অবশ্যি, কানাইবাবুর কাছ থেকে এ আমন্ত্রণ আগেই আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমি রবিবারে বসুমতীর কলম-রাইটার। হাতে আম থাকতে আর গাছের আম হবার গরজ ছিল না আমার।
কিছু হলেই হলো, সামান্য নিয়েই আমি সুখী, পরমাণু কশাতেই পরিতৃপ্ত, বেশি কিছু, আরো কিছু চাহিদা আমার নেই। নিজের সীমিত সময় আর শক্তির সীমানা তো জানি।
কানাইবাবুর (বোধকরি সরকার মাত্ররই) পরদুঃখকাতরণ। আমার টাকা-নাই-দশা দেখেই বাড়তি উপায়ের সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। সেটা ছিল তার আমাকে পুনর্বাসনের প্রয়াস। কেবল আমাকেই নয়, অনেক লেখকেরই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। ছোট মাপের হলেও এদিক দিয়ে তিনি বিদ্যাসাগরের সগোত্রই বলা যায়। বিদ্যাসাগরের বরাদ্দ যেকালে কেবল এক মাইকেলের জন্যই ছিল, সেখানে তাঁর সৌজন্যে, মাইকেল তুল্য না হলেও একাধিক লেখকের ব্যবস্থা হয়েছে। আমাকেও তার একজন ধরা যায়।
আমার বেলায় তা শুধু পুনর্বাসনই নয়, পূর্ণ বাসন। অশনবসন ওষুধপত্রের সম্পূর্ণ বন্দোবস্ত।
কিন্তু কাজের কাজী ছিলাম না বলেই তখন আমি রাজী হতে পারিনি, কেননা কাজটা ছিল শ্রমসাধ্য, সময়বাধ্য। আর আমি, সময়ভিক্ষু শ্রমবিমুখ চিরকাল। কিন্তু এবারকার প্রস্তাবটা আমার স্বধর্মোচিত কাজের মতই, মনের মতন বলে সঙ্গে সঙ্গে উৎসাহিত হয়েছি। সাগ্রহে গ্রহণ করেছি।
বসুমতীর বাঁকা চোখের মত চুটকি লেখার কাজই আমার পোয়। চটুল এবং চটারি। সময়সাধ্য শ্রমসাধ্য নয়, চট করে হয়, চটজলদি কাম–মাথা খাটিয়ে মাথার ঘাম ফেলবার টায়ারিং কাজ না। মাথায় খাটাবার টায়রা নয়, বঙ্গবাণীর অঙ্গাভরণের জড়োয়া গয়না নয় কিছু, পদতলের চটকি মাত্র।
এমন কাজই আমি চেয়েছিলাম।
বসুমতীর কাজটা ছাড়লেন কেন? অশোকবাবু শুধালেন আমায়।
আমি ঠিক ছাড়িনি, বললাম আমি : সত্যি বললে, ছাড়িত হয়েছি বলাটাই সঠিক।
এবং সত্যিই তাই। আমার মত মায়াবদ্ধ জীব কখনই সহজে কিছু বা কাউকে ছাড়তে পারে না। আপনার থেকেই মায়ায় জড়িয়ে পড়ি কেমন! অপর পক্ষই আমাকে ছেড়ে যায়, ছাড়িয়ে যায়। বার বার আমার জীবনের সব ক্ষেত্রেই এইটেই ঘটেছে, আমি দেখেছি।
বসুমতী আমি ছাড়িনি, ছাড়তেও চাইনি। কিন্তু কি কারণে যে, দৈনিকের সম্পাদক এবং সর্বাধ্যক্ষ হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ মশাই আমার প্রতি বিরূপ হলেন, জানি না, আমি তাঁর ত্রিসীমানার থেকে নিজেই সুদূরপরাহত হয়ে গেলাম।
প্রাণতোষ ঘটকের আমলে বসুমতী নবপর্যায়ে নবীনরূপে দেখা দিয়েছিল। তারই আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে রবিবারের কাগজে ঐ এক কলমের চুটকি লেখায় লাগি।
যতদূর মনে পড়ে, হেমেনবাবু ভালভাবেই নিয়েছিলেন আমায়। বসুমতীর পৃষ্ঠায় বহু বিজ্ঞাপিত পঞ্চম জর্জের কমর্দনকারী, প্রায় পঞ্চম জর্জেরই ন্যায় ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে শোভমান সৌম্যদর্শন বহুশ্রুত এই ভদ্রলোককে প্রথম পরিচয়ে আমার ভালোই লেগেছিল সত্যি। তিনিও আমার ঐ চুটকি লেখার প্রশংসাই করেছিলেন।
বলেছিলেন, বিলেতের পানচ্ কাগজের গোড়াতেই এই ধরনের লেখা থাকে। চারভারিয়া। পানচ্ আপনি দেখেছেন নিশ্চয়?
