গ্রামে পৌঁছে প্রথম আমার কিছুটা ভয় ভয় করছিল। যার সাথে আমি এসেছি তার সাথে আমার কোন বৈধ সম্পর্ক নেই। সমাজের চোখে এটা অপরাধ। এটা তো কোন উচ্চ শিক্ষিত উচ্চবিত্তের “লিভ টুগেদার”-এর সমাজ নয়। পিছিয়ে পড়া গোড়ামিপূর্ণ সমাজ। তবে কিছুক্ষণ পরে সে ভয় আমার কেটে গেল। পাগলা সরদারের মেয়ের ভেসে বেড়ানো পানসি যে মাটির নাগাল পেয়েছে এতে তারা খুশি। পাগলা সরদারের মাথায় ছিট আছে তাই কী বলতে কী বলে বসে, একবার তার দোষে মেয়েটার কপাল পুড়েছে, আর যেন না পোড়ে সেই কারণে সে বিশেষ কথা বলে না। তবে তার স্ত্রী যে যাদবপুরে ঘুঁটে বিক্রি করতে যায় এবং আমাকে চেনে, বলে সে, দুজনা খেটেপিটে খাও আর “ভাইবনির” মত মিলেমিশে থাক এই আমরা চাই।
এখানে সবঘরে সবদিন উনুন জ্বলে না। যে ঘরে উনুন জ্বলে ভাত যদি বা হয় সবদিন তরকারি হয় না। পাগলা সরদারের ঘর তার ব্যতিক্রম নয়।তবে আজ তার উনুন জ্বলেছে। ওদের তরকারিও হয়েছে। বাড়ির সামনের খালধারে সরকারি খাস জায়গা সবারই একটু একটু দখল করা আছে। সেখানেই ওল লাগিয়েছিল পাগলা সরদার। সেই ওল বেঁচে চাল আর দু আনার কুচো চিংড়ি এসেছে।
খাওয়া দাওয়ার পর আমার শোবার জন্য ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে পাশের দাওয়ায়। অনেকদিন পরে আজ নিশ্চিন্তে একটু ঘুমোবার সুযোগ পেয়েছি। এখানে মশাও নেই। শোবার অল্প কিছু সময় পরে তলিয়ে গেছি ঘুমের অতলে। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম তা জানি না। ঘুম ভেঙে গেল একটু মৃদু ধাক্কায়। অন্ধকারে কিছু দেখা গেল না, শোনা গেল একটা নরম গলা–সরে শোও। আমারে এটু জায়গা দাও। তারপর বিনা দ্বিধায় যে আমার পাশে শুয়ে পড়ল সে আর কেউ নয়-সে-ই। আমি সেদিন সেই রাত আঁধারে–চরাচর যখন নিঝুম নিস্তব্ধ, এক আকুলি বিকুলি দেহের দাবিকে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। আত্মসমর্পণ করে বসেছিলাম কী হবে তা না ভেবে।
আমার তখন চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠেছিল মৃত বাবলুর আক্ষেপ মাখা দুটো চোখ। সে দুদিন আগে মারা গেছে, দুদিন পরে আমারও ওই অবস্থা হবে। গোনাগুনতি যে কটা নিঃশ্বাস এখনও পড়া বাকি আছে সেই সামান্য সময়ে সীমিত সামর্থের মধ্যে যদি জীবন আমাকে কিছু দিতে চায়, নিয়ে নিলে আর মরার সময় শূন্যপাত্রের বেদনা বুকে নিয়ে মরতে হবে না। যেভাবে অভাগা বাবলু মরে গেছে।
এসো জীবন, এসো গরলপাত্রের অমৃত, আমি তোমাকে পান করি।
তার নাম মেঘনাদ। তাকে আমি চিনতাম। এখন মনে হচ্ছে ভুল। মানুষ চেনা অত সহজ নয়। ডাবের ঝুড়ি নিয়ে ট্রেন থেকে স্টেশনে নামে, রিকশায় ঝুড়ি চাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে নিয়ে যায় এই চেনার বাইরে তার আর একটা অচেনা আন্তঃদেশ আছে যা আফ্রিকার গহন অরণ্যের মত অনালোকিত। আজ সে আমার কাছে পরম বিশ্বাসে সেই অজানা ইতিহাসের পাতা মেলে ধরেছিল।
