কনফারেন্স শুরু হল। জনাব আতাউর রহমান খান ও কামরুদ্দিন সাহেবও এই কনফারেন্স যাতে কামিয়াব হয় তার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কামরুদ্দিন সাহেবের সাথে আমার পূর্বেই পরিচয় ছিল। আতাউর রহমান সাহেবের সাথে এই প্রথম পরিচয় হয়। প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পরে সাবজেক্ট কমিটি গঠন হল। আমাকেও কমিটিতে রাখা হল। আলোচনার মাধ্যমে বুঝতে পারলাম, কিছু কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন কর্মীও যোগদান করেছে। তারা তাদের মতামতও প্রকাশ করতে শুরু করেছে। প্রথমে ঠিক হল, একটা যুব প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে, যে কোন দলের লোক এতে যোগদান করতে পারবে। তবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে যতখানি দূরে রাখা যায় তার চেষ্টা করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানের নাম হবে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ।’ আমি বললাম, এর একমাত্র কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা, যাতে কোনো দাঙ্গাহাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ না করে-যাকে ইংরেজিতে বলে কমিউনাল হারমনি, তার জন্য চেষ্টা করা। অনেকেই এই মত সমর্থন করল, কিন্তু কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন দলটা বলল, আরও প্রোগ্রাম নেওয়া উচিত, যেমন অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম। আমরা বললাম, তাহলে তো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে যাবে। অনেক আলোচনার পরে ঠিক হল, একটা সাব-কমিটি করা হবে, তারা কর্মসূচি প্রণয়ন করবেন এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির কাছে তা পেশ করবেন। সে কর্মসূচি তারাই গ্রহণ করা বা না করার অধিকারী থাকবেন। সতেরজন সদস্য নিয়ে কমিটি করা হল এবং কো-অপ্ট করার ক্ষমতা দেওয়া হল। হিসাব। করে দেখা গেল আমাদের মতাবলম্বী লোকই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন লোকও কয়েকজন কমিটির সভ্য হলেন। কয়েকদিন পরে কার্যকরী কমিটির এক সভায় ড্রাফট কার্যসূচি পেশ করা হল, যাকে পরিপূর্ণ একটা পার্টির ম্যানিফেস্টো বলা যেতে পারে। আমি ভীষণভাবে বাধা দিলাম এবং বললাম কোনো ব্যাপক কার্যসূচি এখন গ্রহণ করা হবে না। একমাত্র কমিউনাল হারমনির জন্য কর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজই আমাদের নাই। দুই মাস হল দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন কোন দাবি করা উচিত হবে না। মিছামিছি আমরা জনগণ থেকে দূরে সরে যাব। কমিউনিস্ট নেতারা তখন ভারতবর্ষে শ্লোগান দিয়েছে, স্বাধীনতা আসে নাই, সংগ্রাম করে স্বাধীনতা আনতে হবে। আমাদের দেশের কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন সহকর্মীরা সেই আদর্শই কর্মসূচির মধ্যে গ্রহণ করতে চায়। এই সকল কর্মসূচি নিয়ে এখনই জনগণের কাছে গেলে আমাদের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে এবং যে কাজ এখন বিশেষ প্রয়োজন, সাম্প্রদায়িক মিলনের কথা বললেও লোকে আমাদের কথা শুনতে চাইবে না। প্রথম সভায় পাস করতে পারল না, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলাম। তবে হক সাহেব মধ্যপন্থা অবলম্বন করায় আমাদের অসুবিধা হতে লাগল।
২৮.