দেখেছি, পড়েওছি। এখনও পড়ি হাতে এলে। তবে যথার্থ বলতে, পাঞ্চের চারভারিয়ার চুটকির রসে আমাদের ঠিক মন ভরে না। ওদের হিউমার ঠিক বুঝতে পারি না বলেই হবে হয়ত।
পাঞ্চের ঐ পৃষ্ঠাটি যিনি লেখেন, বিস্তর টাকা পান আমি জানি। তিনি অন্তত পাঁচশো পাউন্ড পান। সে হিসেবে আমরা আপনাকে তেমন কিছু দিতে পারব না। বসুমতীর হরে মাপে আমরা দেব, আপনার মুঠো ভরবার মত তা হবে না হয়ত।
মাসিক একশ টাকা আমি পেতাম, আর তাইতেই আমি খুশি ছিলাম।
তাই, অশোকবাবু যখন জানতে চাইলেন আনন্দবাজারের থেকে কতো আমি পেতে চাই, তখন আমি হেমেন্দ্রপ্রসাদের কথাটাই বললাম–তার মন্তব্যেরই পুনরুক্তি করলাম : আপনারা আমার মুঠোর মত দেবেন কেন, আপনাদের হাতের মাপেই দেবেন আমায়।
কত পেতেন আপনি বসুমতীতে!
একশ টাকা করে।
কিন্তু সত্য কথা বলা হল না। একশ টাকায় শুরু হলেও এবং বহুদিন ধরে তা পেলেও, টাকাটা আশীতে এসে দাঁড়িয়েছিল শেষটায়। এবং শেষ পর্যন্ত তাও দাঁড়াল না।
হঠাৎ একদিন গিয়ে শুনলাম, তিনি সেই মাসের আমার বিলটা পাশ করেননি। পরের মাসান্তেও ঠিক তাই হল। এবং তৃতীয় মাসেও ঘটল তাই। সেবারেও পাশ না করে তিনি বিলের পাশ কাটিয়েছেন। বার বার তিনবার। তৃতীয়বারেও আশী টাকার আশা না দেখে বাধ্য হয়ে তখন আমাকেও বসুমতীর মায়াপাশ কাটাতে হল।
বাবা বলতেন, জ্বর আর পর খেতে না দিলেই পালাবে। পর তো আর ঘরের বউ নয় যে, খেতে না পেলেও পড়ে থাকবে। কিচ্ছুটি আজ খাসনে, জ্বর তোর সেরে যাবে তাহলেই। দেখিস।
আমার মনে হয়েছিল, পরের মেয়ে হলেও বৌরা হয়ত পর নয়, পরীই হয় বোধ হয়–সেই কারণেই তাদের বেলায় এই অন্যথাটা হয়ে থাকে।
আমার ধারণা, হেমেন্দ্রপ্রসাদের বাবাও হয়ত তাঁকে এই প্রবাদ বচনটা বলে থাকবেন।
হেমেন্দ্রপ্রসাদ স্বাভাবিক সৌন্যবশেই সম্ভবতঃ কাউকে ঘাড় ধরে আপিসের বার করে দিতেন না। পত্রপাঠ বিদায় দেওয়াও হয়ত তাঁর বাঞ্ছনীয় ছিল না। কাউকে গলা ধরে অধঃকরণ না করে কেবল তার গলাধকরণের পথ বন্ধ করে দিতেন। খাদ্যের বরাদ্দ বন্ধ হলেই, বাধ্য হয়ে, বসুমতী কেন তুমি এই কৃপণা–বলে তাকে পথ দেখতে হত তখন।