গ্রামবাংলায় চিরদিনই অন্নের বড় আকাল। যা আর একবার তীব্র হয়ে উঠেছিল ১৯৫৯ সালে। খাদ্যের দাবিতে সেই সময় মিছিল বের করা মানুষের উপর হামলে পড়েছিল পুলিশ। লাঠিপেটা করেই বহু মানুষকে মেরে ফেলেছিল তারা। সেই দিনে মেঘনাদের বাবা খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এক জোতদারের ধানের গোলা থেকে চুরি করে নিয়েছিল আধবস্তা ধান। সে ধান যখন মেঘনাদের মা কেঁকিতে ফেলে কুটছিল, তেঁকির আওয়াজ পৌঁছে গিয়েছিল জোতদারের কানে। তারা তো চারদিকে চর লাগিয়ে রেখেছিল কে ধান চুরি করেছে ধরবার জন্য। আধবস্তা ধান নিতে তো দিল্লীর লোক আসেনি। মেঘনাদের এক জ্ঞাতি, পিঠোপিছি ঘর, সে গিয়ে সব বলে আসে। ফলে সে ধানের ভাত আর পেটে যায় না, ধরা পড়ে যায় মেঘনাদের বাবা। তাকে নিয়ে আসা হয় জোতদারের খামারে। তারপর কামারশালার হাম্বর দিয়ে কুঁচোকুঁচো করা হয় দু-হাতের হাড়। আর যেন সে কোনদিন চুরি করতে না পারে। গ্রামদেশের অভাবি মানুষ যেন তাকে দেখে চুরির নাম নিতে কেঁপে যায়।
মেঘনাদ তখন খুবই ছোট। ওর বাপ ভাঙা হাত নিয়ে বিছানায় পড়ে থেকে হেগেমুতে একসা হয়। আর ওর মা–যেখানে লোকে তাকে চোরের বউ বলে চেনে না তেমন কোন দুরগাঁয়ে গিয়ে ভিক্ষা চায়। এই দেখতে দেখতে বড় হয় সে। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে যে টাকার গরমে পুরকায়েতরা তার বাপের জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে, মাকে ভিখিরি’বানিয়ে ছেড়েছে একদিন তা কেড়ে নিয়ে ওদেরও ভিখিরি বানিয়ে ছাড়বে।
ডাব কাটতে হলে দাঁ যোগাড় করা দরকার। দাঁয়ে ধার দেওয়া দরকার। বাঘ মারতে হলে বন্দুক যোগাড় করা দরকার, বনের নাড়িনক্ষত্র জানা দরকার। যুদ্ধ করতে হলে ট্রেনিং নেওয়া দরকার। এখন মেঘনাদ সেই মোক্ষম আঘাতটা হানবার জন্য ট্রেনিংস্কুলে ঢুকেছে। শিক্ষকের নাম ধরে নেওয়া যাক–আহবালি।
এই অঞ্চলে বেশ কিছুদিন আগে এম. সি. সি দলের তিনজন কর্মী এসেছিল যার একজনের নাম চন্দ্রশেখর, ডাক নাম দাদু। তারা তখনও কোন এ্যাকশান করেনি শুধু সংগঠন বানাচ্ছিল। এতেইজোতদাররা ভয় পেয়ে যায়। আর একরাতে একটা মিটিংকরার সময়ে জোতদারের লোকেরা তাদের ধরে ডাকাত বলে পিটিয়ে মারে। তারা তিনজন তো মরে যায় কিন্তু যারা সেই মিটিংয়ে ছিল তাদেরও ছাড়া হয় না। যাদের বাড়িতে তারা থাকত-খেত, যাদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল সবাইকে চালান করা হয় থানা থেকে জেলে। এই দলে আহবালিও ছিল। বেচারার সেটাই ছিল প্রথম পলিটিক্যাল ক্লাশ।
