ড. মির্জা নূরুল হুদা সাহেব ৬ দফার উপর কটাক্ষ করে বলেছেন, পাকিস্তান দুর্বল হয়ে যাবে। যাহা হউক, পাকিস্তান দুই টুকরা হয়ে যাবে এ কথাতো তারা বলেন নাই। ড. হুদা সাহেবকে আমার জানা আছে। মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পূর্বে কি বলেছেন, আর মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পরে কি বলছেন! হায়রে মন্ত্রীত্ব, তোমার কি জাদু! যাকেই হার দিয়েছ তাকেই বশ করে ফেলেছ।’
সন্ধ্যার দিকে জেলার সাহেব এলেন। কয়েকদিন ছুটিতে ছিলেন। তার শ্বশুর মারা গিয়াছেন। জেলার সাহেব খুব হাসিখুশি লোক। অমায়িক ব্যবহার। শুধু বললাম, আমার দলের লোকগুলিকে অত কষ্টে না রাখলেই পারতেন। এরাই বোধ হয় সকলের থেকেই খারাপ লোক? বুঝি, আপনাদের অসুবিধা! একজন দ্রলোক আওয়ামী লীগের কাকে কোথায় রাখা হবে ফোন করে বলে দেন। তাহার হুকুম আপনাদের তামিল করতেই হবে, কি বলেন? যাহা হউক, আমাদেরও সহ্যের সীমা আছে। আমাকে একলা রেখেছেন ঠিক আছে, একলাই থাকব। এমন অনেক আমি রয়েছি। কিন্তু এদের নিজেদের পাকের ব্যবস্থা নিজেদের সামনেই করতে দিন। দেখাশোনা করে খাবে। তাহাও যদি সরকার বাধা দেয় তবে জানাবেন, আমাদের পথ আমরাই বেছে নিব। তবে আপনারা এতো দ্র ব্যবহার করেন যে কিছুই আমরা করতে পারি না। আমার সহকর্মীদের পূর্বেই বিভিন্ন জেলে বদলি করে দিয়েছেন। দেখেন চিন্তা করে। বেচারার মনটাও খারাপ। তালাবন্ধের সময় হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি কথা বন্ধ করলাম। ঘরে ঢুকতেই বাতি নিভে গেল। বিজলি পাখাও বন্ধ হয়ে
গেল। হ্যারিকেনটা জ্বালিয়ে বই নিয়ে বসলাম। অনেক রাত পর্যন্ত লেখাপড়া করলাম। মাঝে মাঝে বাইরের দিকে চেয়ে অন্ধকারটা একটু দেখে নিই। যাকে বলে চক্ষু জুড়াই।
আবার ড. এম. নূরুল হুদা সাহেবের বক্তৃতা ভাল করে পড়লাম। একজন শিক্ষিত ভদ্রলোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন, হঠাৎ একজনের দয়ায় মন্ত্রী হয়ে রাজনীতিবিদ হওয়ার চেষ্টা করছেন। তাই রাজনীতি সম্বন্ধে কি বলতে কি বলে ফেলেছেন, বোধ হয় নিজেই বুঝতে পারেন নাই। তাই কথাগুলি লিখে রাখলাম ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে।
“The Finance Minister also brought serious allegations against the advocates of Six-Point Programme of Awami League. He said that certain forces continued to have the Consortium Aid postponed. These forces also thrust a war on Pakistan. But their two actions failed to break Pakistan as the People stood united like a rock. Then came the Six-Point Programme of the Awami League.
This Programme really aims at setting up a weak national government, which means a weak Pakistan, the Finance Minister commented. The most important thing is however, the timing of the Programme, he added.
Pakistan Observer 24.6.1966
মন্ত্রীত্বের লোভে ভদ্রলোক এত নিচে নেমে গিয়েছেন যে একটা দলের বা লোকের দেশপ্রেমের উপর কটাক্ষ করতেও দ্বিধাবোধ করলেন না। যদি বলতে হয় পরিষ্কার করে বলাই উচিত।
রাত অনেক হয়েছে, শুয়ে পড়া ছাড়া আর উপায় কি?
২৫শে জুন ১৯৬৬ ॥ শনিবার
আজ অনেকক্ষণ বেড়ালাম। পড়তেও ইচ্ছা হয় না। চুপ করে একাকী বসে থাকার চেয়ে হাঁটতে ভাল লাগে। তাই হাঁটতে লাগলাম আপন মনে। বেগম সাহেবা বাড়ির আম ও বিস্কুট পাঠাইয়াছেন। এতগুলি কি করে একলা মানুষ খাব? ভালই হয়েছে কয়েদিগুলিকে খাওয়াতে পারব, ওদের কিসমত তো ফাঁকা। বৎসরে দয়া করে যদি একদিন আম দেওয়াও হয় সেগুলি বাজারের সকলের নিকৃষ্ট। কন্ট্রাকটার সরবরাহ করে থাকেন কিনা! কাজেই বুঝতেই পারেন কি আম দেওয়া হয়। আম কেটে যারা সামনে বসে কাজ করে তাদের সকলকে কিছু কিছু দিতে বললাম। আর আমায় যারা দেখাশোনা করে তাদের জন্য তো আছেই।
বই নিয়ে বসেছি। জমাদার সাহেব ও কম্পাউন্ডার সাহেব এলেন। বসলেন আমার ঘরে। বললাম, খবর কি? দেশে খুব পানি হয়েছে, ফসলের কি হবে বলা যায় না। কম্পাউন্ডার সাহেব বললেন, একটা মেয়ে ও একটা ছেলেকে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছিল। দু’জনে প্রেম করে বিবাহ করেছিল। মেয়ের বাবা মামলা করে দু’জনকে গ্রেপ্তার করে আনিয়েছে। আজ ছেলেটা মামলায় জিতেছে। মেয়েটাকে নিয়ে চলে গিয়েছে, গাড়ি নিয়ে এসেছিল। মেয়েটার খুব ফুর্তি। কম্পাউন্ডার সাহেবও খুব খুশি হয়েছেন বলে মনে হলো। বললাম, আপনিও খুব খুশি হয়েছেন দেখছি! বললেন, ওদের দুজনের আনন্দ দেখে আমার খুব ভাল লেগেছে। বললাম, ‘প্রথম জীবনের উন্মাদনায় এই রকমের হয়ে থাকে, কিন্তু ফলাফল শেষ পর্যন্ত বেশি ভাল হয় না। এমন অনেক প্রমাণ আছে। ছেলে ও মেয়ে একে অন্যকে পছন্দ করে বিবাহ করুক তাতে আপত্তি নাই, তবে উদ্ধৃঙ্খলতা এসে গেলে সমাজ ধ্বংস হতে বাধ্য। দেখা গেছে এমন অনেক হয়েছে শেষ পর্যন্ত সুখী হতে না পেরে অনেক অঘটন ঘটেছে। তাই আজকাল দেখবেন আমাদের সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। যার পরিণাম ভাল না। শুরুও হয়ে গেছে এ দেশে এর ফলাফল। নারী শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, নারী শিক্ষা না হলে দেশের মুক্তি আসতে পারে না। কিন্তু শিক্ষার নামে যে নির্লজ্জতা বেড়ে যেতেছে এদিকেও সমাজের নজর দেওয়া উচিত। ওর কাজ আছে, আমার মতো সরকারের অতিথি উনি নন, তাই চলে গেলেন। বহু ইনজেকশন দিতে হবে।
