শামসুল হক সাহেব অনেক পরিশ্রম করে একটা ড্রাফট ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্রের খসড়া করেছেন। আমাদের নিয়ে তিনি অনেক আলোচনা করেছিলেন। আমরা একমত হয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। কয়েকদিন পর্যন্ত সভা হল। দুই একবার শামসুল হক সাহেবের সাথে ভাসানী সাহেবের একটু গরম গরম আলোচনা হয়েছিল। একদিন শামসুল হক সাহেব ক্ষেপে গিয়ে মওলানা সাহেবকে বলে বসলেন, “এ সমস্ত আপনি বুঝবেন না। কারণ, এ সমস্ত জানতে হলে অনেক শিক্ষার প্রয়োজন, তা আপনার নাই।” মওলানা সাহেব ক্ষেপে মিটিং স্থান ত্যাগ করলেন। আমি শামসুল হক সাহেবকে বুঝিয়ে বললে তিনি বুঝতে পারলেন, কথাটা সত্য হলেও বলা উচিত হয় নাই। ফলে হক সাহেব নিজে গিয়ে মওলানা সাহেবকে অনুরোধ করে নিয়ে আসলেন। শামসুল হক সাহেবের রাগ বেশি সময় থাকত না।
মওলানা ভাসানী সাহেবকে ভার দেওয়া হয়েছিল ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের নমিনেশন দিতে। তিনি যে সমস্ত লোককে নমিনেশন দিয়েছিলেন তা আমার মোটেই পছন্দ ছিল না। তাকে আমি বললাম, “আপনি এ সমস্ত লোক কোথায় পেলেন, আর ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য করলেন; এরা তো সুযোগ পেলেই চলে যাবে।” মওলানা সাহেব বললেন, “আমি কি করব? কাউকেই তো ভাল করে জানিও না, চিনিও না। তোমার ছাত্ররা যাদের নাম দিয়েছে, তাদেরই আমি সদস্য করেছি।” আমি বললাম, “দেখবেন বিপদের সময় এরা কি করে!” ওয়ার্কিং কমিটি ড্রাফট ম্যানিফেস্টো গ্রহণ করল এবং কাউন্সিল সভা ডেকে একে অনুমোদন করা হবে ঠিক হল। ড্রাফট ম্যানিফেস্টো ছাপিয়ে দেওয়া হবে, কারও কোন প্রস্তাব থাকলে তাও পেশ করা হবে। জনমত যাচাই করার জন্য আমরা ড্রাফট রাখলাম। তাতে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দিবার প্রস্তাব করা হল। কেবলমাত্র দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকবে। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে এ কথাও বলা হল। আরও অনেক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছিল।
আমরা প্রতিষ্ঠানের কাজে আত্মনিয়োগ করলাম। মওলানা সাহেব, শামসুল হক সাহেব ও আমি ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমায় প্রথম সভা করতে যাই। জামালপুরের উকিল হায়দার আলী মল্লিক সাহেব আওয়ামী লীগ গঠন করেছেন। ছাত্রনেতা হাতেম আলী তালুকদার যথেষ্ট পরিশ্রম করেছিল এই সভা কামিয়াব করার জন্য। আমরা যখন সভায় উপস্থিত হলাম তখন বিরাট জনসমাগম হয়েছে দেখতে পারলাম। যখনই সভা আরম্ভ হবে, দশ-পনেরজন লোককে চিৎকার করতে দেখলাম। আমরা ওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সভা আরম্ভ করলাম। জামালপুরের নেতারা ঠিক করেছিল শামসুল হক সাহেব সভাপতিত্ব করবেন আর মওলানা সাহেব প্রধান বক্তা হবেন। সভা আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথেই ১৪৪ ধারা জারি করা হল। পুলিশ এসে মওলানা সাহেবকে একটা কাগজ দিল। আমি বললাম, “মানি না ১৪৪ ধারা, আমি বক্তৃতা করব।” মওলানা সাহেব দাঁড়িয়ে বললেন, “১৪৪ ধারা জারি হয়েছে। আমাদের সভা করতে দেবে না। আমি বক্তৃতা করতে চাই না, তবে আসুন আপনারা মোনাজাত করুন, আল্লাহু আমিন।” মওলানা সাহেব মোনাজাত শুরু করলেন। মাইক্রোফোন সামনেই আছে। আধ ঘণ্টা পর্যন্ত চিৎকার করে মোনাজাত করলেন, কিছুই বাকি রাখলেন না, যা বলার সবই বলে ফেললেন। পুলিশ অফিসার ও সেপাইরা হাত তুলে মোনাজাত করতে লাগল। আধা ঘণ্টা মোনাজাতে পুরা বক্তৃতা করে মওলানা সাহেব সভা শেষ করলেন। পুলিশ ও মুসলিম লীগ ওয়ালারা বেয়াকুফ হয়ে গেল।
রাতে এক বাড়িতে খেতে গেলেন মওলানা সাহেব। রাগ, খাবেন না। তিনি থাকতে কেন শামসুল হক সাহেবের নাম প্রস্তাব করা হল সভাপতিত্ব করার জন্য। এক মহাবিপদে পড়ে গেলাম। মওলানা সাহেবকে আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম, লোকে কি বলবে? তিনি কি আর বুঝতে চান? তাকে নাকি অপমান করা হয়েছে! শামসুল হক সাহেবও রাগ হয়ে বলেছেন, মওলানা সাহেব সকলের সামনে একথা বলছেন কেন? এই দিন আমি বুঝতে পারলাম মওলানা ভাসানীর উদারতার অভাব, তবুও তাঁকে আমি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতাম। কারণ, তিনি জনগণের জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত। যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোন ভাল কাজ করতে পারে নাইএ বিশ্বাস আমার ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এদেশে রাজনীতি করতে হলে ত্যাগের প্রয়োজন আছে এবং ত্যাগ আমাদের করতে হবে পাকিস্তানের জনগণকে সুখী করতে হলে। মুসলিম লীগ সরকার নির্যাতন চালাবে এবং নির্যাতন ও জুলুম করেই ক্ষমতায় থাকতে চেষ্টা করবে। নির্যাতনের ভয় পেলে বেশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়। এখনও মুসলিম লীগের নামে মানুষকে ধোকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে কিছুটা; কিন্তু বেশি দিন ধোকা দেওয়া চলবে না। মুসলিম লীগের নামের যে মোহ এখনও আছে, জনগণকে বুঝাতে পারলে এবং শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে মুসলিম লীগ সরকার অত্যাচার করতে সাহস পাবে না।
৪৫.
আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম এবং আরমানিটোলা ময়দানে এক জনসভা ডাকলাম। কারণ তখন খাদ্য পরিস্থিতি খুবই খারাপ। লোকের দুরবস্থার সীমা নাই। মওলানা সাহেব সভাপতিত্ব করলেন। আতাউর রহমান খান, শামসুল হক সাহেব ও আমি বক্তৃতা করলাম। মুসলিম লীগ চেষ্টা করেছিল গোলমাল সৃষ্টি করতে। বাদশা মিয়া আমাদের দলে চলে আসায় এবং জনগণের সমর্থন থাকায় তারা সাহস পেল না। এতবড় সভা এর পূর্বে আর হয় নাই। বিরাট জনসমাগম হয়েছে। জনসাধারণ ও ঢাকার লোকের ভুল ভাঙতে শুরু করেছে। আর আমরা যারা বক্তৃতা করলাম সকলেই পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমাদের রাষ্ট্রের দুশমন’ বললে জনগণ মানতে রাজি ছিল না। কারণ আমরাই প্রথম কাতারের কর্মী ছিলাম।
