জমাদার সাহেব এসে হাজির হয়েছেন। বন্ধ করতে শুরু করেছেন, এমন সময় ডিপুটি জেলার সাহেব এলেন আমাকে দেখতে। তাকে নিয়ে দুইখানা চেয়ার নিয়ে ঘাসের উপর বসলাম। বোধহয় আজই ঘাসের উপর চেয়ার নিয়ে দুইজন বসলাম। একা আমি প্রায়ই বসে থাকি, একাই তো থাকি। তাকে বললাম, আমার অন্যান্য সহকর্মীদের খাওয়ার খুব কষ্ট হতেছে একটা কিছু করেন। চোর ডাকাতের থেকেও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা খারাপ হয়ে গেছে? তাদের কষ্ট দিতেই হবে? তিনি বললেন, আমাদের বলে আর লাভ কি! আমরা তো হুকুমের চাকর। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। খট করে তালাবন্ধ। আমিও বই আর খাতা নিয়ে বসলাম।
২৪শে জুন ১৯৬৬ ॥ শুক্রবার
ভোরে ঘুম থেকে উঠতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। উঠতে ইচ্ছাই হয় না। মেট চা নিয়ে এসে হাজির। বিছানায় বসেই চা খেলাম। দেখলাম আকাশের অবস্থা ভাল। আমার ঘরের দরজার কাছে একটা কামিনী ও একটা শেফালী গাছ। কামিনী যখন ফুল দেয় আমার ঘরটা ফুলের গন্ধে ভরে থাকে। একটু দূরেই দুইটা আম আর একটা লেবু গাছ। বৃষ্টি পেয়ে গাছের সবুজ পাতাগুলি যেন আরও সবুজ আরও সুন্দর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড় ভাল লাগল দেখতে। মাঠটা সবুজ দূর্বায় ভরে উঠেছে। তারপর গাছগুলি, বড় ভাল লাগলো। বাইরেই যেয়ে বসলাম। দেখলাম এদের প্রাণ ভরে। মনে হলো যেন নতুন রূপ নিয়েছে। মোরগ মুরগির বাচ্চা ও কবুতরটা মাঠটা ভরে ঘুরে
বেড়াচ্ছে।
একজন এসে বলল, আপনার দলের সুলতান কে? তাকে আজ ভোরে নিয়ে এসেছে গ্রেপ্তার করে। ঢাকায় বাড়ি। বললাম, বুঝেছি। সুলতান আওয়ামী লীগ অফিসের ‘Whole time worker’, সকল সময়ের কর্মী। বড় নিঃস্বার্থ কর্মী সমস্ত ঢাকা শহর তার নখদর্পণে। প্রত্যেকটা কর্মী ও তাদের বাড়ি ও চিনে। কাজ করতে কখনও আপত্তি করে না। দিন রাত সমানে কাজ করে যায়। হুকুম দিলেই তামিল করে। নিজস্ব একটা মতবাদও আছে।
সুলতানের ফুফুই সুলতানদের তিন ভাইকে মানুষ করেছে। এদের সাথে আমার বড় মধুর সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৫৪ সালে যখন আমি মন্ত্রী হলাম—শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের মন্ত্রিসভায়; কয়েকদিন পরেই মন্ত্রীত্ব ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার ১৯২-ক ধারা জারি করল। হক সাহেবকে বাড়িতে বন্দি করল, আমাকে মিন্টু রোডের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে আনল। আমার স্ত্রীও তখন নতুন ঢাকায় এসেছে। বাংলাদেশ ভাগ হওয়ার পূর্বে যদিও কলিকাতা গিয়াছে কয়েকবার আমাকে দেখতে, কিন্তু ঢাকায় সে একেবারে নতুন; সকলকে ভাল করে জানেও না। মহাবিপদে পড়লো। সরকার হুকুম দিয়েছে ১৪ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে। টাকা পয়সাও হাতে নাই বেশি। বাড়ি ভাড়া কোথায় পাওয়া যায়। তখন বন্ধু ইয়ার মহম্মদ খান, হাজী হেলালউদ্দিন