আবার আর একবার জ্ঞান হারিয়ে গিয়েছিল আমার। অনেক রাতে যখন জ্ঞান ফিরে এল, দেখলাম, ভুতোর বউ বোন অন্ধ ভাই তিনজনে তিনখানা তালপাতার পাখায় অনবরত আমাকে হাওয়া করে চলেছে। পরিশ্রমে তাদের শরীর বেয়ে নামছে দরদর ঘাম। হাওয়ায় পোড়ার জ্বালা কম হয়। কিন্তু কত কম! যার ডানদিকের অঙ্গের পুরো এক পরত চামড়া খুলে গেছে, শুধু হাওয়ায় তার কী হবে। একটু পরে অবশ্য কে যেন একটা বার্নল কিনে নিয়ে এল। অষুধের দোকান অনেক দূরে। তাই তার আসা যাওয়ায় দিন গড়িয়ে গিয়ে রাত নেমে গেছে। কিন্তু যা পোড়া একটা বার্নলে কুলাবার নয়। একটু একটু করে লাগিয়ে সবটা শেষ।
যখন অজ্ঞান হয়েছিলাম তখন বিশেষ কিছু টের পাইনি। এখন জ্ঞান হবার পর সারা শরীর জুড়ে টের পাচ্ছি যন্ত্রণার এক মহাসমুদ্র। যেন চিতার আগুনে জীবন্ত দাহ করা হচ্ছে আমার দেহ। কিন্তু আমার কিচ্ছুটি করবার কোন উপায় নেই জ্বলন সয়ে যাওয়া ছাড়া। আজ আমি বড় বিপন্ন–অসহায়। একটু যে পাশ ফিরে শোব সেই সামান্য শক্তিটুকুও আর নেই আমার।
জল, একটু জল দাও। ভুতোর বোন সুধা–মাত্র পনের বছরের মেয়ে সুধা, পুরো পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবার জন্য যার মনোকষ্ট সবচেয়ে বেশি। সে জল এনে আমার মুখের কাছে ধরে মায়াময় গলায় বলে-খাও দাদা, জল খাও।
গ্রামের ভাবনাকাতর সব মানুষেরা এখন উঠোনে বসা। তাদের গলার স্বর বড় নিচু আর নরম। বুঝতে পারি কোন গোপন শলাপরামর্শ হচ্ছে। আমার চেতন আর অর্ধচেতন শরীরের সাথে যুক্ত শ্রবণেন্দ্রিয় যথাযথ সব শব্দ ধরতে পারছে না। তবে এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সবাই সর্বসম্মতিক্রমে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার চেষ্টা করছে। যেটা আমার পক্ষে ভালো কিছু নয়। শুনতে পাই একজনের মৃদু গলা-ভেবে দ্যাখ ভুতো, এছাড়া এ্যাখোন আমাগার আর কোন উপায় নাই।শালা, আমাগার কপালই খারাব।নালি ওরাম বেভুলি বিড়ি ধরাতি যাব ক্যান! এ্যাখোন আর কী করবি বল! বোমা ফাটার ব্যাপার বাবু পাড়ার লোক জেনে গে থাকলি, এ্যাতক্ষণে থানায় পৌঁছে গেছে। পুলিশ এসে পড়ল বলে। এই অবোস্তায় এরে আমরা কোতায় নুইকে রাখবো বল? নিরঘাত ধরা পড়ে যাবে। পুলুশের মার জানিস তো? ত্যাখোনও আমাগার নামধাম সব বলে দেবে। আর এটা কেস চেপে যাবে নামে নামে। তাই বলতিছি।
আর একজন বলে–এ্যাখোন বরষাকাল। নদীতে ভরা জল আর সেই রকম টান। ফ্যালার সাতে সাতে ভেসে কোথায় না কোথায় চলে যাবে। কেউ নাগাল পাবে নে।
তখন বলে ভুতো–ভাই, তোমরা যা বলতেছো, দশদিক ভেবে দেখে নিচ্চয় বলতেচো। তেবু কেন জানিনা সে কতায় মোন সায় দিতি চাচ্ছে নে। এ্যাট্রানোক, এ্যাখোনও পেরান আছে। তারে নদীতি ফেলে দেবো? যার কোন দোষ নাই। এই অবোস্থা হয়েছে আমাগার জন্যি! না ভাই, সে আমি পারবো না।
