এ প্রায় ছয় সাত বছর আগের ঘটনা। এখন সেই ছোট্ট মেয়ে শরীর মনে পরিণত হয়ে উঠেছে। বুঝতে শিখেছে পুরুষের এই পেষনের মধ্যে লুকানো আছে অনেক আনন্দ। যা না পেলে নারীর দেহমন যৌবন অতৃপ্ত অপূর্ণ উষর হয়ে থাকে। এখন তার দেহমন আত্মা একটা সবল পুরুষের জন্য আকুল হয়। যা হোক আর যেমন তোক খেটে না খাওয়াতে পারে, না পারুক, আমি এখন যেমন খেটে খাচ্ছি তখনও খাব, তবু কেউ একজন আসুক। যে সুখ আমি পেয়ে হারিয়েছি সেই সুখে সিক্ত করুক।
চেষ্টা সে খুব করেছে। কিন্তু তেমন কাউকে জোটাতে পারেনি। কেন কে জানে তার মনে হয়েছে এই কাজের পক্ষে আমি উপযুক্ত লোক। তাই এখন ধরে ফেলেছে আমাকে। আমি তার মনোভাব বুঝতে না পেরে যখন বলি, লাভমেরেজ করতে চাও, কইরা ফালাও। তয় এই কামে আমি কোন সাহায্য করতে পারমুনা। ঘটকালি ক্যামনে করে আমি জানি না। তখন বলে সে–আমি তোমার সাতে লাবমেরেজ করবো।
বলি আমি–তুমি জানো না আমি কী? মাইনষে আমারে গুন্ডা কয়!
তার সপাট জবাব–গুন্ডা বলে কি মানুষ না!
–তা, তোমারে নিয়া রাখমু কই। আমার তো ঘরদুয়ার নাই।
–মোনের মানুষ কাঁচে থাকলি বোনে গে থাকায়ও সুখ। তুমি আমারে যেখেনে নে রাখবে, গাছ তলায়, ফুটপাতে, আমি সিখেনে থাকবো।
এ এক মহা সমস্যায় পড়ে গেছি আমি। আমি তাকে যত আমার অক্ষমতা বোঝাতে চাই, সে বুঝতে চায় না। আমি যত পিছলে যেতে চাই সে চেপে ধরে। মনের সাথে যুদ্ধ করে করে আমিও তখন পর্যদস্ত হয়ে পড়ি।
যাদবপুর স্টেশনের আসা যাওয়া করা গোটা চল্লিশ মেয়ে আমার চেনা। তাদের কাউকে কাউকে আমার ভালোলাগে। ভালোবেসে ঘর বাধতেও ইচ্ছা করে। কিন্তু পদ্মপাতায় জলের মত টলটলায়মান যে জীবন, সাহস হয়নি কাউকে সেই জীবনে যুক্ত করি। যাদের এক দু জনকে পরে আমি হাড়কাটা গলিতে দেখেছি। অন্ততঃ একটা মেয়েকে সেই ঘৃণ্য জীবন থেকে বাঁচাতে পারতাম, যদি আমার তেমন ক্ষমতা থাকত। এখন এ সেই অস্থির জীবনের অংশ হতে চাইছে। মরণ ডেকে আনছে। যে নিজে মরতে চায় তাকে কে বাঁচাতে পারে।–মর। আমি আর কদিন? তখন ভোগ নিজের কর্মফল।
বলি–এখন বাড়ি যাও গিয়া। দুই দশদিন আমারে এ্যু সোমায় দাও। তারপর যা হোউক একটা ব্যবস্থা করমু।
–আমার সাতে লাবমেরেজ করবে?
–কইলাম তো করমু। যাও?
তখন বলে–তালি আমি কবে আসবো?
