আবার কিছু সময় পরে শোনা গেল ভুতোর অসহিষ্ণু গলা, ক্যানো ভাই তোমরা সব অবুঝ হচ্ছো! বলো তোমরা, য্যাখোন তারা এসে বলবে, সে কই? আমি তার কী জবাব দেবো?
-বলবি, মরে গেছে। মরার উপর আর কী কত? মরা তো রাখা যায়নে তাই ফেলে দিইচি। করো এ্যাখোন কী করবে।
-তালি আর আমি কী বইলবো। সব্বাই যা ভালো বোঝো, তাই করো। ভুতো এতক্ষণ পরে সম্মিলিত চাপের সামনে মাথা নত করে দেয়, চলো। ফেলে দিয়ে আসি।
কিছু সময় পরে একজন লোক একটা বাঁশের মাচা নিয়ে ঘরে এসে ঢোকে। সুধা আর তার বউদি পাখা চালনা বন্ধ করে কাতর মুখে এক পাশে সরে দাঁড়ায়। শুধু অন্ধ বুধো যে অন্ধ বলেই যেন অনেক কিছু স্পষ্ট দেখতে পায়। বুঝতে পারে যা ঘটতে চলেছে তার ঔচিত্য, অনঔচিত্য। তার মুখ থেকে তখন যে শব্দ বের হয় তাকে একটা হাহাকার বলে মনে হয় আমার, এরে কোথায় নে যাচ্ছিস! যা আসলে এই সময়ের কাছে এখন একটা অর্থহীন শব্দ মাত্র।
মাচা পাতা লোকটা–যাকে এই অপ্রিয় কাজটা করতে হচ্ছে, মুখ দেখে মনে হয় সে এটা না করতে হলে সবচেয়ে খুঙ্গিক অপরাধবোহাকু পীড়া দিচ্ছে। তারই ভুলে বারুদ পুড়েছিল। সে কাতর গলায় বলে–দাদা, ওদাদা, শুনতি পাচ্ছো! ওঠো। উঠে এই মাচায় শোও। তোমারে অন্যদিকে নে যাব। ভালো জায়গায়।
আমি জানি, অনুনয় বিনয় আবেদন নিবেদন প্রাণভিক্ষার আর্তি, এসব এখন কোন কাজে আসবে না। আমার পক্ষে পরিস্থিতি বড় প্রতিকুল। আমার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এর কোন পুনর্বিচার হবে না। এখন আমি এদের সাথে অসহযোগিতা করলে পেটের মধ্যের মদ ওদের ক্ষিপ্ত করে তুলবে। তখন টেনে হিঁচড়ে মাচায় নিয়ে ফেলবে। কষে বেধে দেবে মাঁচার সাথে। চিৎকার যদি করি গলা টিপে ধরাও অসম্ভব নয়। মানুষ অনেক সময় সাহসে যে কাজ করতে না পারে ভয় পেয়ে করে দেয়। ওরা এখন ভীষণ রকম বিপন্নতা বোধের দ্বারা আক্রান্ত। তাই অনেক কিছুই করে ফেলতে পারে। এখন আমার বাঁচার কোন আশা না করাই উচিৎ। আশা করা উচিৎ, মৃত্যুটা যেন সহজ হয়। তাই গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে মাচায় উঠি–চলো ভাই।
চারজন চারকোণে কাঁধ দেয়। এ এক বড় আশ্চর্য শবযাত্রা। যে প্রাণ এখনও ধুকপুক করছে, একটু পরিচর্যা পেলে বেঁচে উঠতে পারে, তাকেই মৃত ঘোষণা করে দিয়েছে এই সময়। আর তাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে চারজন মরা-ভয়ে মরা। কারও মুখে কোন বোলহরি ধ্বনি নেই, পথে কেউ খইছেটাচ্ছে না। ফুল ধুপ অগুরু চন্দন নেই। কারও মুখে নেই শোকাতুর কান্না। শুধুচারজোড়া পায়ের জল ছপ ছপ শব্দের মধ্যে দিয়ে ফুরাচ্ছে একটা জীবনের সব পথ। সব চলাচল।
চিৎশোয়া আমি আকাশ দেখি। কালো ছাতার মত আকাশটার গায়ে পোকা কাটা হাজার ছিদ্র। ছোটছোট সেই ছিদ্রে উজ্জ্বল আলোর আভাস।ওটা কী কালপুরুষ! ওটা কী সপ্তর্ষি! শুনেছি আকাশে নাকি ধ্রুবতারা থাকে। সেটা কোনটা? না, আর কোনদিন তা জানা হবে না। জীবনের অনেক অজানার মধ্যে এটাও রয়ে গেল। তবে যা জেনেছি সেটা কী কম! চারকাঁধের মৃত্যুদোলায় চেপে উদার আকাশ দেখা-মানব জীবনের এক অতুল অভিজ্ঞতা। এমন আর কে দেখতে পেয়েছে, যা এখন আমি দেখছি!
