এখন পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব কটা জেলই নকশাল বন্দিতে পূর্ণ। তবে উঁচু ধরনের তাত্ত্বিক যত নেতা সব আছে প্রেসিডেন্সি জেলে। কিছু আছে দমদম কিছু বহরমপুরে। ও যে জেলে ছিল সেই সাবজেলে যাদের সে কাছে পায় তারা কর্মী হিসাবে যেমন হোক শিক্ষক হিসাবে দুর্বল। ফলে আহবালি তাদের কাছ থেকে সঠিক সুরে জাগো জাগো সর্বহারা গানটা গাইতে শেখে, শিখতে পারে না শ্রেণি সংগ্রাম কৃষি বিপ্লব এসব কথার সঠিক মানে। শ্রেণিঘৃণা, সে তো তার ভিতরে বহুপূর্ব থেকে মজুত–যা তাকে চন্দ্রশেখরের মিটিংয়ে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। অসম্পূর্ণ শিক্ষার ফলে তা সঠিক দিশায় চালিত হয়নি। এক দেড় বছর পরে জেল থেকে বের হয়ে সে যে সংগঠন গড়েছে আর যা সে করছে তার সাথে রঘু ডাকাতের কর্মকাণ্ডের কিছু মিল পেলেও চন্দ্রশেখরের কাজের কোন মিল পাওয়া মুশকিল। মেঘনাদ এখন তার কাছে নাড়া বেঁধেছে।
এতসব কথা আমি তখন জানতাম না। এ সব বলেছে পরে। যাদবপুরের চেনা। তাই আলাপ করে এখন কোথায় কী কাজে লেগেছে জানতে চেয়েছিলাম। যদি সম্ভব হয় আমাকেও লাগাতে পারে কিনা! আমি যখন গড়িয়ার কাজ ছেড়ে আসি আমার কাছে যে শদুয়েক টাকা ছিল এখন তা সব শেষ। যাদের সাথে আমি থাকি ওরা ছয়জন আর আমি, যত কম হোক দুকিলো চালের কমে দিন চলে না। সাথে একটু আলু, ডাল। এর জন্য দিনে দশ টাকা আমি দেই বাকিটা ওদের যায়। নিজেরও আমার এক আধ টাকা হাত খরচ। ফলে এখন ট্যাক একদম খালি। কিছু একটা কাজকর্ম না করতে পারলে আর চলবে না।
মেঘনাদ আমার সব খবর রাখে। আমার অতীত জানে। তার ধারণা আমিও তার বিষয়ে জানি। আসলে তো আমি কিছুই জানি না। তাই আমি কাজে যেতে ইচ্ছুক শুনে বলে সে–আহবালি ভাইকে না জিজ্ঞাসা করে বলা যাবে না। আমি তারে তোমার কথা বলব। সে যদি মত দেয় তখন!
–আহবালি কে?
–আমি যার সাথে কাজে যাই। আমার মোনে হয় না সে তোমার কথা শুনলি না বলবে। নসকাল সকালে এট্যা টান থাকে না। নিশ্চয় দলে নেবে।
আমি সেই সময় ছিলাম এক “অসম্পূর্ণ শিক্ষার শিকার” মাথার ঘায়ে কুকুর-পাগলা মানুষ। প্রতিটা পদক্ষেপ ভুলের পাকে জড়িয়ে যাচ্ছিল আমার। কোন শক্ত “সঠিক অবলম্বন” হাতের নাগালে না থাকায় আমি ডুবে যাচ্ছিলাম দিশাহীন অন্ধকূপে। অনেকদিন পরে বিখ্যাত শ্রমিক নেতা শংকর গুহ নিয়োগীর মুখে বার বার এই কথাটা শুনেছি, যা তিনি আমার আত্মানুসন্ধান অনুশোচনা পর্বে বলতেন–”যে গরিব তার কাছে কোন নীতি নৈতিকতার আশা করা যায় না।”–সত্যিই যায় না।
খিদে এমন এক মহা ঘাতক যে মানুষের মন-বুদ্ধি-বিবেক-দয়া-মায়া-স্নেহ-প্রেম-মনুষ্যত্ব সব খেয়ে নেয়। কে দেখেছে তা জানি না, আমি দেখেছি খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বাপ তার মেয়েকে বেশ্যার দালালের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। স্বামী তার স্ত্রীকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে খদ্দেরের সামনে। মা তার শিশু সন্তানকে বিলিয়ে দিচ্ছে চালের বদলে। ছুঁড়ে ফেলছে কুঁয়োর মধ্যে।
এই কঠিন সময়ে আমি স্থির প্রতিজ্ঞ এমন কোন হরিদাস যে সত্য আর ন্যায়ের পথে পেটে গামছা বেঁধে অটল দাঁড়িয়ে থাকতে পারব আজীবন! আর মাত্র দু একদিন, তারপর হা হা করা আকাল আমাকে গ্রাস করে নেবে। তখন মাথা ঘুরবে, চোখ ঘোলা হয়ে যাবে, হাত পা কাপবে। দু পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো যাবে না। তখন কোথায় যাব আমি? কেমন করে বাঁচব?
