাবে। আমি বলতাম, আমার হার্ট নাই, অনেক পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে। বাইরে তার কথা শুনি নাই। কিন্তু জেলের ভিতর তার নিষেধ না শুনে পারলাম না।
