ইত্তেফাক কাগজ আসে নাই। এর পরিবর্তে আমাকে ‘দৈনিক পাকিস্তান’ দিয়েছে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলল, কাগজ বন্ধ, সরকার নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। আর খবর পেলাম রাতে মানিক ভাইয়ের কাছে একটা নোটিশ দিয়ে গিয়াছে। আমার মনে হলো সরকার নিশ্চয়ই কাগজ বন্ধ করে দিয়েছে। মোনায়েম খান সব পারে, ‘বানরের হাতে শাবল’! যে যতটুকু ক্ষমতা হজম করতে পারে তাকে ততটুকু দেওয়া উচিত। দুঃখের বিষয় ক্ষমতার অপব্যবহার যে সে করবে সে সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। আইয়ুব সাহেব নাকি তাকে পূর্ব বাংলাকে ঠিক রাখার জন্য সব ক্ষমতা দিয়েছেন।
আজ আর সঠিক খবর পেলাম না। মানিক ভাইকে যেখানে রেখেছে, সেখান থেকে খবর আনা খুবই কষ্টকর। এতবড় আঘাত পেলাম তা কল্পনা করতে বোধ হয় অনেকেই পারবে না। প্রথম থেকেই এই কাগজের সাথে আমি জড়িত ছিলাম।
সারাদিন একই চিন্তা। এবার জেলে এসে একদিনও শান্তিতে থাকতে পারলাম না। ঘরে বাইরে করতে করতে দিন চলে গেল। রাতটাও কেটে গেল একই চিন্তায়। আগামীকাল খবরের কাগজ এলে সঠিক খবর পাওয়া যাবে এই আশায় রইলাম। আমি বলে দিয়েছি দৈনিক পাকিস্তান রাখবো না, সংবাদ’ কাগজ যেন দেওয়া হয়। পূর্বে ছিল ইত্তেফাক, আজাদ, অবজারভার, মর্নিং নিউজ আর ডন। এখন সংবাদও আসবে। ইত্তেফাকের কি হবে এখন ঠিক বলতে পারি না।
১৮ই জুন ১৯৬৬ ॥ শনিবার
সূর্য উঠেছে। রৌদ্রের ভিতর হাঁটাচলা করলাম। আবহাওয়া ভালই। তবুও একই আতঙ্ক ইত্তেফাকের কি হবে! সময় আর কি সহজে যেতে চায়। সিপাহি, জমাদার, কয়েদি সকলের মুখে একই কথা, ইত্তেফাক কাগজ বন্ধ করে দিয়েছে।’
ঘরে এসে বই পড়তে আরম্ভ করলাম। এমিল জোলা-র লেখা ‘তেরেসা রেকুইন’ (Therese Raquin) পড়ছিলাম। সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনটা চরিত্রজোলা তাঁর লেখার ভিতর দিয়া। এই বইয়ের ভিতর কাটাইয়া দিলাম দুই তিন ঘণ্টা সময়।
আজ সিভিল সার্জন আসলেন আমাকে দেখতে। শরীরের অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। বললাম ভালই আছি, ভালই থাকতে হবে। তিনি কাজের লোক, দেরি না করে চলে গেলেন। আমিও বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বহুদিন পর্যন্ত দুটি হলদে পাখিকে আমি খোঁজ করছি। ১৯৫৮-৫৯ সালে যখন ছিলাম এই জায়গাটিতে তখন প্রায়ই ১০টা/১১টার সময় আসত, আর আমগাছের এক শাখা হতে অন্য শাখায় ঘুরে বেড়াত। মাঝে মাঝে পোকা ধরে খেত। আজ ৪০ দিন এই জায়গায় আমি আছি, কিন্তু হলদে পাখি দুটি আসল না। ভাবলাম ওরা বোধ হয় বেঁচে নাই অথবা অন্য কোথাও দূরে চলে গিয়াছে। আর আসবে না। ওদের জন্য আমার খুব দুঃখই হলো। যখন ১৬ মাস এই ঘরটিতে একাকী থাকতাম তখন রোজই সকাল বেলা লেখাপড়া বন্ধ করে বাইরে যেয়ে বসতাম ওদের দেখার জন্য। মনে হলো ওরা আমার উপর অভিমান করে চলে গেছে।
খাবার কাজটি কোনোমতে শেষ করে খবরের কাগজের অপেক্ষায় রইলাম। আজও অনেক দেরি হলো কাগজ আসতে। ডিউটি জমাদার সাহেবকে বললাম, আপনি ডিউটিতে আসার পর থেকে কাগজ দেরি করে আসতে শুরু করেছে। কাগজ আসতে দেরি হলে আমার ভীষণ রাগ হয়। দুই এক সময় কড়া কথাও বলে ফেলি।
