এখন আমার আর কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব সংশয় কুণ্ঠা কিছু নেই। এত মানুষের জন্য যদি অন্যায় অপরাধ কিছু হয়ে থেকে থাকে–হোক। এমন অন্যায় আমি বারবার করতে চাই। বসে যাই আমি মশলার থালা নিয়ে বোমা বাঁধতে। একদল গ্রামবাসী গোয়াল ঘরের খড়ের গাদার উপর বসে দেখছে সেই নির্মাণ। একটা সাদা একটা একটু মেটে লাল, দুটো নিরীহ পদার্থের সংমিশ্রণে কেমন করে প্রস্তুত হচ্ছে একটা ভয়ংকর মারণাস্ত্র। দেখতে অতি সাধারণ, সুতলির গোলার মতো একটা জিনিস। যা ছুঁড়ে ফেলার পরে বাজ গর্জনে প্রবল প্রতিপক্ষকে পরাস্ত ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
কলাইকরা কানা উঁচু একটা বড় থালায় ঢেলে মাখানো হয়েছে সব মশালাটা। যেখান থেকে পরিমাপ মতো অল্প কিছুটা মশলা নিয়ে তাতে কাঁচের টুকরো জালের কাঠি বেয়ারিংবল এসব দিয়ে বানানো হচ্ছে বোমা। যা দেখে বাগদি পাড়ার মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে রণ উন্মাদনা। দেখে নেব শালাদের। অনেকদিনের অনেক হিসাব বাকি পড়ে আছে। শালা, কেটে ছিলাম এককাদি কলা। সারারাত ধরে পিটিয়েছে। আবার জেলেও দিল। দু দুটো বচ্ছর পচেছি। না খেতে পেয়ে বউটা আমার পালিয়ে গেল। সব শোধ নেবো আজ।
কথার মধ্যে প্রবল উত্তেজনায় সে হঠাৎ দেশলাই কাঠি ঠুকে বসল। বিড়ি ধরাবে। কেমন করে যেন দেশলাই কাঠির আগুনের ফুলকি ছিটকে এসে পড়ল কলাই করা থালার মশলার স্তূপে। সাথে সাথে দপ করে বিশাল একটা আগুনের গোলা একরাশ সাদা ধোঁয়া ছড়িয়ে উঠে গেল আকাশের দিকে। গোয়াল ঘরের খড়ের চালে জ্বলে উঠল দাউদাউ আগুন। তার লাল, লেলিহান শিখা ছুটল উপর দিকে। সেই সাথে খড় পোড়া কুণ্ডলী পাকানো সাদা ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারদিক। আমার হাতে যে অর্ধ-নির্মিত বোমাটি ছিল হস্তচ্যুত হয়ে নিচে পড়ে ফেটে গেল বিকট শব্দে। প্রিন্টার ছুটল সব দিকে। যারা বসে বোমা বাধার কলাকৌশল দেখছিল আহত হল তারা দুচারজন। আহত তারা অল্পই তবে আতঙ্কিত অনেক বেশি। পূর্বে যে নয়খানা বোমা তৈরি হয়ে গরুর জাবনা দেওয়া মেঝলায় রাখা আছে যদি সেগুলো ফেটে যায় গোয়াল উড়ে যাবে। মরে যাবে সবাই। তারা প্রাণভয়ে ছুটল যে যেদিকে পারে। মুহূর্তের মধ্যে একটা হুলুস্থুলু কাণ্ড।
আমি দৌড়ে অতিকষ্টে গোয়াল ঘরের বাইরে এসে উঠোনে পড়ে গেলাম। মশলার থালা যেদিকে ছিল সেই ডানদিকটা সম্পূর্ণ ঝলসে গেছে। হাত পা মুখ থেকে এক পরত চামড়া খুলে ঝুলে পড়েছে। পোড়া চামড়ায় বারুদের কটু ঘ্রাণ। ছেঁড়া চামড়ার ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে ডিমের মত সাদা মাংস।