সাহেবের মারফতে এই সুলতানের নাজিরা বাজারের বাড়ি ভাড়া করে দেয়। পাশের বাড়িতে সুলতানরা তিন ভাই আর ফুফু থাকতো। বৃদ্ধা ভদ্র মহিলা আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের এত আদর করতেন—যে না দেখেছে সে কল্পনাও করতে পারবে না। পুলিশ তো প্রায়ই আমার বাড়িতে আসতো, কোনো আত্মগোপনকারী কর্মী আশ্রয় নিয়েছে কিনা জানতে। এক জাত কর্মচারী আছে সুযোগ সন্ধানী, যখন যেমন তখন তেমন’। এরা তেমনি।
ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে মহা বিপদেই পড়ে গেল আমার স্ত্রী। সেই হতে এই সুলতানদের সাথে আমার ফ্যামিলির ঘনিষ্ঠতা হয়ে রয়েছে। আমরা ও আমার ছেলেমেয়েরা এদের কোনো দিন ভুলি নাই। আর আমরা বুড়িকে নানী বলি। কোনো কিছু ভাল পাক হলে আমাদের না দিয়ে খায় না। সুলতানও আমার কাছে থাকে। পার্টির কাজ করে। আমার মনে হয় সুলতান গ্রেপ্তার হওয়াতে পার্টির খুবই ক্ষতি হয়েছে। সকল কর্মকর্তা, কর্মীদেরও গ্রেপ্তার করছে দেখে মনে হয় অফিসের পিয়নটাকেও গ্রেপ্তার করতে পারে! মোনায়েম খান সব পারেন। তিনি পারেন না এমন কোনো কাজ নাই দুনিয়াতে। আইয়ুব খান সাহেব ভাল লোকই পেয়েছেন, রতনে রতন চেনে! তবে উপকার থেকে ক্ষতিই বেশি হবে। শীঘ্রই প্রমাণ পাবেন, কিছুটা পেয়েছেনও বটে!
সুলতানকে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের কাছে রাখে নাই। রেখেছে। অন্যান্য ডিপিআরদের সাথে।
দুপুরে কাগজ এলে মর্নিং নিউজে দেখলাম করাচী আওয়ামী লীগ সভাপতি বিবৃতি দিয়েছেন। তাতে লিখেছেন, জেল থেকে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান, মালিক গোলাম জিলানী, খাজা মহম্মদ রফিক, জনাব সিদ্দিকুল হাসান তাকে জানাইয়াছে যে, তারা শেখ মুজিবুরের ৬ দফা প্রস্তাব সমর্থন করেন এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো মতানৈক্য নাই। আমি জানি সত্যের জয় একদিন হবেই। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইরাও একদিন এই ৬ দফা সমর্থন করে পাকিস্তানকে মজবুত করবেন। সারা পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের উপর জুলুম চলছে। সেখানে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নাই। আজ পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ নেতারা কারাগারে বন্দি। আওয়ামী লীগ আজ জেলখানায়। মানুষকে জেলে নিতে পারে কিন্তু নীতিকে জেলে নিতে পারে না।
কনভেনশন মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি জনাব আসলাম খান। বোধ হয় পূর্বে কেহ এই ভদ্রলোকের নাম শোনেন নাই, নতুন আমদানি। জনাব বলেছেন, সারা বাংলা ঘুরে ৬ দফার সমর্থক পেলেন না। বন্ধু একটু ধীরে চলুন, বাংলাদেশকে চিনতে এখনও আপনার বহুদিন লাগবে! বেশি দালালি করে লাভ নাই। ভুট্টো সাহেবের অবস্থা দেখেও শিখলেন না! আপনার পূর্বে আরও কয়েকজন সেক্রেটারি বড় বড় বক্তৃতা করেছেন, তারা কোথায়? বোধ হয় এখন আর খোজ খবর নাই।
