মানিক ভাই ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের রাখা হয়েছে আমার থেকে অনেক দূরে। দেখা হওয়ার উপায় নেই। ১০ সেলে মানিক ভাই ও সহকর্মীরা কি করে আছে ভাবতে আমার কষ্টই হয়। নিচু সেল, জানলা নাই, একটা দরজা তাও আবার সামনে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। উপরের থেকে নাকি হুকুম আসে কাকে কোথায় রাখতে হবে। জেল কর্তৃপক্ষের হাতে কিছুই নাই। আমি প্রতিবাদ করলাম। আমার কাছে না দেয় তাতে আপত্তি নাই, কিন্তু এমন জায়গা দেওয়া হউক যেখানে তাহারা মানুষের মতো বাস করতে পারেন। জেল কর্তৃপক্ষকে বলে বলে হয়রান হয়ে গেছি। তবে আমার কাছে খবর আছে, এক ভদ্রলোক বলে দেন কোথায় কাকে রাখতে হবে।
মানিক ভাইয়ের লেখা পড়ব না এটা আমার একটা দুঃখ। দিন যে কিভাবে কেটে গেল বলতেও পারি না। খবরের কাগজে মানিক ভাইয়ের গ্রেপ্তারের কোনো খবর নাই। বোধ হয় খুব ভোরে গ্রেপ্তার করেছে।
সমস্ত পূর্ব বাংলায় এবারও বন্যা হবে। সিলেট তো শেষই হয়ে গিয়াছে বলে মনে হয়। ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বগুড়া, রংপুর, পাবনায়ও বন্যা হবে। ঢাকাও বাদ যেতে পারে না। পূর্ব বাংলার লোকের দশা কি হবে তাই ভাবছি। এর উপর আবার করের বোঝা সরকার চাপাইয়া চলছে।
১৭ই জুন ১৯৬৬ ॥ শুক্রবার
ভীষণ বৃষ্টি। বাইরে যাওয়ার উপায় নাই। বারান্দায় ঘুরলাম, বারান্দায় কয়েকজন কয়েদি আশ্রয় নিয়েছে। একজন খবর দিল রফিক সাহেব নামে আমাদের দলের একজন নেতা এসেছেন। তাকেও দশ সেলে রাখা হয়েছে। চলেছে গ্রেপ্তার সমানে। মনে হয় মোনায়েম খান সাহেব ৭ তারিখের পরে আরও ক্ষেপে গেছেন। বোধ হয় ভুলে গেছেন, যে লোক বেশি রাগান্বিত ও অধৈর্য হয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত তাকেই হারতে হয়। মাথা ঠান্ডা রেখে যে সংগ্রাম চালাইয়া যায় শেষ পর্যন্ত তারই জয় হয়। রফিক আমার বহুদিনের সহকর্মী। কলিকাতা থেকেই একসাথে রাজনীতি করেছি। তবে মাঝে অনেকবার এদিক ওদিক করেছে। সেই জন্য সহকর্মীদের মধ্যে অনেকে ওকে বিশ্বাস করতে চায় না। এবার যখন আবার আওয়ামী লীগে ফিরে এল তখন সত্যই ওকে আমি বিশ্বাস করেছি, কারণ এখন আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাবার কোনো সম্ভাবনা নাই। কোনোদিন ওকে কেহ গ্রেপ্তার করতে পারে নাই। ১৯৪৯, ১৯৫২, ১৯৫৪ প্রত্যেক বারেই রফিক কেটে পড়েছে। তাই মনে মনে বললাম, ‘বার বার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান?’ এবার যে সে ভাগতে চেষ্টা করে নাই, তার প্রমাণও পেয়েছি। সভা সমিতিতে যেয়ে জোর বক্তৃতা করেছে আমাদের গ্রেপ্তারের পরেও। মনে হয় আওয়ামী লীগের কাকেও আর বাইরে রাখবে না। বোধ হয় এখনও অনেককে ধরতে চেষ্টা করছে। কেউ কেউ বোধ হয় আত্মগোপন করে কাজ চালাইয়া যেতেছে।
মানিক ভাইয়ের কাছেই রেখেছে রফিককে। ভালই হয়েছে একজন সাথী পেয়েছেন। যারা ১০ সেলে আছে তারা মানিক ভাইকে সমীহ করে চলে। নিশ্চয়ই দূরে দূরে থাকতে চেষ্টা করবে।
ন্যাপ দলীয় মশিউর রহমান আইন পরিষদে যাহা বলিয়াছেন তাহাতে কোনো লোক আশ্চর্য না হয়ে পারবে না। সরকারি দলের সমর্থকরা যাহা বলিয়াছেন তিনি সেই কথাগুলি আরও জোরে জোরে বলিয়াছেন। তিনি তাদের সুরে সুর মিলাইয়া বলিয়াছেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে গোলমাল সৃষ্টি করার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগ (সিআইএ) অর্থ প্রদান করিয়াছে। গত সপ্তাহে প্রদেশে যে ধর্মঘট হইয়াছে তাহাতে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের