আজ নাস্তা খেয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। কারণ বৃষ্টি হতেছে ভীষণভাবে। মনে হয় আকাশ ফেটে গিয়েছে। ঘুমাতে পারলাম না। পুরানা কাগজগুলি পড়তে লাগলাম—যা সামান্য বাকি ছিল। তারপর আবার চা। আবার বই নিয়ে বসা। বৃষ্টি হলে একাকী খুবই খারাপ লাগে। সময় যেতেই চায় না। ১২টায় সিকিউরিটি জমাদার সাহেব এলেন, কিছু বাজার করতে হবে, বিস্কুট চাই, মুড়ি চাই, আমার বাড়িতে মুড়ি খাবার অভ্যাস। বাড়িতে খবর দিলে পাঠাইয়া দিতো। কষ্ট দিতে ইচ্ছা হয় না বেচারীকে। সকল কিছুই তো তার করতে হয়, আমি তো মুসাফির। বাড়িতে আমি বেগম সাহেবার মুসাফির। এখানে সরকারের মুসাফির।
আমি বাইরে যেয়ে হাঁটতে লাগলাম, কারণ বৃষ্টি থেমে গেছে। এই সুযোগ ভাল করে ব্যবহার করলাম। একমাত্র পরিশ্রম।
গোসল করে এসে ভাত খেয়ে আবার বই নিয়ে বসলাম। জেল লাইব্রেরি থেকে কয়েকখানা বই দিয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে কাগজ এল। দেখলাম হাইকোর্টে মামলা করেছে নিউ নেশন প্রেস বাজেয়াপ্ত করার বিরুদ্ধে ও মানিক ভাইকে বন্দি করার বিরুদ্ধে।
২৩শে জুন ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার
মিজানুর রহমান চৌধুরী এম. এন. এ-কে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদক ছিল। মনে হতেছে কাহাকেও বাইরে রাখবে না। এখন সমস্ত পাকিস্তান, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান তো একটা বড় কারাগার’। কথা বলার শক্তি নাই। জেলায় জেলায় ১৪৪ ধারা। ইত্তেফাক প্রেস বাজেয়াপ্ত। তফাজ্জল হোসেন (মানিক ভাই)কে গ্রেপ্তার করে আলাদা রাখার ব্যবস্থা। গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ঝুলছে কর্মীদের বিরুদ্ধে। মিজানকে এনেও দশ সেলে রাখা হয়েছে। ডিভিশন আসতে কমপক্ষে ১৫ দিন সময় লাগে, এই কয়দিন যে খাওয়া দেয় তা নাই বললাম। অপেক্ষা করে আছি কতজনকে আনবে জেলে। তবু দাবি আদায় হবে, রক্ত যখন বাঙালি দিতে শিখেছে।
বন্যা ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। চাউলের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা মন হয়ে গেছে। জনগণের আর শান্তি নাই। শান্তি চেয়ে আনা যায় না, আদায় করে নিতে হয়। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। অত্যাচারী ভয় পেয়ে যাবে। যে অত্যাচার করে টিকে থাকতে চায় তার মেরুদণ্ড খুব দুর্বল। আঘাত করলেই ভেঙে যাবে।
আজকাল কাগজে আর রাজনৈতিক খবর পাওয়া যায় না-বোধ হয় তা বন্ধই করে দিয়েছে। জুলুম প্রতিরোধ দিবসের সংবাদ ছাপাইতে পারবে না। দাও না বন্ধ করে আওয়ামী লীগের অফিসের দরজা। কাহাকেও যখন বাইরে রাখবা না, তখন আর অফিসের দরকার কি?
দুপুরের দিকে সূর্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করছে। রৌদ্র একটু উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভাল লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দূর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠেছে। সবুজ ঘাসগুলি বাতাসের তালে তালে নাচতে থাকে। চমৎকার লাগে, যেই আসে আমার বাগানের দিকে একবার না তাকিয়ে যেতে পারে না। বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলি না তুললে আসল গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে, এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়। আমি লেগেই থাকি। কুলাতে না পারলে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনি। আজ বিকালে অনেকগুলি তুললাম।
আমার মোরগটা আর দুইটা বাচ্চা আনন্দে বাগানে ঘুরে বেড়ায় আর ঘাস থেকে পোকা খায়। ছোট কবুতরের বাচ্চাটা দিনভর মোরগটার কাছে কাছে থাকে। ছোট মুরগির বাচ্চারা ওকে মারে, কিন্তু মোরগটা কিছুই বলে না। কাক যদি ওকে আক্রমণ করতে চায় তবে মোরগ কাকদের ধাওয়া করে। রাতে ওরা একসাথেই পাকের ঘরে থাকে। এই গভীর বন্ধুত্ব ওদের সাথে। এক সাথে থাকতে থাকতে একটা মহব্বত হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ অনেক সময় বন্ধুদের সাথে বেঈমানী করে। পশু কখনও বেঈমানী করে না। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় পশুরাও বোধ হয় মানুষের চেয়ে একদিক থেকে শ্রেষ্ঠ।
চা বানাতে বললাম। আজ যাকে পাওয়া যায় তাকেই চা খাওয়াতে বললাম। সাধারণ কয়েদিরা একটু চায়ের জন্য কত ব্যস্ত। তাই আমি বলে দিয়েছি যে-ই চা খেতে চাইবে তাকেই দিবা। আমার মেটটা একটু কৃপণ, সহজে কিছু দিতে চায় না। যদি আমার কম পড়ে যায়, বাইরের থেকে আসতে দেরি হলে অসুবিধা হবে। তাকে বলে দিয়েছি, কম পড়ে পড়ক, আনতে দেরি হয় হউক, চাইলে দিতে হবে। কিইবা আমি দিতে পারি, এই নিষ্ঠুর কারাগারে।
বিকালে আজ আবার নতুন করে কেডস সু পরে হাঁটতে শুরু করলাম। না হাঁটলে তো খাওয়াই হজম হবে না। ব্যায়াম আমার প্রয়োজন। তাই সময় পেলেই একটু ঘোরাঘুরি করি। পাশের ২০ সেলে পাবনার সাংবাদিক রণেশ মৈত্র থাকেন। ল’ পরীক্ষা দিতে এসেছেন পাবনা থেকে এখানে, আজ শেষ পরীক্ষা হয়ে গেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন পরীক্ষা দিলেন?’ বললেন, মন্দ হয় নাই। আমার সামনে দিয়েই তার যেতে হয়, যেখানে থাকেন। সেইখানে। রণেশ বাবু যে কোনোদিন পাবনা চলে যাবেন। তবুও মাঝে মাঝে দূর থেকে দেখা হতো ভদ্রলোকের সাথে। বাবু চিত্ত সুতার খবর দিলেন, রণেশ বাবু গেলেও তার একলা থাকতে আপত্তি নাই। কারণ দূর থেকে হলেও আমার সাথে দেখা হয়। জেল কর্তৃপক্ষকে বলতে বললেন। আমার কথা তারা শুনবে কেন? সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।