–দশদিন পর।
এরই মধ্যে ঘটে গেছে বাবলু হত্যাকান্ড। আর তার সাথে আমার দেখা করার সুযোগ ঘটেনি। দেখা হয়ে গেল আজ প্রায় তিনচার মাস বাদে। সেই সোনারপুর থানার সামনে থেকে ছুট মেরে পালিয়ে আসবার পর আট-দশদিন ধরে ঘুরে ঘুরে দিন কাটছিল আমার। খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম এমন একটা জায়গা যেখানে থিতু হয়ে দাঁড়ানো যায়, একটা কোন কাজকর্ম পাওয়া যায়। আমার কাছে দুশো মত টাকা আছে। যা দিয়ে লাইসেন্স করব ভেবেছিলাম। এখন ভাবছি যদি এই টাকায় একটা ব্যবসা করা যায়। পুরনো নারকেলের ব্যবসা করবার আশায় কোলে মার্কেটেও গিয়েছিলাম। আমার সেই জায়গা আর খালি নেই। অন্য লোক দখল করে নিয়েছে। অন্য কোন ফুটপাতে গিয়ে বসব, সেখানে কেউ চেনা জানা নেই। যার পরিচয়ে এখানে “ঠেক” পেয়েছিলাম সে এক সবজিওয়ালিকে ফুসলিয়ে কোথায় নিয়ে গিয়ে কী সব করেছে যে কারণে সবজিওয়ালির স্বামী তাকে খুঁজছে। সে আর এখানে আসে না।
এইরকম বিপন্ন বিব্রত সময়ে এসে বসেছিলাম এক স্টেশনে। তখনই দেখা হয়ে গেল তার সাথে। সে কাজ করে যাদবপুর থেকে ফিরছিল। মনে হয় আমার ভাগ্যই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। না হলে হবে কেন? সে আমাকে দেখতে পেয়েই সামনে এসে দাঁড়াল–কোতায় পেলিয়ে ছেলে এ্যাতোদিন? আমি তোমারে খুঁজে খুঁজে হাল্লাক। এখেনে বসে রয়েছে কার খোঁজে শুনি।
যখন কোন মানুষ ডুবে যেতে থাকে হাতের কাছে যা পায় তা সে খড়কুটো যা-ই হোক আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। মানুষ যখন প্রবল ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে পঁচা বাসি এটো যা পায় গোগ্রাসে গেলে। মানুষের যখন নিদারুণ তৃষ্ণায় ছাতি ফাটে মরীচিকা দেখে জল ভেবে সেদিকে ছোটে।
আমি এখন জানি না ঠিক কোন উপমাটা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কালের জন্য সুপ্রযোজ্য হবে। তবে এটা সত্যি যে এই অনাত্মীয়-নিবন্ধিব, একাকীত্বময় মানসিক বিপর্যয়ের সময়ে ওকে বলে বসেছিলাম–তোমারে খোঁজ করতে আইছি।
চলো চলো আমাগার বাড়ি চলো। গেরামের সবাইরে তোমার কতা বলে দিইচি। তারা তোমারে দেখতি চাচ্ছে।
স্টেশন থেকে ওদের গ্রাম মাইল সাতেক দুরে। মাইল চার বাসে আসা যেত তারপর খাল পাড়ের চা পথ ধরে বাকিটা হাঁটা। আমরা সবটাই হেঁটে গিয়েছিলাম। ওরা সবদিনই হেঁটে যাওয়া আসা করে। বাসে যেতে পঁচিশ পয়সা আসতে পঁচিশ পয়সা, মাসে যদি সাড়ে সাতটাকা এতে চলে যায় তাহলে আর হাতে কী থাকে সারামাস কাজ করে? যা দুপয়সা চোখে দেখা যায় সে তো ওই বাসভাড়া বাঁচিয়ে ট্রেনভাড়া না দিয়ে।
যখন আমরা ওদের গ্রামে পৌঁছালাম চারদিকে নেমেছে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। সেই অন্ধকারে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপের মত দেখাচ্ছে সেই গ্রামটাকে। এখানে গোটা তিরিশ পরিবারের বাস। এরা জাতিগত পরিচয়ে কাওড়া। মাছ ধরা, পালকি বওয়া, আর ঢোল বাজানো এদের পুরাতন পেশা। তবে এখন খাল বিল সব হেঁজে মজে গেছে, মাছ আর মেলে না। পালকির স্থান দখল করে নিয়েছে মোটরকার আর ঢোলের জায়গা নিয়ে নিয়েছে মাইক। তাই পুরুষেরা খাটে জন মজুর আর মেয়েরা কেউ মাজে বাসন কেউ শাকপাতা যা পায় বাজারে গিয়ে বেঁচে আসে। কারও কোন জমি নেই। শুধু বসতবাড়ি।
