ভোরবেলা পাটগাতি স্টেশনে স্টিমার এসে পৌঁছাল। আমার বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই মাইল হবে। স্টেশন মাস্টারকে ও অন্যান্য লোকদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কিছু জানে। কি না আমার আব্বার কথা? সকলেই এক কথা বলে, “আপনার আব্বার খুব অসুখ শুনেছি।” নৌকায় গেলে অনেক সময় লাগে। মালপত্র স্টেশন মাস্টারের কাছে রেখে হেঁটে রওয়ানা করলাম। মধুমতী নদী পার হতে হল। সোজা মাঠ দিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা করলাম। পথঘাটের বালাই নাই। সোজা চষা জমির মধ্য দিয়ে হাঁটলাম। বাড়ি পৌঁছে দেখি আব্বার কলেরা হয়েছে। অবস্থা ভাল না, ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। আমি পৌঁছেই “আব্বা বলে ডাক দিতেই চেয়ে ফেললেন। চক্ষু দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা। আমি আব্বার বুকের উপর মাথা রেখে কেঁদে ফেললাম; আব্বার হঠাৎ যেন পরিবর্তন হল কিছুটা। ভাক্তার বলল, নাড়ির অবস্থা ভাল মনে হয়। কয়েক মুহূর্তের পরেই আব্বা ভালর দিকে। ডাক্তার বললেন, ভয় নাই। আব্বার প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটু পরেই প্রস্রাব হল। বিপদ কেটে যাচ্ছে। আমি আব্বার কাছে বসে রইলাম। এক ঘন্টার মধ্যেই ডাক্তার বললেন, আর ভয় নাই। প্রস্রাব হয়ে গেছে। চেহারাও পরিবর্তন হচ্ছে। দুই তিন ঘণ্টা পরে ডাক্তার বাবু বললেন, আমি এখন যাই, সমস্ত রাত ছিলাম। কোনো ভয় নাই বিকালে আবার দেখতে আসব।
আমি বাড়িতে রইলাম কিছুদিন। আব্বা আস্তে আস্তে আরোগ্য লাভ করলেন। যে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত তাদের মত হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নাই। আর যারা বাবা মায়ের স্নেহ আর আশীর্বাদ পায় তাদের মত সৌভাগ্যবান কয়জন!
২৯.
আমি ঢাকায় এলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, আইন পড়ব। বই পুস্তক কিছু কিনলাম। ঢাকায় এসে শুনলাম গণতান্ত্রিক যুবলীগের এক সভা হয়ে গেছে। কার্যকরী কমিটির নতুন সভ্য কো-অপ্ট করা হয়েছে। পূর্বে ছিলাম সতেরজন এখন হয়েছি চৌত্রিশজন। কারণ, আমাদের সংখ্যালঘু করার ষড়যন্ত্র। আমাদের অনেকে নোটিশও পায় নাই। অন্য কোনো কাগজ না ছাপলেও কলকাতার ইত্তেহাদ কাগজ আমাদের সংবাদ ছাপত। ইত্তেহাদেও নোটিশ ছাপানো হয় নাই। আমি আপত্তি তুললাম এবং বললাম, সতেরজন সদস্য, কেমন করে আরও সতেরজন কো-অপ্ট করতে পারে? সভা ডাকা হোক। কিছুদিন পরে খবর পেলাম, ময়মনসিংহে সভা ডাকা হয়েছে। সকলে নোটিশ পেয়েছে, আমাকে দেওয়া হয় নাই। নোয়াখালীর আজিজ মোহাম্মদ ঢাকা সিটি মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ছিলেন, তিনি নোটিশ পেয়ে আমাকে বললেন, আগামী দিনই সভা হবে সকাল নয়টায়। দেখলাম আমরা তিনজন সভ্য ঢাকায় আছি। আজিজ সাহেব, ঢাকার শামসুল হুদা সাহেব (এখন। কনভেনশন