এমন একটা “ভালকাজের” সাথে যুক্ত হয়ে মনটা এখন ভালো হয়ে গেছে আমার। বলে একজন–দাদারে, কত বচ্ছর ধরে আমরা পেলান করিচি, শালারে নিকেশ করবো। পারিনি। আমাগার কাঁচে তো অস্তর বলতি ত্যামন কিছু নাই। কটা লাঠি বল্লম। এদে কী বন্দুকের মুকাবেলা করা যায়। এখোন আমাগার হাতে য্যাখোন বন্দুক এসে গিছে এবার সব শালারে উচিৎ শিক্ষা দেবো। ওই বুড়ো শালারে আগে ধরে ন্যাংটো করে নারকেল গাছে বাঁধালো। তারপর পেত্যেকে দম ভর খানিকক্ষণ পিট্টে নেবো। তারপর অন্যকথা।
রাত্রে আমাদের কিছু খাওয়া দাওয়া দরকার। ভুতোর ঘরে এত মানুষের চাল কোথায়। মুষ্টিভিক্ষায় সারাগ্রাম সহযোগ দিল। কেউ একমুঠো চাল কেউ দুটো আলু কেউ এক ফালি কুমড়ো। সারাটা গ্রামে আজ যেন উৎসবের দিন, শিকার পরব। ভাত আর কুমভোর ঘ্যাট রান্না হল। সবাই একসাথে, কলাপাতায় সে খাদ্য খাওয়া হল।
একজন বলল–আমরা কেউ রেতে ঘরে থাকিনে। বাঁশ বাগান কলাবাগান এখেনে সেখেনে ঘুমাই। তবে তোমরা ভুতোর এখেনেই থাকো। কোন ভয়নি, আমরা পাহারায় থাকবো। তা ছাড়া আমাগার পোষা কুকুর আছে। অচেনা কেউ সামনে এলি কামড়ে টুটি ছিঁড়ে নেবে। পুলিশ তোক আর যে তোক এত সহজে কেউ আমাগার গেরামের ধারে কাছে ঘেসতি পারবেনে। তোমরা ঘুমোও।
চারদিকে জল আর ধানক্ষেতের মধ্যে গাছগাছালিপূর্ণ এই গ্রামখানা যেন একটা দ্বীপভূমির মত সুরক্ষিত। এ গ্রামে আসা যাওয়ার জন্য মাত্র একটাই সরু মাটির পথ। সে পথে কোন যানবাহন চলার মতো নয়। জল আর কাদায় থকথকে সে পথে চলতে গেলে মানুষ পেছল খায়। কেউ এলে, দিনের বেলায় দু-মাইল দূর থেকে দেখা যায়। এই গ্রামের প্রায় প্রত্যেক পুরুষের নামে পুলিশি কেস আছে। চুরি ডাকাতি ছিনতাই। তবে সহজে তাদের ধরতে পারে না। এত কষ্টের চলাচল মাস মাইনের সুরক্ষা কর্মীদের কাছে বড়ই বিরক্তিকর। তাই গ্রামবাংলার দাপুটে লোকজন বর্ষাকালে বাগদি পাড়ার সামনে বড় অসহায়। প্রকৃতি সহায় তাই এখন বাগদি পাড়ার দরিদ্র দুর্বল লোকেদের বুকে দাপাচ্ছে সাহস আর এক প্রতিশোেধী চেতনা। আমাদের মা বোনের অসম্মান আর অত্যাচারের বদলা এবার নেবই।
পরের দিন মুখ হাত ধুয়ে মুড়ি পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কা চেবোবার পর আমাকে বলে আহবালি–তোমার উপরে ভার। মশলা রেডি হয়ে গ্যাছে। বসে বসে যে কটা মাল হয় বেঁধে ফ্যালো।