অর্থ সাহায্য দেওয়া হইয়াছে বলিয়া তিনি জানান। এরা আবার প্রগতির কথা বলে! পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি, রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি, শ্রমিক ও কৃষকদের দাবি আজ নূতন নয়। তিনি যখন ১৯৪৭-৫৭ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন, প্রত্যেকটা গণআন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য রংপুরে গুন্ডা লেলাইয়া দিতেন। বাংলা ভাষার আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য নিজে কর্মী ও ছাত্রদের উপর গুন্ডামি করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের টিকিট নিয়ে যখন জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল তখন ১৯৫৬ সালে পৃথক নির্বাচন সমর্থন করে মুসলিম লীগের ঝান্ডা নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। সারাজীবন দালালির রাজনীতি করে বেড়াইয়াছেন, আবার রাতারাতি ১৯৫৭ সালে ‘প্রগতিবাদী হয়ে ন্যাপে যোগ দিয়াছেন। আর যারা এই স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের জন্য সারাজীবন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছে এবং মামলার আসামি বা রাজবন্দি হিসেবে বৎসরের পর বৎসর কারাগারে কাটাইয়াছে, তাদের সম্বন্ধে এই সমস্ত নীচ কথা উচ্চারণ করা তার পক্ষেই সম্ভবপর। সরকারের সাথে গোপনে পরামর্শ করে যে লোক জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়, রাওয়ালপিন্ডি আর করাচী ঘুরে পারমিটের ব্যবসা করে বেড়ায়, তাহার কাছে একটা সংগ্রামী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে এবং জনগণের গণআন্দোলন সম্বন্ধে এই সব কথা শোভা পায় কিনা জনগণ বিচার করবে।
আজ এতগুলি লোক গুলি খেয়ে জীবন দিল। শত শত লোক কারাগারে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। শত শত লোকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ঝুলছে। শত শত মামলা ছাত্র রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে সে সম্বন্ধে কোনো সহানুভূতি যে পার্টির নেতারা দেখান না, তাদের পক্ষে সবই সম্ভবপর। আমি জানি এই সকল কথা বললে এরা পিন্ডি বসে পারমিটের ব্যবসা করার আরও সুযোগ পাবে। কত হাজার টন সিমেন্টের পারমিট করাচী থেকে এনে কার কাছে বিক্রি করেছেন—একথাও আমার জানা আছে। আমি বন্দি, আমার সহকর্মীরা বন্দি, তা না হলে তাকে ও তাদের নেতাদের কি উত্তর দিতে হয় তা আমি জানি। জনগণ তাদের পিছনে নাই, এখন উপরতলার রাজনীতি করেন। শুধু সাম্রাজ্যবাদ’ বলে চিৎকার করে আর সাম্রাজ্যবাদের দালালদের তলে তলে সমর্থন করে সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংস করা যাবে না। গণআন্দোলনে বিশ্বাস করেন, জনগণের উপর নির্ভর করেন। ৬ দফা শুনে ঘাবড়াবেন না, এ দাবি জনগণের দাবি। আপনার ‘নেতা মওলানা ভাসানী সাহেবকে ময়দানে নামান। আইয়ুব সাহেবের দলে তো আপনারা আছেনই এবং সাহায্য নিয়ে থাকেন। অবস্থা কি আপনাদের? এ নেতার সম্বন্ধে আমার এতখানি না লেখলেও চলত, কারণ এদের কথার দাম বাঙালি দেয় না। আন্দোলন কখনও বাইরে থেকে আমদানি হয় না। বাংলাদেশের লোকের প্রাণ আছে। পারমিটের টাকা দিয়া গণআন্দোলন হয় না। আপনার জানা উচিত সিআইয়ের এজেন্টরাই পাকিস্তান শাসন করছে। নূতন এজেন্টের দরকার হয় নাই, আর হবেও না। আর দরকার হলেও আপনাদের মতো এজেন্ট অনেক পাবে তারা। কারণ তারা বোধ হয় জানে আপনাদের চরিত্র। এজেন্সির রাজনীতি আপনাদের নেতারাই করে থাকেন।