গোয়াল ঘরের লোকজনদের আতঙ্কিত চিৎকার এবং বোমা ফাটার আওয়াজে বড় ঘর থেকে ছুটে এলো ভুতো মেঘনাদ আহবালিরা। তাদের তখন আমার দিকে দেখবার মতো সময় কোথায়! তারা হাতের কাছে যে যা পেল নিয়ে ছুটে গেল জল নিয়ে আসতে। পুকুর পাশেই ছিল। গোয়ালের আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে নেভানো গেল। আমি তখন যন্ত্রণায় সারা উঠোন জুড়ে পোড়া সাপের মতো গড়াচ্ছি। উঃ মরে গেলাম, আঃ মরে গেলাম। তখন ওরা আমাকে তুলে পাশের বড় ঘরে নিয়ে গেল। যে মাদুরে শুয়ে তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল তাতে আমাকে শুইয়ে দিল।
মদ! মদ নিয়ে আয়। একজন ছুটে গিয়ে তার ঘর থেকে নিয়ে এল একঘটি চোলাই মদ। খেয়ে নাও। যন্ত্রণা কমে যাবে। মুখের কাছে ধরতেই চো চো করে পুরো একঘটি-র চোলাই টেনে নিলাম আমি। তখনকার মত যন্ত্রণাটা সত্যি সত্যি কমে গেল। কারণ দশ মিনিটের মধ্যে জ্ঞান হারাল আমার। থেমে গেল এতক্ষণের উঃ আঃ।
মশলা পুড়ে গেছে। বোমা ফেটেছে। আওয়াজ কতদূরে গেছে তা কে জানে। বামুন কায়েত পাড়া হয়ে সে আওয়াজ থানার দিকে যে চলে যায়নি, তার কী প্রমাণ। শুভ কাজে বিঘ্ন ঘটে গেছে। এখন বেশ কিছুদিনের মধ্যে পরিকল্পনাকে আর বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে না। আর এখানে অপেক্ষা করে কী লাভ! আহবালি মেঘনাদ এখন এখান থেকে সরে পড়তে পারলে বেঁচে যায়। এরা তো কেউ আমার আত্মীয় বন্ধু আপনজন নয় নয় সেইসচেতন রাজনৈতিক সহকর্মী কমরেড। যারা বন্ধুর বিপদকে নিজের বিপদ মনে করে বুক দিয়ে আগলে বসে থাকে। এদের কাছে নিজের প্রাণ ছাড়া নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু প্রিয় নয়। তেমন কোন শিক্ষা এরা পায়নি তো কী করবে! আমি বুঝতে পারছি এরা একবার কোনভাবে এখান থেকে সরে পড়তে পারলে আমি মরে গেলেও এরা আর আসবে না। কিন্তু আমি ওদের যাওয়া আটকাব কী করে!
ভুতোকে বলে আহবালি–আর আমরা এখেনে থেকে কী করবো? যা হোক করে এরে তোমরা দুটোদিন লুকিয়ে রেখে দাও। কলকেতা গে এটা গাড়ির বেবস্তা করে এসে নে যাবো।
সন্ধ্যে ঘনাবার আগেই ওরা চলে গেল। তবে যাবার আগে ভুতোর কাছে কিছু টাকা রেখে গেল–এই দিয়ে যাহোক কিছু ওষুধপত্তর কোরো। তারপর তো আমরা আসতিচি।
জীবনে বহুবার বহুরকম বিপদে পড়েছি। কিন্তু সে সময়ে শরীর সক্ষম এবং মস্তিষ্ক সক্রিয় ছিল। এখন আমি যে বড় অক্ষম-অসহায়। বলতে গেলে এটা আমার কাছে বিদেশ বিভুই। মানুষগুলো সব অনাত্মীয়। যে আত্মীয়তা আত্মার সাথে আত্মার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে সে এক দীর্ঘসুত্রীয় কার্যক্রম। আসিলাম বসিলাম আর হয়ে গেল, ব্যাপারটা এমত সরল নয়। সে যা হোক, এখন আমি কী করি? বুঝতে পারছি আমাকে ঘিরে এক চরম বিপদ বৃত্ত করে আসছে। অনাত্মীয়–অন্নের চিন্তায় কাতর একদল মানুষ, যাদের অনবরত পুলিশ খুঁজে বেড়ায়। প্রিয় শয্যায় সঙ্গিনীকে পাশে নিয়ে কেউ রাতে ঘরে ঘুমাতে পারে না। এই রকম আধপোড়া একটা মানুষ তাদের কাছে একটা বোঝা-মস্ত বড় সমস্যা।