আমি বড় অবাক। আহবালি কী করে জানে, আমি বোমা বাঁধতে পারি। তবে কী কোন সময় মেঘনাদকে বলে ফেলেছিলাম? সে দিয়েছে আহবালির কানে! ব্যাপারটা তাহলে এই হয়েছে। বোমাবাধায় বিশেষ পারদর্শী বলেই আমাকে যুক্ত করা হয়েছে ওদের দলে! তা না হলে আর কেন। ওদের যে “কাজ” আমি তো সে বিষয়ে একেবারে অজ্ঞ। একজন ট্রাকের ড্রাইভার একজন ট্রামের। ড্রাইভার তো দুজনেই, পথও এক। তবু একজন আর একজনের কাজ করতে অক্ষম। এটা একমাত্র অপরাধ বিজ্ঞানীরা ভালো জানে।
বলি–যা মশলার পরিমাণ, গোটা কুড়ি নিশ্চয় হবে। এতে আমি একা কী করে পারব।
কাতর গলায় বলে সে–একটু কষ্ট করে বেনিয়ে ফ্যালো। তুমি ছাড়া আর তো কেউ নেই। কারে বলবো! এ যা ঝামেলার কাজ বোমা না হলি চলবেনে। হাজার দেড় দুই “মাছি ভনভন” করতি পারে। মাছি উড়িয়ে দিতি হলি আওয়াজ খুব কাজে আসে।
বলি–তোমরা তোকইছিলা লোকটা বদমাইশ। সারা অঞ্চলের লোক তার বিপক্ষ, কেউ তার হইয়া আগাইবে না।
আসবে না! এরকম লোকের জন্যি কেউ বিপদে ঝপায় না। বলে আহবালি–তোমারে কী বোঝাবো, তুমি তো নতুন। আমরা দেখেছি। তার কত নাম ডাক, লোক সব সোমায় আগে পিছে ঘোরে। আমরা যেখন গে দরজায় দেড়িয়ে পড়ি, আর কারও টিকির নাগাল পাওয়া যায়নে। সব দূরে দেড়িয়ে চেঁচায়। খুব বেশি হলি এট্টা দুটো ইটপাটকেল ছোড়ে। আমি বলতিচি দেখে নিও এদের জন্যিও কেউ আসবে না। তবে সে বলে তো আমাগার হাত গুটিয়ে বসে থাকা চলে না। পেরান একটা। সে গেলি তো আর পাওয়া যাবেন। তাই সাবধান থাকা লাগে। আমি ধরে নিচ্ছি, ওই গেরামের সবলোক আমাগার পথ আটকাবে। কিছু অন্তর পাতি থাকলিও থাকতি পারে। সেই জন্য আমাগার তরফে কোন খামতি রাখতি চাচ্ছি নে। পঞ্চাশটা কার্টিশ আছে আর এই কুড়িখানা বোমা। এতে পাঁচ হাজার লোকে মহড়া নেওয়া যাবে। একটু পরে আবার বলে সে, আমি আগে এ্যাকবার ঘুরে সব দেখে গিছি। বাড়ির বউ কটার গায়ে যা গহনা, যদি সে কটা ঠিকমত গুছিয়ে নিতি পারি, কমপক্ষে এ্যাককিলো।
ভুতের বোন বেটেছে বোমার মশলা। ভুতো তাকে ছেঁড়া মশারির টুকরোয় চেলেছে। আর গোয়াল ঘরের এককোণে ভুতোর বউ পরিপাটি পেতে দিয়েছে বসবার আসন। ভুতোর পুরো পরিবার-শুধু পরিবার কেন ভুতোদের সারা গ্রামটাই এখন ধাবিত হচ্ছে একটা বিশেষ লক্ষ্যের দিকে। এরা কেউ-ই পুথি পুস্তক পড়া, একনিষ্ঠ মতাদশের প্রতি নিবেদিত প্রাণ, কোন রাজনৈতিক কর্মী নয়। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো, আর শ্রেণি শত্রু খতমের যে বিপ্লবী তত্ত্ব সে বিষয়েও বিশেষ জানে না। তবে ওটা জানে, যে, যারা ছলছুতো পেলে আমার বউ বোন মেয়েকে ন্যাংটো করে হাতড়ায়, যারা কেড়ে নিয়েছে আমার সোনা ফলানো মা মাটি, শালারা নিপাত যাক। নকশালদের সাথে যে কারণে শ্রেণিঘৃণার ক্ষেত্রে কোথায় যেন একটা গোপন মিল।
