হাওড়া থেকে বর্ধমান ট্রেনে দুই আড়াই ঘণ্টার পথ। এরপর বাসে গেল আর ঘন্টা খানেক। তারপর এক ভ্যান রিকশায় মাথা পিছু একটাকা ভাড়ায় পার হওয়া গেল আরও মাইল পাঁচ ছয়। ভ্যান থেকে নেমে এক পায়ে হাঁটা পথে আবার মাইল তিন চার। সব মিলিয়ে গন্তব্য গ্রামে পৌঁছাতে লেগে গেল আট দশ ঘণ্টা। সকাল নটায় হাওড়া থেকে ট্রেনে চেপেছিলাম আর সন্ধ্যে ছটায় পৌঁছাতে পারলাম এখানে।
এই জেলাটি ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। হালকা বাতাসে উড়ছে তার সম্ভাবনাময় ডগা। এই দুধারের ধানক্ষেতের মাঝের আলপথ ধরে হেঁটে এসেছি আমরা। এই গ্রামটায় চল্লিশ পঞ্চাশ ঘর বাগদি পরিবারের বাস। এদের কারও কোন জমি নেই। সব ভূমিহীন। ক্ষেত মজুরি করে আর মাছ ধরে দিন গুজরান। যদি কখনও তেমন সুযোগ সুবিধা পায় পাশের কোন গ্রামে গিয়ে কলাটা মুলোটাও হাতিয়ে নিয়ে আসে। মাথা মুড়িয়ে কেটে বস্তা ভরে তুলে আনে পাকা আধপাকা ধান। জালের খেপ মেরে দেয় কোন পোনা পুকুরে। তাই প্রায় প্রতি ঘরের কারও না কারও নাম পুলিশের লাল খাতায় শোভমান। সঙ্গত কারণেই আশেপাশের বামুন কায়েত পাড়ার লোক বাগদি পাড়াটাকে বিষ নজরে দেখে থাকে। তারা বিষ ঝাড়ার সুযোগ পেলে আর ছাড়ে না।
গ্রামের চারিদিকে একহাঁটু জলে ডোবা ধানের ক্ষেত। জলের এক বিঘত উপরে মাথা উঁচু কচি ধানের শিষ। এই ধান মুখে রেখে দাঁতে চাপলে দুধ বের হয়। যা খেতে দারুণ মজা। জিভ ছুলে যাবার যন্ত্রণা ভুলে ক্ষুধায় কাতর রাখাল বালকেরা খুব খায়। এক সময় আমিও খেয়েছি। একদা এইসব জমির মালিকানা এইসব বাগদি পরিবারগুলোর হাতেই ছিল। জঙ্গল হাসিল করে এদেরই পূর্ব পুরুষ এ জমির অধিকার কায়েম করেছিল। নানান কৌশলে যে জমি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন এই জমির মালিকানা দেড় দুই মাইল দূরের কোন রায় সেন ভট্টাচার্জ চক্রবর্তীদের হাতে। নিজেদের জমিতে এখন নিজেরাই মজুর খাটে বাগদি পাড়ার নারী পুরুষ। তাতে যা মজুরি মেলে–পেট ভরে না–মন ভরে না, অভাব মেটে না। তাই সুযোগ পেলে চুরি করে নেয়। পাকা আধপাকা ধান। ছেলে মেয়ে বউ যে যা পারে অন্ধকারে কেটে তুলে নিয়ে আসে। যদি ধরা পড়ে যায় পুরুষ হলে বেদম মার খায়। আর যদি মেয়ে বউ হয়, সম্ভ্রম-সতীত্ব হারায়।
মার খেতে খেতে অপমানিত হতে হতে অনাহার সইতে সইতে এখানকার মানুষ এখন ভীষণ ক্ষিপ্ত। একটা এসপার ওসপার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। আমার ঠিক জানা নেই ওদেরই একজন কীভাবে যেন যোগাযোগ করেছে ভিন জেলার লোক-নসকাল আহবালির সাথে। যে লোকটা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে তার নাম ভুতো। যার অপুষ্টিতে দরকচা মারা দেহ! মাথা আর পেটটা বড়! গড়ন একটু খাটো। বয়েস মনে হয় তিরিশের কোঠায়। তার একটা বোন আছে। গত বৈশাখে যে পনের পার হয়ে গেছে। তবু এখনও কোন পাত্র পাওয়া যায়নি। এ পাড়ার মেয়েদের বর পাওয়া, ঘর পাওয়া খুবই মুশকিল। য়ে দেখতে এসে পাত্রপক্ষ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবে জেনে নিতে চায়–এই মেয়ে কোন রাতে বাবুদের ক্ষেতের ধান ছিঁড়তে গেছে কী না। কোনবার ধরা পড়েছে কী না।
