পরের দিন সকালবেলা খাজা সাহেবের বজরা গোপালগঞ্জ এল এগারটার সময়। আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হল তার বজরায়। খাজা সাহেব পাশের রুমে বসেছিলেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কবির সাহেব তার পক্ষ থেকে আমাকে বললেন, আমার দাবিগুলি ন্যায়সঙ্গত। তিনি নিশ্চয়ই বিবেচনা করে দেখবেন। গোপালগঞ্জ শহরে কলেজ নাই। একটা কলেজ হওয়া দরকার, তিনি স্বীকার করলেন।
এর মধ্যে আর একটা ঘটনা হয়ে গেল। জনসাধারণ মনে করেছে আমাকে গ্রেফতার করে নিয়া গিয়েছে, কারণ পুলিশ কর্মচারী তার সরকারি কাপড় পরে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। কর্মীরা স্লোগান দিতে শুরু করে এবং পুলিশ কর্ডন ভেঙে অগ্রসর হতে থাকে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে বসেছে, ভীষণ গোলমাল শুরু হয়েছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে খবর দিল, আমাকে ঘটনাস্থলে পাঠাতে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে উপস্থিত হলাম এবং সকলকে বললাম, “আমাকে গ্রেফতার করে নাই। খাজা সাহেব আমাদের দাবিগুলি বিশেষভাবে বিবেচনা করে দেখবেন।” আমি খাজা সাহেবকে দাওয়ালদের অসুবিধার কথা বলবার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ করেছিলাম। কবির সাহেব নিজেও খুব চিন্তিত ছিলেন দাওয়ালদের ব্যাপার নিয়ে। কারণ ফরিদপুরে যে দুর্ভিক্ষ হবে সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ ছিল না।
বিরাট সভা হল, সকলেই গভর্নর জেনারেলকে অভ্যর্থনা করলেন। তিনি মসজিদটার দ্বার উদ্ঘাটনও করেছিলেন। খাজা সাহেব তদন্ত করেছেন কি না জানি না, তবে টাকা তিনি নেন নাই। কলেজ করার জন্য দিয়ে গিয়েছিলেন। জিন্নাহ ফান্ডের নামে টাকা তোলা হয়েছিল বলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামেই কলেজ করা হয়েছিল। আজও কলেজটা আছে, ভালভাবে চলছে।
৩৫.
দিনটা আমার ঠিক মনে নাই। তবে ঘটনাটা মনে আছে ১৯৪৮ সালের ভিতর হবে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ঢাকায় এসেছিলেন এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে এক ছাত্রসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। তখন ময়মনসিংহের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব সহ-সভাপতি ছিলেন হলের (এখন সৈয়দ নজরুল সাহেব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। আমি জেলে থাকার জন্য ভারপ্রাপ্ত সভাপতি)। শহীদ সাহেবের বক্ততা এত ভাল হয়েছিল যে, যারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতেন তারাও ভক্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে মন্ত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় বা হলের কাছেও যেতে পারতেন না। শহীদ সাহেব যখন পরে আবার ঢাকায় আসলেন, তখন কতগুলি সভার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কায়েম থাকে। প্রথম সভার জায়গা ঠিক হল টাঙ্গাইল। স্টিমারে মানিকগঞ্জ হয়ে যেতে হবে, পথে আরও একটা সভা হবে। শামসুল হক সাহেব সভার বন্দোবস্ত করেছিলেন। শহীদ সাহেব প্লেন থেকে ঢাকায় নেমে সোজা বেগম আনোয়ারা খাতুন