ঢাকায় জিন্নাহ দুই দলের ছাত্রনেতাদের ডাকলেন। বোধহয় বাংলা ভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদেরও ডেকেছিলেন। তবে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের দুইজন করে প্রতিনিধির সাথে দেখা করলেন। কারণ, তিনি পছন্দ করেন নাই, দুইটা প্রতিষ্ঠান কেন হবে এই মুহূর্তে! আমাদের পক্ষ থেকে মিস্টার তোয়াহা আর শামসুল হক সাহেব ছিলেন, তবে আমি ছিলাম না। জিন্নাহ আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামটা পছন্দ করেছিলেন। নিখিল পূর্ব পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের নাম যখন আমাদের প্রতিনিধি পেশ করেন, তখন তারা দেখিয়ে দিলেন যে, এদের অধিকাংশ এখন চাকরি করে, অথবা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। তখন জিন্নাহ তাদের উপর রাগই করেছিলেন। শামসুল হক সাহেবের সাথে জিন্নাহর একটু তর্ক হয়েছিল, যখন তিনি দেখা করতে যান বাংলা রাষ্ট্রভাষা করার বিষয় নিয়ে—শামসুল হক সাহেব আমাকে এসে বলেছিলেন। শামসুল হক সাহেবের সৎ সাহস ছিল, সত্য কথা বলতে কাউকেও ভয় পেতেন না।
জিন্নাহ চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরে ফজলুল হক হলের সামনে এক ছাত্রসভা হয়। তাতে একজন ছাত্র বক্তৃতা করেছিল, তার নাম আমার মনে নাই। তবে সে বলেছিল “জিন্নাহ যা বলবেন, তাই আমাদের মানতে হবে। তিনি যখন উদুই রাষ্ট্রভাষা বলেছেন তখন উর্দুই হবে।“ আমি তার প্রতিবাদ করে বক্তৃতা করেছিলাম, আজও আমার এই একটা কথা মনে আছে। আমি বলেছিলাম, “কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে। যেমন হযরত ওমরকে (রা.) সাধারণ নাগরিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি বড় জামা পরেছিলেন বলে। বাংলা ভাষা শতকরা ছাপ্পান্নজন লোকের মাতৃভাষা, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংখ্যাগুরুদের দাবি মানতেই হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তাতে যাই হোক না কেন, আমরা প্রস্তুত আছি।” সাধারণ ছাত্ররা আমাকে সমর্থন করল। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুবকরা ভাষার দাবি নিয়ে সভা ও শোভাযাত্রা করে চলল। দিন দিন জনমত সৃষ্টি হতে লাগল। কয়েক মাসের মধ্যে দেখা গেল, নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কোনো সমর্থক রইল না। কিছু নেতা রইল, যাদের মন্ত্রীদের বাড়ি ঘোরাফেরা করা আর সরকারের সকল কিছুই সমর্থন করা ছাড়া কাজ ছিল না।
৩২.
ভাষা আন্দোলনের পূর্বে মোহাম্মদ আলী, তোফাজ্জল আলী এবং ডা, মালেক সাহেবের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ এমএলএদের মধ্যে এক গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব শহীদ সাহেবের কোনো সমর্থককে মন্ত্রিত্ব দেন নাই। এমনকি পার্লামেন্টারি সেক্রেটারিও করেন নাই। তাদের সংখ্যাও কম ছিল না। প্রায়ই তোফাজ্জল আলী সাহেবের বাড়িতে এদের সভা হত। দেখা গিয়েছিল, এদের সমর্থক সংখ্যা এমন পর্যায়ে এসে পড়েছে যে, ইচ্ছা করলে নাজিমুদ্দীন সাহেবের বিরুদ্ধে অনাস্থা দিলে পাস হয়ে যেতে পারে। এদের পক্ষ থেকে দুই একজন এমএলএ কলকাতায়ও গিয়েছিল, শহীদ সাহেবকে আনতে। শহীদ সাহেব ঢাকায় পৌঁছালেই অনাস্থা প্রস্তাব এরা পেশ করবে বলে কথাবার্তা চলেছিল। কিন্তু শহীদ সাহেব রাজি হন নাই। তিনি এদের বলেছিলেন, “আমি এখন গোলমাল সৃষ্টি করতে চাই না। নাজিমুদ্দীন সাহেবই কাজ করুক।” আরও বলেছিলেন, “সেই পুরানা এমএলএদের কথা বলছ? কিছুদিন পূর্বে আমার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। আজ আবার নাজিমুদ্দীন সাহেবের বিরুদ্ধে ভোট দিবে, কাল আবার আমার বিরুদ্ধে দিতে পারে। এ সমস্তের দরকার নাই, আমার অনেক কাজ এবং সে কাজ আমি না করলে মুসলমানদের ভারত ত্যাগ করতে হবে এবং লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাবে। আমার একমাত্র চেষ্টা ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে এবং পাকিস্তানে মুসলমান-হিন্দুদের মধ্যে স্থায়ী একটা শান্তি কায়েম করতে পারি কি না?”
এদিকে জিন্নাহ সাহেব মোহাম্মদ আলী সাহেবকে ডেকে এক ধমক দিলেন, দল সৃষ্টি করার জন্য। আর বললেন, রাষ্ট্রদূত হয়ে বার্মায় যেতে। মোহাম্মদ আলী, তোফাজ্জল আলী সাহেবের বাড়িতে এসে আমাদের সমস্ত ঘটনা বললেন এবং তিনি যে বার্মা যেতে রাজি হয়েছেন, সেকথাও জানালেন। কিছুদিন পরে ডা, মালেকও মন্ত্রিত্ব পাবেন বলে ঠিক হল। শেষ পর্যন্ত তোফাজ্জল আলী সাহেব বাকি ছিলেন। তিনি একদিন আমাকে বললেন, “মুজিব দেখলে তো, মোহাম্মদ আলী সাহেব চলে গেলেন, ডা, মালেকও মন্ত্রী হয়ে যাচ্ছে, আমাকেও ডেকেছে মন্ত্রিত্ব নিতে। কি করি বল তো? একলা তো আর বাইরে থেকে কিছু করা যাবে না। তোমার মত আমার নেওয়া দরকার।” আমি দেখলাম, তাকে বাধা দিয়ে আর কি হবে? সকলেই তো নাজিমুদ্দীন সাহেবের দলে মিলে গেছে। আমি তাকে বললাম, “তবুও তো আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আর কেউ তো জিজ্ঞাসাও করল না। কি আর আপনি একলা করতে পারবেন, মন্ত্রিত্ব নিয়ে নেন, আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। যে আদর্শ ও পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করেছি, সে আদর্শ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালাব।” তিনি যে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এই ভদ্রতার জন্য তাকে আমি শ্রদ্ধা করেছি এবং তার সাথে আমার সম্বন্ধ কোনোদিন নষ্ট হয় নাই। তিনিও আমাকে সকল সময়ই ছোট ভাইয়ের মত দেখেছেন। যদিও পরে আমরা দুইজন দুই রাজনৈতিক দলে ছিলাম।