এর জন্য আমি কী এখন জীবনকে ধন্যবাদ জানাব? কৃতজ্ঞ হবো, এমন জীবন যে দিয়েছে তার প্রতি?
এখনও আমার বুকের বাঁদিক ঢিপঢিপ করে বলছে–আমি বেঁচে আছি। কিন্তু সে এখন মাত্র একটা কথার কথা। পরিবেশ পরিস্থিতি সে কথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলবে তুমি বিগত। তুমি অতীত। তুমি মৃত। ওই আকাশ আর তারা, এই ফুরফুরে হাওয়া সব নিরর্থক। তোমার হাতে গোনা মাত্র কটা নিঃশ্বাস বাকি, তারপর সব শেষ। ঝপাং করে একটা শব্দ হবে, দেহটা তলিয়ে যাবে অতল জলের তলায়। জলচর প্রাণীরা খুবলে খাবে।
নদী যখন, জলে নিশ্চয় খুব স্রোত। আমি ভাল সাঁতার জানতাম। শিরোমণিপুরে একবার জলে ডুবে গিয়েছিলাম। আর যাতে না ডুবি বাবা শিখিয়েছিলেন। এখন আর সে শিক্ষা কোন কাজে আসবে না। আগুন আর বারুদের ছোবলে সারা অঙ্গ অসাড়। হাত পা চলবে না। এত যত্নে বাবার দেওয়া বিদ্যা-সব ব্যর্থ।
একটু যেন ঘুমঘুম পাচ্ছে। ছোটবেলায় মায়ের কোলে এই রকম দুলুনিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। মা আমাকে কোলে নিয়ে গান গাইত ছোট্ট সোনা চাঁদের কণা ….., এখন আমার বড় মায়ের কথা মনে পড়ছে। সে যেন তার সেই ছোট্ট শিশু সন্তানকে ডাকছে ফিরে আয় বাপ আমার যাসনে। ফিরে আয়।
ফিরে আয় বললেই কী ফেরা যায় মা? পায়ে পায়ে বহুদুর চলে এসেছি। এখন ফিরে যাবার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আর কোনদিন আমার ফিরে আসা হবে না। বিল্টুদায়।
বর্ষার ভরা দামোদর নদীর ক্রুদ্ধ গর্জন এখন কানে আসছে আমার। পাগলা খ্যাপা ঢেউ ছুটছে। পাড় ভেঙে। তারই ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দমবন্ধ হয়ে আসছে আমার। বুক থেকে ঠেলে উঠছে একটা বোবাকান্না। চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে নামছে নোনা জলের ধারা। বুকের বাঁদিকটা প্রবলভাবে লাফাচ্ছে। আর মাত্র কয়েক পা। তারপরই ঝপাং। সব শেষ। সময় না পায়ের শব্দ তা জানি না শুনতে শুরু করি আমি এক দুই তিন চার পাঁচ ছয়। হঠাৎ যেন মাঠপাথার কাঁপয়ে–সমস্ত অন্ধকার ছিঁড়ে, আছড়ে পড়ে বিকট একটা গর্জন–ভুউউউতো রে এএএ। থা আআম। থেমে-যা।