ভুতোর একটা ভাই আছে, যে রাত নামলেই অন্ধ। তখন আর সে কিছু চোখে দেখতে পায় না। মা নেই। বাবা আছে। তবে কোথায় আছে কেউ জানে না। বছর খানেক আগে খবর পাওয়া গিয়েছিল সে নাকি বর্ধমান শহরের পথে পথে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ভুতে গিয়ে অনেক খুঁজেও তাকে পায়নি। ভুতোর বউ আছে। যে আর মাত্র কয়েকদিন পরে মা হবে।
“কলকাতা” থেকে আসা আমরা সাতজন সন্ধ্যার কিছু পরে ভুতের বাড়ি গিয়ে উঠলাম। বাড়িটা মাটির, কিন্তু দোতলা। এটা ওই পাড়ার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও বড় বাড়ি। বলে ভুতো, কবে নাকি সে কোন মেলা দেখে ফেরবার পথে এক বামুন বউয়ের বিছে হার ছিঁড়ে নিয়ে ছুটে পালাতে পেরেছিল। সেই টাকায় এই ঘরবাড়ি। না হলে আজও সেই কুঁড়ে ঘরই থাকত। আজকের রাত আমাদের ভুতোর দোতলায় বিশ্রাম। যা হবার তা হবে কাল রাত্তিরে, চাঁদ যখন ‘ঘড়ি মারবে।’ আহবালি তার হাতে ধরা ব্যাগ খুলে দুটো ওজনদার পোটলা বের করে ভুতোর হাতে দিয়ে বলে–এগুলো এ্যাখোন রেখে দাও?কাল কাউরি দেমিহিন করে গুড়ো বানিয়ে দিও। এখন আমি বুঝতে পারি ও দুটো হচ্ছে বোমা তৈরির মশলা। অতদুর থেকে তৈরি বোমা বহন করে আনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। পথে ফেটে যাবার ভয় আছে। তাই মশলা এসেছে। এইখানে বসে নির্মাণ হবে সেই আওয়াজকারী আয়ুধ। যা মানুষকে ছত্রভঙ্গ আর ভীতত্রস্ত করে দিতে অদ্বিতীয় অস্ত্র।
আমরা যারা এখানে এসেছি, বলতে গেলে সবাই হচ্ছে সহযোগী মাত্র। মূল কাজটা সম্পন্ন করবে এই গ্রামেরই লোকজন। যারা সংখ্যায় অনেক। যাদের শারীরিভাষ্যে প্রকাশ পাচ্ছে, ওরা সেই অত্যাচারী জোতদারটার ঘরে কাল কীসে খাবে সেই কঁসার থালাখানিও রেখে আসবে না। পড়বে সে কাপড়খানাও নিয়ে চলে আসবে। যা ওরা বয়ে আনতে অপারগ হবে, ছিঁড়ে ভেঙে নষ্ট করে দেবে, এত আক্রোশ। ওরা সব দল বেঁধে আমাদের দেখতে এল। এবং আমাদের দেখে দারুণ পুলকিত হল! এক সময় আগুনগোর আসল নকশালদের সাথে ছিলাম। প্রচুর গুলিবোমা ছুঁড়েছি। তার একটাও প্রকৃত শ্রেণিশত্রুর শরীর ছুঁতে পারেনি। সবটাই পর্যবসিত হয়েছে এক নকলযুদ্ধে–অকারণ আত্ম অপচয়ে। আজ মনে হচ্ছে, আজীবন আমার যে তালাশ সেখানে পৌঁছে যাব। আজ আমার ছোঁড়া বোমার প্রিন্টার প্রকৃত এক গণশত্রুর বুকে আঘাত হানবে। একটা দরিদ্র গ্রামের শিশু বৃদ্ধ নারী পুরুষ যে পরিবারটির ধ্বংসের জন্য সর্বস্ব পণ করে বসে আছে তার সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক সে সমাজবন্ধু কখনই হতে পারে না।