এই সময় আমি কিছুদিনের জন্য কলকাতায় যাই। আমাদের রেস্টুরেন্টটা বিক্রি হয়েছে। কি না, না হলে ঢাকায় কোনো দোকানের সাথে বদল করা যায় কি না সে বিষয়টা দেখতে। কলকাতায় যেয়ে দেখি, রব সাহেব রেস্টুরেন্ট বিক্রি করে দিয়েছে। যাক বাচা গেল। শহীদ সাহেব পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লি, জয়পুর, আলোয়ার ঘুরে কলকাতায় এসেছেন; তিনি খুবই চিন্তিত, এই সমস্ত জায়গায় ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানে তিনিই একমাত্র মুসলিম নেতা যিনি সাহস করে এই সমস্ত জায়গায় গিয়ে সচক্ষে সকল অবস্থা দেখে এসেছেন। আমাকে দেখে খুবই খুশি হলেন এবং বললেন, “সত্যিই পূর্ব বাংলার মুসলমানরা কত সভ্য ও ভাল, কোনো দাঙ্গাহাঙ্গামা হচেছ না। তবে হিন্দুরা চলে আসছে, এরাই বিপদ ঘটাবে। আমি শীঘ্রই পূর্ব বাংলায় যাব এবং কয়েকটা সভা করব, যাতে হিন্দুরা না আসে।” শহীদ সাহেব ঢাকা হয়ে খাজা নাজিমুদ্দীনের সাথে পরামর্শ করে বরিশালে সভা করতে যাবেন ঠিক হল।
আমি চলে এলাম ঢাকায়। বরিশালে এক বিরাট সভার আয়োজন হল। শহীদ সাহেব ঢাকায় এসে নাজিমুদ্দীন সাহেবের কাছেই থাকতেন। আমরা স্টিমারে বরিশাল রওয়ানা করলাম। কলকাতা থেকে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষও এসেছেন। বরিশালে বিকালে সভা শুরু হল, কয়েকজন বক্তৃতা করেছেন। আমাকেও বক্তৃতা করতে হবে, রাত তখন আট ঘটিকা। হবে, এমন সময় একটা টুকরা কাগজ আমার হাতে দিল। আমি শহীদ সাহেবের পাশে বসেছিলাম। তাতে রব সাহেব (আমার ভগ্নিপতি) লিখেছে, “মিয়া ভাই, আব্বার অবস্থা খুবই খারাপ, ভীষণ অসুস্থ। তোমার জন্য বিভিন্ন জায়গায় টেলিফোন করা হয়েছে, যদি দেখতে হয় রাতেই রওয়ানা করতে হবে। হেলেন লেখকের ছোটবোন চলে গিয়াছে তোমাদের বাড়িতে। আমি শহীদ সাহেবকে চিঠিটা পড়ে শোনালাম। তিনি আমাকে রওয়ানা করতে হুকুম দিলেন। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্লাটফর্ম থেকে নেমে রব সাহেবকে দেখলাম, দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, “কখন খবর পেয়েছ?” বলল, “গতকাল খবর পেয়েছি। হেলেন রওয়ানা হয়েছে, আমি তোমার জন্য দেরি করছি। কারণ, জানি শহীদ সাহেব যখন আসবেন, তুমিও আসবে।” আমি সোজা মালপত্র নিয়ে রওয়ানা করলাম স্টেশনে আর আধা ঘণ্টা সময় আছে স্টিমার ছাড়তে। স্টিমার ধরতে পারলে আবার আগামীকাল রাতে স্টিমার ছাড়বে।
আমি স্টিমারে চড়ে বসলাম, সমস্ত রাত বসে রইলাম। নানা চিন্তা আমার মনে উঠতে লাগল। আমি তো আমার আব্বার বড় ছেলে। আমি তো কিছুই বুঝি না, কিছুই জানি না সংসারের। কত কথা মনে পড়ল, কত আঘাত আব্বাকে দিয়েছি, তবু কোনোদিন কিছুই বলেন নাই। সকলের পিতাই সকল ছেলেকে ভালবাসে এবং ছেলেরাও পিতাকে ভালবাসে ও ভক্তি করে। কিন্তু আমার পিতার যে স্নেহ আমি পেয়েছি, আর আমি তাঁকে কত যে ভালবাসি সে কথা প্রকাশ করতে পারব না।