এমএলএ ছিলেন, তাঁর বাড়িতে আসলেন। সেখানেই দুপুরবেলা খেলেন। সন্ধ্যায় বাদামতলী ঘাট থেকে জাহাজ ছাড়বে। মওলানা ভাসানী ও আমি সাথে যাব। আমরা শহীদ সাহেবকে নিয়ে জাহাজে উঠলাম। মওলানা সাহেবও উঠেছিলেন। জাহাজ ছয়টায় ছাড়বার কথা, ছাড়ছে না। খবর নিয়ে জানলাম, সরকার হুকুম দিয়েছে না ছাড়তে। প্রায় দুই ঘন্টা জাহাজ ঘাটে বসে রইল। কাদের সর্দার, জনাব কামরুদ্দিন সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। রাত আটটায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিআইজি পুলিশ শহীদ সাহেবের হাতে একটা কাগজ দিলেন, তাতে লেখা, তিনি ঢাকা ত্যাগ করতে পারবেন না। তবে যদি কলকাতা ফিরে যান, সরকারের আপত্তি নাই। তিনি ঢাকায় যে কোনো জায়গায় থাকতে পারেন তাতেও আপত্তি নাই। শহীদ সাহেব জাহাজ ছেড়ে নেমে আসলেন, আমিও তার মালপত্র নিয়ে সাথে সাথে এলাম। কোথায় থাকবেন? আর কেইবা জায়গা দেবেন? কোন হোটেলও নাই। বেগম আনোয়ারার সাহস আছে, কিন্তু তাঁদের বাড়িটায় জায়গা নাই। আতাউর রহমান, কামরুদ্দিন সাহেবের বাড়িরও সেই অবস্থা। কামরুদ্দিন সাহেব ক্যাপ্টেন শাহজাহান ও তার স্ত্রী বেগম নূরজাহানের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, কারণ তাদের বাড়িটা সুন্দর এবং থাকার মত ব্যবস্থাও আছে। বেগম নূরজাহান (এখন প্রফেসর) বললেন “এ তো আমাদের সৌভাগ্য। শহীদ সাহেবকে আমি বাবার মত ভক্তি করি। আমাদের বাড়িতেই থাকবেন তিনি, নিয়ে আসুন।” সেইদিন এই উপকার বেগম নূরজাহান না করলে সত্যিই দুঃখের কারণ হত। পাকিস্তান সত্যিকারের যিনি সৃষ্টি করেছিলেন, সেই লোকের থাকার জায়গা হল না। দুই দিন শহীদ সাহেব ছিলেন তার বাসায়, কি সেবাই না ভদ্রমহিলা করেছিলেন, তা প্রকাশ করা কষ্টকর। মেয়েও বোধহয় বাবাকে এত সেবা বস্মতে পারে না। ক্যাপ্টেন শাহজাহানও যথেষ্ট করেছেন। দুই দিন পরে শহীদ সাহেবকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে জাহাজে তুলে দিলাম। আমি সাথে যেতে চেয়েছিলাম এগিয়ে দিতে। তিনি রাজি হলেন না। বললেন, “দরকার নাই। আর লোকজনও আছে আমার অসুবিধা হবে না।” আমি বিছানা করে সকল কিছু গুছিয়ে দিয়ে বিদায় নিতে গেলে বললেন, “তোমার উপরও অত্যাচার আসছে। এরা পাগল হয়ে গেছে। শাসন যদি এইভাবে চলে বলা যায় না, কি হবে!” আমি বললাম, “স্যার, চিন্তা করবেন না, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি খোদা আমাকে দিয়েছেন। আর সে শিক্ষা আপনার কাছ থেকেই পেয়েছি।”
এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করার মত ক্ষমতা তখন আমাদের ছিল না। আর আমরা প্রস্তুতও ছিলাম না। ছাত্ররা সামান্য প্রতিবাদ করেছিল। নেতৃত্ব দেওয়ার মত কেউ আমাদের ছিল না। আমরা যদি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতাম, নিশ্চয়ই সাড়া পেতাম। জনসাধারণ শহীদ সাহেবকে ভালবাসতেন। আমরা কয়েকজন প্রস্তাব করলে ঢাকার পুরানা নেতারা নিষেধ করলেন। আমরা ঢাকায় নতুন এসেছি, পরিচিত হতেও পারি নাই ভালভাবে। মওলানা ভাসানী ঐ জাহাজেই চলে গেলেন এবং সভায় যোগদান করেছিলেন। ঐদিন যদি শামসুল হক সাহেব ঢাকায় থাকতেন তবে আন্দোলন আমরা করতে পারতাম বলে আমার বিশ্বাস ছিল।
