মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের বিবৃতির পরে আর আমরা মুসলিম লীগের সদস্য থাকলাম না। অর্থাৎ আমাদের মুসলিম লীগ থেকে খেদিয়ে দেওয়া হল। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম লীগকে একটা প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। টাঙ্গাইলে দুইটা আইনসভার আসন খালি হয়েছিল। আমাদের ইচ্ছা ছিল, নাজিমুদ্দীন সাহেবের বিরুদ্ধে লোক দেওয়া যায় কি না? মওলানা ভাসানী সাহেব আসাম থেকে চলে এসে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে বাস করছিলেন। তাঁর শরণাপন্ন হলাম। কিন্তু মওলানা সাহেব এক সিট নিজে এবং এক সিট নাজিমুদ্দীন সাহেবকে দিয়ে নির্বাচন করে এমএলএ হলেন। পরে নির্বাচনী হিসাব দাখিল না করার জন্য মওলানা সাহেবের নির্বাচন বেআইনি ঘোষণা হয়েছিল।
আমাদের ভাষা আন্দোলনের সময় মওলানা সাহেব সমর্থন করেছিলেন। টাঙ্গাইলে মুসলিম লীগ কর্মীদের এক সভা ডাকা হল, কি করা যায় ভবিষ্যতে! আলোচনা হবার পরে ঠিক হল, আরেকটা সভা করা হবে নারায়ণগঞ্জে। সেখানে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। মওলানা ভাসানী, আবদুস সালাম খান, আতাউর রহমান খান, শামসুল হক সাহেব আরও অনেক মুসলিম লীগ কর্মী ও নেতা যোগদান করবেন বলে ঠিক হল। সভার আয়োজন করেছিল সালমান আলী, আবদুল আউয়াল, শামসুজ্জোহা ও আরও অনেকে। খান সাহেব ওসমান আলী এমএলএও সমর্থন দিয়েছিলেন। সভার পূর্বে ১৪৪ ধারা জারি করা হল। আমরা পাইকপাড়া ক্লাবে সভা করলাম। বিভিন্ন জেলার অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত হয়েছিলেন। এই সময় শামসুজ্জোহার উপর মুসলিম লীগের ভাড়াটিয়া গুণ্ডারা আক্রমণ করেছিল। দুঃখের বিষয়, এই কর্মীরাই নারায়ণগঞ্জে মুসলিম লীগ গঠন করেছিল এবং পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। এখন যারা এদের উপর আক্রমণ করেছিল তাদের প্রায় সকলেই পাকিস্তান ও মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ছিল। প্রত্যেক জেলা ও মহকুমায় মুসলিম লীগ ভেঙে দিয়ে এডহক কমিটি গঠন করেছিল। প্রায় সমস্ত জায়গায় মুসলিম লীগ কমিটিতে শহীদ সাহেবের সমর্থক বেশি ছিল বলে অনেক লীগ ও পাকিস্তানবিরোধী লোকদের এডহক কমিটিতে নিতে হয়েছিল। কিন্তু জনসাধারণ মুসলিম লীগ বলতে শুধু পুরানা লীগ কর্মীদেরই বুঝত।
মওলানা ভাসানী সাহেবের সভাপতিত্বে এই সভা হল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, প্রথমে দুইজন প্রতিনিধি করাচিতে জনাব খালিকুজ্জামান সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং আমাদের দাবি পেশ করবেন। আমাদের দাবি ছিল, পুরানা মুসলিম লীগকে কাজ করতে দেওয়া হোক। যদি না শোনেন, তবে আমাদের রসিদ বই দেওয়া হোক এবং যাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় তার বন্দোবস্ত করা হোক। দেখা যাবে, জনসাধারণ কাদের চায়? তখনকার দিনে করাচি যাওয়া এত সোজা ছিল না। কলকাতা-দিল্লি হয়ে করাচি যেতে হত। ঠিক হল, জনাব আতাউর রহমান খান এবং বেগম আনোয়ারা খাতুন এমএলএ যাবেন করাচিতে। তারা করাচিতে গেলেন এবং চৌধুরী খালিকুজ্জামানের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং আমাদের দাবিদাওয়া পেশ করলেন। খালিকুজ্জামান সাহেব বলে দিলেন, “পুরানা কথা ভুলে যান, যারা খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেবকে সমর্থন করবেন, তারাই মুসলিম লীগের সদস্য থাকবেন।” রসিদ বইয়ের কথায় বললেন, “কাগজ পাওয়া যায় না, তাই রসিদ বই পাওয়া কষ্টকর। আকরম খাঁ সাহেব ও পূর্ব পাকিস্তান এডহক কমিটিকে বলবেন, তারা যদি ভাল মনে করেন তবে পাবেন।” দুইজনই ফিরে এলেন এবং আমাদের কাছে বললেন, মিছামিছি কতগুলি টাকা খরচ করা হল, কোনো কাজ হল না। খালিকুজ্জামান সাহেব ভাল করে কথা বলতেও চান নাই।
