৩৪.
এই সময় আরেকটা অত্যাচার মহামারীর মত শুরু হয়েছিল। জিন্নাহ ফাভ’ নামে সরকার একটা ফান্ড খোলে। যে যা পারে তাই দান করবে এই হল হুকুম। জিন্নাহ ফান্ডে’ টাকা দিতে কেউই আপত্তি করেছে বলে আমার জানা নাই। যাদের অর্থ আছে তারা খুশি হয়েই দান করেছে। অনেক গরিবও ‘জিন্নাহ ফান্ডে’ টাকা দিয়াছে। কিন্তু কিছু সংখ্যক অফিসার সরকারকে খুশি করার জন্য জোরজুলুম করে টাকা তুলতে শুরু করেছিল। যে মহকুমা অফিসার বেশি তুলতে পারবেন, তিনি ভেবেছেন তাড়াতাড়ি প্রমোশন পাবেন।
আমার মহকুমায় এটা ভীষণ রূপ ধারণ করেছিল। খাজা সাহেব গোপালগঞ্জ আসবেন ঠিক হয়েছে। তখনকার মহকুমা হাকিম সভা করে এক অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করেছেন। যেখানে ঠিক করেছে যে গোপালগঞ্জ মহকুমায় প্রায় ছয় লক্ষ লোকের বাস, মাথাপ্রতি এক টাকা করে দিতে হবে, তাতে ছয় লক্ষ টাকা উঠবে। আর যাদের বন্দুক আছে, তাদের আলাদাভাবে দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের তো কথাই নাই। বড় নৌকাথতিও প্রত্যেককে দিতে হবে। তিনি সমস্ত ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টদের হুকুম দিয়েছেন, যে না দিবে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। চারিদিকে জোরজুলুম শুরু হয়েছে। চৌকিদার, দফাদার নেমে পড়েছে। কারও গরু, কারও বদনা, থালা, ঘটিবাটি কেড়ে আনা হচ্ছে। এক ত্রাসের রাজত্ব। জনাব ওয়াহিদুজ্জামান সাহেবই নাজিমুদ্দীন সাহেবকে দাওয়াত করে এনেছেন। এখন তিনি মুসলিম লীগে আছেন। গোপালগঞ্জ মুসলিম লীগ যারা ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত করেছেন, এখন আর তারা নাই। এডহক কমিটি করা হয়েছে। মহকুমা হাকিম সাহেবের সাথে যোগসাজশে তারা কাজ করেছে।
আমি খুলনা থেকে গোপালগঞ্জ পৌঁছালাম। গোপালগঞ্জ শহরে স্টিমার যায় না। দুই মাইল দূরে হরিদাসপুর নামে একটা ছোট্ট স্টেশন পর্যন্ত আসে। হরিদাসপুর থেকে নৌকায় গোপালগঞ্জ যেতে হয়। আমি একটা নৌকায় উঠলাম। মাঝি আমাকে চিনতে পেরেছে। নৌকা ছেড়ে দিয়ে আমাকে বলে, “ভাইজান, আপনি এখন এসেছেন, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। পাঁচজন লোক আমরা, হুকুম এসেছে পাঁচ টাকা দিতে হবে। দিনভর কোনোদিন দুই টাকা, কোনোদিন আরও কম টাকা উপার্জন করি, বলেন তো পাঁচ টাকা কোথায় পাই? গতকাল আমার বাবার আমলের একটা পিতলা বদনা ছিল, তা চৌকিদার টাকার দায়ে কেড়ে নিয়ে গেছে।” এই কথা বলে কেঁদে ফেলল। সমস্ত ঘটনা আমাকে আস্তে আস্তে বলল। মাঝির বাড়ি টাউনের কাছেই। সে চালাক চতুরও আছে। শেষে বলে, “পাকিস্তানের কথা তো আপনার কাছ থেকেই শুনেছিলাম, এই পাকিস্তান আনলেন!” আমি শুধু বললাম, “এটা পাকিস্তানের দোষ না।”
গোপালগঞ্জ নেমে আমার বাসায় পৌঁছার সাথে সাথে অনেক লোক এসে জমা হতে লাগল, আর সকলের মুখে একই কথা। ব্যবসায়ীরা এল বিকালে কয়েকজন, পুরানা মুসলিম লীগের নেতারা এলেন। আমি বিকেলেই সমস্ত মহকুমায় আমার পুরানা সহকর্মীদের খবর দিলাম, পরের দিন প্রায় সকলে এসে হাজির হল। এক আলোচনা সভা করলাম। আমি বললাম, “আমাদের বাধা দিতে হবে। এটা সরকারের ট্যাক্স না। লোকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য, কিন্তু কোন আইনে চাঁদা জোর করে তুলতে পারে?” আমি পৌঁছাবার পূর্বেই বোধহয় তিন লাখ টাকার মত তুলে ফেলেছে। সঠিক হিসাব দিতে পারব না। মহকুমা হাকিম ও মুসলিম লীগ এডহক কমিটি ঠিক করেছে যে টাকা অভ্যর্থনায় খরচ হবে তা বাদ দিয়ে। বাকি সমস্ত টাকা খাজা সাহেবকে তোড়ায় করে দেওয়া হবে জিন্নাহ ফান্ডের জন্য। যদি সম্ভব হয় কিছু টাকা মসজিদের জন্য রাখা হবে। গোপালগঞ্জে একটা ভাল মসজিদ করা হচ্ছিল।