প্রায় তিনটার সময় কাগজগুলি কয়েদি পাহারা নিয়ে এল। পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন বলে ‘নিউনেশন প্রেস’ বাজেয়াপ্ত করিয়াছে সরকার। এই প্রেস হইতে ইত্তেফাক, ইংরেজি সাপ্তাহিক ঢাকা টাইমস’ ও বাংলা চলচ্চিত্র সাপ্তাহিক ‘পূর্বাণী’ প্রকাশিত হইত। পুলিশ প্রেসে তালা লাগাইয়া দিয়াছে। ইত্তেফাক কাগজ বন্ধ হইয়া গিয়াছে। পূর্বের দিন ইত্তেফাক ও নিউনেশন প্রেসের মালিককে দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করিয়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ১০ সেলে বন্দি করিয়া রাখা হইয়াছে। পূর্ব পাকিস্তানে ইত্তেফাক সকল কাগজের থেকে বেশি ছাপা হয়। এর পাঠকের সংখ্যা অসংখ্য। বাংলার গ্রামে গ্রামে ইত্তেফাক পরিচিত। দেশরক্ষা আইনের বলে অন্য কোনো কাগজকে এত বড় আঘাত করা হয় নাই। ইত্তেফাক কাগজ বন্ধ করে এবং তাহার মালিক ও সম্পাদককে গ্রেপ্তার করে ৬ দফার দাবিকে বানচাল করতে চায়। কিন্তু আর সম্ভব হবে না। এতে আন্দোলন আরও দানা বেঁধে উঠবে। যার পরিণতি একদিন ভয়াবহ হবে বলে আমার বিশ্বাস। কি করে আইয়ুব খান সাহেব মোনায়েম খান সাহেবকে এ কাজ করতে অনুমতি বা নির্দেশ দিলেন আমার বুঝতে কষ্ট হয়।
খবর নিয়ে জানলাম মানিক ভাই প্রস্তুত হয়েই ছিলেন, সে জন্য একটুও মুষড়ে পড়েন নাই। আমি কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কারণ কোনো প্রেসেই আওয়ামী লীগের কোনো প্যামফলেট ও পোস্টার ছাপাইতে দেওয়া হইতেছে না। যে প্রেসই ছাপায় তার মালিককে দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে। প্যামফলেট ছাপানো বেআইনি নয়। এমনকি কালো ব্যাজ ছাপার জন্যে ‘দি বেঙ্গল প্রিন্টিং প্রেসের মালিককে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। বোঝা গেল গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে তারা দিবে না। একদলীয় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। পূর্ব বাংলায় এটা বেশি দিন চলতে পারে না। আন্দোলনকে ভিন্ন গতি নিতে এরা বাধ্য করছে-যা আমরা চাই নাই। ইত্তেফাক বন্ধ হতে পারে কিন্তু ইত্তেফাক যা চায় তা জনগণেরই দাবি এবং মনের কথা।
এখন আর কাগজ পড়তে বেশি সময় আমার দরকার হয় না। মর্নিং নিউজে’র হেড লাইনগুলি দেখলেই বুঝতে পারি কি লিখতে চায়। আজাদ আওয়ামী লীগের কিছু কিছু সংবাদ দেয়। সংবাদ’ তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে যেগুলি দরকার তাই ছাপায়। অবজারভার বোধ হয় একটু ভয় পেয়েছে। আশ্চর্য হয়ে চিন্তা করলাম, খবরের কাগজের সম্পাদকরা আজ পর্যন্ত প্রতিবাদ করে একটি বিবৃতিও দিল না-এমন কি সহকর্মী ইত্তেফাকের সম্পাদকের মুক্তি চেয়েও না। ইত্তেফাককে যদি অত্যাচার করে ধ্বংস করতে পারে তবে কেউই রেহাই পাবে না। একটু সবুর করলেই দেখতে পাবেন। আমার মনে হয়, আমার সহকর্মীরা যারা বাইরে আছেন তারা এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করে যদি দরকার হয়, গ্রেপ্তার হয়ে তাদের জেলে আসা উচিত।