শহীদ সাহেবও এই সময় ঢাকা আসলেন এবং মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও আরও কয়েক জায়গায় সভা করলেন, তাতে ফল খুব ভাল হল। হিন্দুদের দেশত্যাগ করার যে একটা হিড়িক পড়েছিল তা অনেকটা বন্ধ হল এবং পশ্চিম বাংলা ও বিহার থেকেও মুসলমানরা অনেক কম আসতে লাগল। এই সমস্ত সভায় এত বেশি জনসমাগম হত এবং শহীদ সাহেবকে অভ্যর্থনা করার জন্য এত লোক উপস্থিত হত যে তা কল্পনা করাও কষ্টকর। এতে নাজিমুদ্দীন সাহেবের সরকার ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলেন। এবার শহীদ সাহেব নবাবজাদা নসরুল্লাহ সাহেবের বাড়িতে উঠেছিলেন। নবাবজাদা শহীদ সাহেবকে সমর্থনও করতেন এবং শ্রদ্ধাও করতেন। শহীদ সাহেবকে বিদায় দিলাম গোপালগঞ্জ থেকে। সবুর সাহেব খুলনায় শহীদ সাহেবকে অভ্যর্থনা করলেন। কারণ, সবুর সাহেব তখনও শহীদ সাহেবের কথা ভুলতে পারেন নাই। তাঁকে সমর্থন করতেন এবং আমাদেরও সাহায্য করতেন। শহীদ সাহেব খুলনায় হিন্দু-মুসলমান নেতাদের নিয়ে এক ঘরোয়া বৈঠক করলেন এবং সাম্প্রদায়িক শান্তি যাতে বজায় থাকে সে সম্বন্ধে সকলকে চেষ্টা করতে বললেন। গোপালগঞ্জে বিরাট সভায় শহীদ সাহেব ও আমাকে খালি গলায়ই বক্তৃতা করতে হয়েছিল। কারণ মাইক্রোফোন জোগাড় করতে পারি নাই। খুলনা থেকে যে আনব সে সময়ও আমাদের হাতে ছিল না, কারণ তিনি হঠাৎ প্রোগ্রাম করেছিলেন।
এইবার যখন শহীদ সাহেব পূর্ব পাকিস্তানে এলেন, আমরা দেখলাম সরকার ভাল চোখে দেখছে না। পূর্বে সরকারি কর্মচারীরা শহীদ সাহেবের থাকবার বন্দোবস্ত যাতে ভালভাবে হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন। কিন্তু এবার তারা দূরে দূরে থাকতে চায়। দু’একজন গোপনে বলেই ফেলেছিল, “উপরের হুকুম, যাতে তারা সহযোগিতা না করে।” গোয়েন্দা বিভাগের তৎপরতাও বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল। সত্যই পাকিস্তানের মঙ্গলের জন্যই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা উচিত, তা না হলে যদি একবার মোহাজের আসতে শুরু করত, তাহলে অবস্থা কি শোচনীয় হত যারা চিন্তাবিদ তারা তা অনুধাবন করতে পারবেন। সংকীর্ণ মন নিয়ে যারা রাজনীতি করেন তাদের কথা আলাদা। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার ও অন্যান্য প্রদেশগুলোতে এখনও লক্ষ লক্ষ মুসলমান রয়েছে—যাদের দান পাকিস্তান আন্দোলনে কারও চেয়ে কম ছিল না। তাদের কথা চিন্তা করে আমাদের শান্তি বজায় রাখা উচিত বলে আমরা মনে করতাম। সত্য কথা বলতে কি, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান শহীদ সাহেবের উপদেশ গ্রহণ করেছিল। ফলে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা হয় নাই। এমনকি মুসলমানরা হিন্দুদের অনুরোধ করেছিল, যাতে তারা দেশ ত্যাগ না করে। আমি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অনেক জায়গায় ঘুরেছি। আমার জানা আছে এ রকম অনেক ঘটনা। দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল হিন্দু ভাইরাও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারেন নাই। মুসলমানদের ঘরবাড়ি, জানমাল ধ্বংস করেছে অনেক জায়গায়।