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এ টাকা নিতে দেওয়া হবে না। তাঁর অভ্যর্থনায় যা ব্যয় হয়, তা বাদে বাকি টাকা মসজিদ আর গোপালগঞ্জে কলেজ করার জন্য রেখে দিতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে, আমরা বাধা দেব। দরকার হয় সভায় গোলমাল হবে। এ খবর চলে গেল সমস্ত মহকুমায়। টাকা তোলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। আমার পৌঁছার সাথে সাথে জনসাধারণের সাহস বেড়ে গেল। গোপালগঞ্জের জনসাধারণ আমাকেই দেখেছে পাকিস্তান আন্দোলন করতে। এরা আমাকে ভালবাসে। আমার সাথে এক যুবক কর্মীবাহিনী ছিল, যারা আমার হুকুম পেলে আগুনেও ঝাপ দিতে পারত।
খাজা সাহেব পৌঁছাবার দুই দিন পূর্বে মহকুমা হাকিম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সাথে পরামর্শ করলেন এবং আমাকে গ্রেফতার করা যায় কি না অনুমতি চাইলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিষেধ করে বলে দিলেন, তিনি একদিন পূর্বেই উপস্থিত হবেন এবং আমার সাথে আলাপ করবেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মি. গোলাম কবির। তিনি খুবই বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ছিলেন, কলকাতা থেকে আমাকে চিনতেন। আমাকে তুমি বলে কথা বলতেন, আর আমিও কবির ভাই’ বলতাম। তিনি গোপালগঞ্জে এসেই আমাকে খবর দিলেন। তাঁর সাথে দেখা করতে যেয়ে দেখি, জেলার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টও উপস্থিত আছেন। আমি তাঁকে সকল বিষয় বললাম এবং আমাদের দাবিগুলি পেশ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, “গভর্নর জেনারেল রাজনীতিবিদ নন, তিনি রাষ্ট্রপ্রধান। কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথেও জড়িত নন। তিনি তো অতিথি, তাকে অসম্মান করা কি উচিত হবে? আমি বললাম, “কে বলেছে আপনাকে, যে তাকে অসম্মান করতে চাই! তাঁকে সকলেই অভ্যর্থনা করবে, শুধু এটুকু কথা তাঁর সাথে আলোচনা করে আমাকে জানিয়ে দেন যে, তিনি হুকুম দিবেন এই অত্যাচার করে টাকা তোলার ব্যাপারে তদন্ত করবেন এবং দোষীকে শাস্তি দিবেন। দ্বিতীয়ত, টাকা তাঁকেই দেওয়া হবে, আমরা কোনো দাবি করব না; শুধু তিনি টাকাটা কলেজ করতে দিয়ে দেবেন। তিনিই আমাদের কলেজ করে দিবেন।” কবির সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি কথা দাও, কোনো গোলমাল হবে না।” আমি বললাম, “কবির ভাই, আপনি পাগল হয়েছেন। আমি জানি না যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী নন, এখন বড়লাট হয়েছেন। কোনো গোলমাল হবে না, আমাদের পক্ষ থেকে। আপনি তার সাথে পরামর্শ করে আমাকে জানিয়ে দিবেন সকাল দশটার মধ্যে, যাতে সকলে মিলে ভালভাবে তাঁকে অভ্যর্থনা করতে পারা যায়।”
