যেদিন বাচ্চাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়, ওরা চলে যাবার পরে মন খারাপ লাগে। আমাদের মতো ‘দাগী’দেরও মন খারাপ হয়। পরে আবার ঠিক হয়ে যায়।
১৬ই জুন ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার
ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম ইত্তেফাক কাগজের কোনো এক বড় অফিসারকে গ্রেপ্তার করে এনেছে। ভাবলাম কে হবে, মানিক ভাই ছাড়া! খবর কেহই সঠিক বলতে পারছে না। পাগলের মতো সকলকেই জিজ্ঞাসা করলাম। কেহই ঠিক মতো বলতে পারে না। এমনভাবে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। আমি চুপ করে বসে আছি, খবর আমাকে জানতেই হবে। বুঝতে পেরেছি মানিক ভাই, কিন্তু পাকাপাকি খবর পাচ্ছি না। একটু পরেই একজন বলল, তফাজ্জল হোসেন সাহেবকে ভোরবেলা নিয়ে এসেছে। ১০ নম্বর সেলে রেখেছে। আমার মনে ভীষণ আঘাত লাগল খবরটায়। এরা মানিক ভাইকেও ছাড়ল না? এরা কতদূর নেমে গেছে। পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে তার স্থান খুবই উচ্চে। তাঁর কলমের কাছে বাংলার খুব কম লেখকই দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক সমালোচনার তুলনাই হয় না। তার নিজের লেখা রাজনৈতিক মঞ্চ, পড়লে দুনিয়ার অনেক দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বুঝতে সহজ হয়। সাধারণ লোকেরও তাঁর লেখা বুঝতে কষ্ট হয় না। তাকে এক অর্থে শ্ৰেষ্ঠ কথাশিল্পী বলা যেতে পারে।
তিনি কোনোদিন সক্রিয় রাজনীতি করেন নাই। তার একটি নিজস্ব মতবাদ আছে। সত্য কথা বলতে কাহাকেও তিনি ছাড়েন না। আইয়ুব খান সাহেবও তাকে সমীহ করে চলেন। তিনি মনের মধ্যে এক কথা আর মুখে এক কথা বলেন না। তিনি হঠাৎ রেগে যান, আবার পাঁচ মিনিট পরে শান্ত হয়ে পড়েন। কেহ ভাবতেই পারবেন না তাহার মুখ খুবই খারাপ, মুখে যাহা আসে তাহাই বলতে পারেন। অনেক সময় আমার তার সাথে মতের অমিল হয়েছে। গালাগালি ও রাগারাগি করেছেন, কিন্তু অন্য কেহ আমাকে কিছু বললে, আর তার রক্ষা নাই, ঝাপাইয়া পড়েন। আমাকে তিনি অত্যধিক স্নেহ করেন। আমিও তাকে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করি। কোনো কিছুতে আমি সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে তার কাছে ছুটে যাই। তিনিই আমাকে সঠিক পথ দেখাইয়া দেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুর পরে তাঁর কাছ থেকেই বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে থাকি। কোনো লোভ বা ভ্রুকুটি তাকে তাঁর মতের থেকে সরাতে পারে নাই। মার্শাল ল’র সময়ও তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে নেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে গ্রেপ্তার করার পরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আবার আজও তাঁকে গ্রেপ্তার করে এনেছে। তার উপর অনেকেরই ঈর্ষা এবং আক্রোশ রয়েছে।
