মওলানা ভাসানী এই সভায় ঘোষণা করলেন, “জনাব লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসছেন অক্টোবর মাসে, আমরা তার সাথে খাদ্য সমস্যা ও রাজবন্দিদের মুক্তির ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যদি তিনি দেখা না করেন আমাদের সাথে, তাহলে আমরা আবার সভা করব এবং শোভাযাত্রা করে তার কাছে যাব।” কয়েকদিন পরেই আমরা কাগজে দেখলাম, লিয়াকত আলী খান ১১ই অক্টোবর ঢাকায় আসবেন। মওলানা সাহেব আমাকে টেলিগ্রাম করতে বললেন, যাতে তিনি ঢাকায় এসে আমাদের একটা ডেপুটেশনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। মওলানা সাহেবের নামেই টেলিগ্রামটা পাঠানো হয়েছিল। জনাব শামসুল হক সাহেব একটু ব্যস্ত ছিলেন, কারণ তার বিবাহের দিন ঘনিয়ে এসেছে। আমাকেই পাটির সমস্ত কাজ দেখতে হত। যদিও তার সাথে পরামর্শ করেই করতাম। তিনি আমাকে বললেন, “প্রতিষ্ঠানের কাজ তুমি চালিয়ে যাও। আমাদের মধ্যে এত মিল ছিল যে কোন ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাই ছিল না। আমি বুঝতে পারতাম মওলানা সাহেব, হক সাহেবকে অপছন্দ করতে শুরু করেছেন। সুযোগ পেলেই তার বিরুদ্ধে বলতেন। আমি চেষ্টা করতাম, যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয়। যদিও মওলানা সাহেব প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পেতেন না। এই সময় একজনের অবদান অস্বীকার করলে অন্যায় করা হবে। বেগম আনোয়ারা খাতুন এমএলএ প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট কাজ করতেন। দরকার হলে টাকা পয়সা দিয়েও সাহায্য করতেন। আতাউর রহমান সাহেবকে ডাকলেই পাওয়া যেত। তিনি পূর্বে রাজনীতি করেন নাই এবং রাজনৈতিক জ্ঞানও তত ছিল না। লেখাপড়া জানতেন, কাজ করার আগ্রহ এবং আন্তরিকতা ছিল। আমার সাথে তার একটা সম্বন্ধ গড়ে উঠতে লাগল। জেলায় জেলায় সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থকরা আওয়ামী লীগে যোগদান করতে শুরু করল। এই সময় কলকাতায় ইত্তেহাদ কাগজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব কলকাতা ত্যাগ করে করাচি চলে গিয়েছেন। মানিক ভাই ঢাকা এসে পৌঁছেছেন প্রায় নিঃস্ব অবস্থায়। তিনিও এসে মোগলটুলীতে উঠেছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব সামান্য কিছু কাপড় ছাড়া আর কিছু নিয়ে আসতে পারেন নাই। ভারত সরকার তাঁর সর্ব ক্রোক করে রেখেছে। অনেকে শুনে আশ্চর্য হবেন, শহীদ সাহেবের কলকাতায় নিজের বাড়ি ছিল না। ৪০ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়ি, ভাড়া করা বাড়ি। তিনি করাচিতে তাঁর ভাইয়ের কাছে উঠলেন, কারণ তাঁর খাবার পয়সাও ছিল না।