রেল স্টেশনে এক সাধু থাকে। যদি গেরুয়া পোষাক আর মুখে দাড়ি মাথায় জটা থাকলে সাধু হওয়া যায় তবে সে মুখে মদের গন্ধ নিয়েও সাধু। সে বলে আমি আমার শিষ্যদের চোর হবার শিক্ষা দেই না যাতে সে চোরের সর্দার হয় সেই শিক্ষা দেই।
একদিন বলেছিল সে-জগতে যত রকম পাপ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে। অনাহারী থাকা। অনাহারে থাকলে আত্মা কষ্ট পায়। আত্মার মধ্যে বাস করেন পরমাত্মা, তিনি কষ্ট পান। যে পরমাত্মাকে কষ্ট দেয় সে মহাপাতকী। তার জিয়ন্তে কুম্ভীপাক নরক বাস হয়।
জীবনে অনেক পাপ করেছি। তখন আমি দুর্বল ছিলাম অক্ষম ছিলাম। আর আমি পাপ করতে পারব না। পরমাত্মাকে কষ্ট দিতে পারব না। কুম্ভীপাকনরক যে কী তা আমি জানি। আর সেই নরকে নিমজ্জিত হব না।
তাই যেদিন মেঘনাদ আহবালির ডাক এল–সময় হয়ে গেছে, এবার কাজে চলো, আমি আর পিছন ফিরে তাকাবার অবকাশ পেলাম না। রওনা দিলাম ওদের সাথে। রওনা দিলাম এতকাল ধরে আগলে রাখা মূল্যবোধ মাড়িয়ে অন্ধকার পথের দিকে।
আমরা চলেছি আজ বর্ধমান। এই ভ্রমণের প্রোগ্রামটা পুরোপুরি আহবালির। ট্রেনের টিকিট সে কেটেছে, চাফা সে খাওয়াচ্ছে। এসব হিসেব করে পরে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নেবে। আমি এদের সাথে নতুন, তাই জানি না। ওরা কী ভাবে কোথায় যেতে হবে–সব জানে। এক আশ্চর্য কৌশলে বন্দুক দুখানা খুলে ফেলেছে আহবালি। ফের জোড়া লাগানো হবে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে। কুঁদো দুটো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা বড় ব্যাগের পেটে। নলি দুটো জড়িয়ে নেওয়া হয়েছে সদ্য কিনে আনা একটা মাদুরে। আর একটা ব্যাগে খান কয়েক টর্চ নতুন ব্যাটারি। একটা ব্যাগে খান চার পাঁচ পাইপগান। লোক সংখ্যা আমাদের সাত। আর যেভাবে যে পোষাকে আমরা চলেছি যে কেউ দেখে মনকুবেবুঝি গ্রাম থেকে কলুষত্যু শহরে খাটতে আসা একদল মিস্ত্রি মজুর। যারা মাস দুমাস পরে এখন বাড়ি ফিরে চলেছে। বর্ধমান থেকে একজন আমাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে বলে এসেছে। কীভাবে পুরো পথটা নিরাপদে পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে সেই দায়িত্ব তার। আমরা ফিরে আসবার সময়ে এই লোকটাই বর্ধমান পর্যন্ত এসে আমাদের ট্রেনে তুলে দিয়ে যাবে।