মুসলিম লীগ করেন) ও আমি। ঠিক করলাম তিনজনই যাব এবং বাধা দিব। অন্য কোনো জেলায় খবর দেওয়ার সময় হবে না। রাতেই আমাদের রওয়ানা করতে হবে। কারণ একটা মাত্র ট্রেন ছাড়ে রাত দশটায়, ভোর তিনটায় পৌঁছায় ময়মনসিংহ। ভোর পর্যন্ত আমরা স্টেশনেই ছিলাম। হক সাহেবের কোনো খবর নাই। তিনি সভায় আসেন নাই। আমরা সভায় উপস্থিত হলাম এবং বৈধতার প্রশ্ন তুললাম। আমাকে ও অনেককে নোটিশ দেওয়া হল না কেন? তারা একটা ম্যানিফেষ্টো করে এনেছেন। আমরা বললাম, নোটিশ দিয়ে সভা ডাকা হোক ঢাকায় এবং সেখানে ম্যানিফেস্টো গ্রহণ করা হবে কি হবে না ঠিক করা হবে। এত তাড়াহুড়া করা উচিত হবে না। আর আমরা কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে পারি না। কারণ মুসলিম লীগের এখনও কাউন্সিল সদস্য আমরা। অনেক তর্কবিতর্ক হল, তারপর যখন দেখলাম যে, কিছুতেই শুনছে না, সকলেই প্রায় কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন বা তাদের সমর্থকরা উপস্থিত হয়েছে তখন বাধ্য হয়ে আমরা সভা ত্যাগ করলাম। আর বলে এলাম, মুসলিম লীগের কোনো কর্মী আপনাদের এই ষড়যন্ত্রে থাকবে না। যুবলীগও আজ থেকে শেষ। আপনাদের ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা আমাদের জানা আছে। আমাদের নাম কোথাও রাখবেন না।
মোগলটুলীতে যুবলীগের অফিস ছিল। আমরা বোর্ডটা নামিয়ে দিলাম। এর মধ্যেই তারা ম্যানিফেস্টো ছাপিয়ে ফেলেছে। অফিসেও নিয়ে এসেছে। শওকত মিয়াই এই অফিসের কর্তা। তিনি হুকুম দিলেন, যুবলীগের সকল কিছু এখান থেকে নিয়ে যেতে। কে নিবে? কাউকেও দেখা গেল না। পুলিশ অফিসে তল্লাশি দিল। আমাদের নামও আইবি খাতায় উঠল। ১৫০ নম্বর মোগলটুলী থেকে পাকিস্তানের আন্দোলন হয়েছে, সেই লীগ অফিসেই এখন গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারীরা পাহারা দিতে শুরু করল গোপনে গোপনে। আমরা সকলে শহীদ সাহেবের ভক্ত ছিলাম। এটাই আমাদের দোষ। আমরা সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য যাতে বজায় থাকে তার চেষ্টাই করতে থাকলাম।
মানিক ভাই তখন কলকাতায় ইত্তেহাদ কাগজের সেক্রেটারি ছিলেন। আমাদের টাকা পয়সার খুবই প্রয়োজন। কে দিবে? বাড়ি থেকে নিজেদের লেখাপড়ার খরচটা কোনোমতে আনতে পারি, কিন্তু রাজনীতি করার টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? আমার একটু স্বচ্ছল অবস্থা ছিল, কারণ আমি ইত্তেহাদ কাগজের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলাম। মাসে প্রায় তিনশত টাকা পেতাম। আমার কাজ ছিল এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে টাকা পয়সা আদায় করা, আর ইত্তেহাদ কাগজ যাতে চলে এবং নতুন এজেন্ট বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগ করা যায় সেটা দেখা। বেশি দিন ছিলাম না। তবু অসুবিধা হওয়ার কথা না, কারণ কাগজে নাম আছে, টাকা বাড়ি থেকেও কিছু পাওয়া যাবে।।