ঢাকার পুরানা নেতাদের মধ্যে কামরুদ্দিন সাহেব যোগদান করেন নাই পার্টিতে। তবে আবদুল কাদের সর্দার আমাদের অর্থ দিয়েও সাহায্য করছিলেন। তাঁর অর্থবল ও জনবল দুইই ছিল। ঢাকার খাজা বংশের সাথে জীবনভর মোকাবেলা করেছেন। গরিবদের সাহায্য করতেন, তাই জনসাধারণ তাকে ভালবাসত। আমরা এখনও জেলা কমিটিগুলি গঠন করতে পারি নাই। তবে দু’একটা জেলায় কমিটি হয়েছিল। চট্টগ্রামে এম, এ, আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং যশোরে খড়কীর পীর সাহেব ও হাবিবুর রহমান এডভোকেটের নেতৃত্বে। মশিয়ুর রহমান সাহেব ও খালেক সাহেব সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে তখনও যোগদান করেন নাই। ফরিদপুরে সালাম খান সাহেবের নেতৃত্বে অর্গানাইজিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৯৪৯ সালের ভিতরেই আমরা সমস্ত জেলায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব ঠিক করেছি। ছুটি থাকলেই আমরা সমস্ত জেলায় বের হব। সাড়া যা পাচ্ছি তাতে আমাদের মধ্যে একটা নতুন মনোবলের সৃষ্টি হয়েছিল।
নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান মওলানা সাহেবের টেলিগ্রামের উত্তর দেওয়ারও দরকার মনে করলেন না। আমরা জানতে পারলাম তিনি ১১ই অক্টোবর ঢাকায় আসবেন। তিনি প্রেস রিপোর্টারদের কাছে বললেন, “আওয়ামী লীগ কি তিনি জানেন না।”
আমরা ১১ই অক্টোবর আরমানিটোলা ময়দানে সভা আহ্বান করলাম। আমাদের একটা মাইক্রোফোন ছিল, যখন আমাদের কর্মীরা সভার প্রচার করছিল ঘোড়ার গাড়ি করে নবাবপুর রাস্তায়, তখন বেলা তিনটা কি চারটা হবে, একদল মুসলিম লীগ কর্মী-গুণ্ডাও বলতে পারা যায়, আমাদের কর্মীদের মেরে মাইক্রোফোনটা কেড়ে নিয়ে যায়। একটা ঘোড়ার গাড়িতে মাত্র তিনজন কর্মী ছিল। কোন আইনশৃঙ্খলা দেশে নাই বলে মনে হচ্ছিল। কর্মীরা এসে আমাকে খবর দিল মোগলটুলী আওয়ামী লীগ অফিসে। আমি আট-দশজন কর্মী নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমাদের কর্মীরা কয়েকজনের মুখ চিনতে পেরেছে, কারণ পূর্বে একসাথেই কাজ করেছে। আমি বললাম, “এ তো বড় অন্যায়। চল, আমি এদের কাছে জিজ্ঞাসা করে আসি আর অনুরোধ করি মাইক্রোফোনটা ফেরত দিতে। যদি দেয় ভাল, না দেয় কি করা যাবে! থানায় একটা এজাহার করে রাখা যাবে। আমার সাথে ছাত্রলীগের নূরুল ইসলাম (পরে ইত্তেফাঁকে কাজ করত), আর চকবাজারের নাজির মিয়া এবং আবদুল হালিম (এখন ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক। তখন সিটি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিল) আমরা ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে ওদের অফিসে রওয়ানা হলাম। কারণ, আমি খবর নিলাম ওরা ওখানেই আছে। কো-অপারেটিভ ব্যাংকের উপর তলায়ই তারা ওঠাবসা করে। আমি সেখানে পৌঁছে দেখলাম, ওদের কয়েকজন দাঁড়িয়ে আলাপ করছে। আমি ইব্রাহিম ও আলাউদ্দিনকে চিনতাম, তারাও মুসলিম লীগের কর্মী ছিল আমাদের সাথে। বললাম, “আমাদের মাইক্রোফোনটা নিয়েছ কেন? এ তো বড় অন্যায় কথা! মাইক্রোফোনটা দিয়ে দাও।” আমাকে বলল, “আমরা নেই নাই, কে নিয়েছে জানি না“। নূরুল ইসলামের কাছ থেকেই কেড়ে নেবার সময় এরা উপস্থিত ছিল। নূরুল ইসলাম বলল, “আপনি তো দাঁড়ান ছিলেন, তখন কথা কাটাকাটি চলছিল।”