এরা অনেকেই মনে করে আমি যাহা করি সকল কিছুই তাঁর মত নিয়ে করে থাকি। আমার দরকার হলে আমিই তাঁর কাছে যাই পরামর্শের জন্য। তিনি কখনও গায়ে পড়ে কোনোদিন পরামর্শ দেবার চেষ্টা করেন নাই। তবে তাঁর সাথে আমার মনের মিল আছে, কারণ ২৫ বৎসর এক নেতার নেতৃত্ব মেনে এসেছি দুইজন। অনেকেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে বেইমানী করেছেন। আমরা দুইজন একদিনের জন্যও তার কাছ থেকে দূরে যাই নাই। পাকিস্তানের বিশেষ করে পূর্ব বাংলার জনসাধারণের জন্য ইত্তেফাক যা করেছে তা কোনো খবরের কাগজই দাবি করতে পারে না। এদেশ থেকে বিরুদ্ধ রাজনীতি মুছে যেত যদি মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাক না থাকতো। একথা স্বীকার না করলে সত্যের অপলাপ করা হবে। ১৯৫৮ সালের মার্শাল ল’ জারি হওয়ার পর থেকে হাজার রকমের ঝুকি লইয়াও তিনি এদেশের মানুষের মনের কথা তুলে ধরেছেন।
ছয় দফার আন্দোলন যে আজ এত তাড়াতাড়ি গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে এখানেও মানিক ভাইয়ের লেখনী না হলে তা সম্ভব হতো কিনা তাহা সন্দেহ! আমি যাহা কিছু করি না কেন, তাহা মানিক ভাইয়ের দোষ, সরকারের এটাই ভাবনা ! ভারতবর্ষ যখন পাকিস্তান আক্রমণ করল তখন যেভাবে ইত্তেফাক কাগজ সরকারকে সমর্থন দিয়েছে এবং জনগণকে উদ্বুব্ধ করেছে-ত্যাগের জন্য ও মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য, ইত্তেফাকের পাতা খুললেই তাহা দেখা যাবে। তবুও আজ তাকে ডিপিআরএ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন বুঝতে কারও বাকি নাই কেন জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করছেন না সরকার। দেশরক্ষা করার জন্য যে আইন করা হয়েছিল সে আইন আজ রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। খবরের কাগজের স্বাধীনতার উপর পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করিতেছে। এমনকি মানিক মিয়ার মতো সম্পাদককেও দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করতে একটু লজ্জা করল না। তফাজ্জল হোসেন সাহেব, যাকে আমরা সকলে মানিক ভাই বলে ডাকি তিনি শুধু ইত্তেফাকের মালিক ও সম্পাদক নন, তিনি আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের পাকিস্তান শাখার সভাপতি এবং প্রেস কোর্ট অব অনারের সেক্রেটারি।
১৯৫৯ সালে আমি যখন জেলে ছিলাম আমাকে তখনও একাকী রাখা হয়েছিল। মানিক ভাইকে গ্রেপ্তার করে পুরানো ২০ সেলে রাখা হয়েছিল। সকালে ও বিকালে কয়েক মুহুর্তের জন্য আমার সাথে তার দেখা হতো। তখন তিনি বোধ হয় একমাস কি দেড়মাস ছিলেন। মানিক ভাইকে খুবই কষ্টে রাখা হয়েছিল। ১৯৬২ সালে গ্রেপ্তার হয়ে তাকে আমি জেল গেটে এসে পাই। যতদিন জেলে ছিলাম একসাথেই ছিলাম। সকলে খালাস হয়ে গেলেও আমি আর মানিক ভাই ছিলাম। মানিক ভাই অসুস্থ হয়ে বাইরের হাসপাতালে গেলে আমি একলাই ছিলাম। কয়েকদিন পরেই আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আজ আমাকে রাখা হয়েছে সেল এলাকায়। এখানে ভয়ানক প্রকৃতির লোক, একরারী আসামি, জেল আইন ভঙ্গ করার জন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামি, আর পাগলা গারদ। এই এরিয়ার সবগুলোই সেল। মোট ৯৩টা সেল আছে। আমার ঘরটা বাদে। এটা সেল না, সেলের থেকে একটু বড়। তবে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে উঁচু দেয়াল। শুধু সুবিধা হলো ঘরটার সামনে কিছু জায়গা আছে। কিছু গাছ-গাছালি আছে বলে ফুলের ও ফলের বাগান করতে পারি। এদের কাছে থাকতে আমার আপত্তি নাই, কারণ বোধ হয় নিজেও আমি ‘ভয়ানক’ প্রকৃতির লোক। মানে ভয়ডর একটু কম।