–ভুতো খুব নরম মোনের মানুষ। ওর দয়া মায়া বেশি।
–মদ নিয়ে আয়। মদ খেলি মোনের দুব্বলতা কেটে যাবে। যা নিয়ে আয়। একটু পরে কে যেন আবার বলে–মোন খারাব করে আর কী করবি বল ভুতো! এছাড়া আর কোন পথ নেই রে।
মদ এসে গেছে। মনের সাহস বাড়াবার জন্য শুরু হয় পানপর্ব। লোকগুলো একেবারে নির্দয় নয়। এখন অবস্থা বিপাকে এমন নির্দয় নিষ্ঠুর হতে হচ্ছে তাদের। ভূতত একবার ঘরে এসে আমাকে দেখেও যায়। দাঁতে দাঁত চেপে মরার মত পড়ে থাকি আমি। কোন শব্দ করি না। যদি জেনে যায় আমি সজাগ আছি তাহলে ওদের গলার স্বর আরও নিচু হয়ে যাবে। তখন পরিস্থিতি কোনদিকে গড়াচ্ছে কিছু বোঝা যাব্দেনীবুঝকৈপালে আর কিছু না হোক অন্তত প্রস্তুত থাকা যাবে।
মদে ভুতোর নেশা হচ্ছে না। তারই জবাবের জন্য অপেক্ষা করছে সবাই। সে যা বলবে–তাই হবে। তার একটা হা, না, এর উপর ঝুলছে একটা জীবন। এখন তার মুখের একটা বাক্য বন্দুকের গুলির সমান। যা একবার ছুটে গেলে আর ফেরানো যাবে না। সারা জীবন ভুলোকে সেই বাক্যের দায় ভার বহন করে যেতে হবে। আমাকে সে নিয়ে এসেছে, তার দায়িত্ব ছিল ফিরিয়ে রেখে আসার। এখন সে সেই মিত্রের মৃত্যুর কারণ কেমন করে হয়। আমি কোন কথা বলি না। শরীরময় যে যন্ত্রণা হচ্ছে–মাগো বাবাগো ছাড়া আর কিছুমুখ থেকে বের হতে চায় না। তবু যদি কিছু বলার চেষ্টা করি তাতে কোন লাভ হবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিচারে আমি এখন এক মৃত মানুষ। আমার মতামত-মৃত মতামত যা জীবিতের কাছে মূল্যহীন।
এখন ভুতোর বেশ উত্তেজিত গলা-দ্যাখো ভাই, তোমরা যে সব পেলান করতিছো সেডা ঠিক পেলান নয়। ওরা বলে গিছে গাড়ি নিয়ে দুদিনের মধ্য আসবে। আসুক আর না আসুক সেই দুটোদিন দেখা দরকার। যেদি আসে–এসে যেদিবলে আমাগার নোক কই? আমরা তার কী জবাব দেবো?
–কিন্তু তারই মধ্যি যেদি পুলুশ এসে পড়ে?
–যেদি না আসে?
–যেদি না আসে সে তো গেরামের সবার পক্ষে মঙ্গল। কিন্তু যেদি আসে?
সব নিশ্চুপ। আর কোন শব্দ নেই। জলাভূমির উপর দিয়ে ছুটছে রাত্রির শনশন বাতাস। বাতাস নয়, যেন হাজার বুক ঠেলে বের হওয়া দীর্ঘশ্বাস। জলের উপর মাথা উঁচুধানের শিষগুলো সাপের ফণার মতো দুলছে। যেন কোন বিষম ভয়ে আমূল নড়ে যাচ্ছে মহাবিশ্ব! এই সব কিছুর উপর ছেয়ে আছে আলকাতরার মতো গাঢ় অন্ধকার। কোন বাচ্চা কাঁদছে না, কোন বুড়ো কাশছ না, কোন কুকুর ডাকছে না। কোথাও এখন কোন প্রাণ আছে, বোঝা যাচ্ছে না। গাছগাছালি ঘেরা দরিদ্র এই গ্রামটায় সন্ধ্যে নামবার সাথে সাথে আজ সব প্রাণ মারা গেছে। এখন যারা ভুতোর উঠোনে বসে ফিসফাস করছে-সব যেন প্রেতাত্মা।
