এখন আমি কী করি। তখন আমার একটাই করার মত ছিল–দৌড়। তাই করি আমি। পিছন দিকে দৌড় মারি। ওরা ধর ধর চোর চোর বলে পিছনে ধাওয়া করে। তবে আমার নাগাল পায় না। আমি দৌড়ে দৌড়ে নানা পথ ঘুরে শেষে রেল স্টেশনে গিয়ে উঠি। সারারাত সেখানে বসে থেকে ভোরবেলা এসে নামি শিয়ালদহে। ফের সাউথ সেকশানে এসে ট্রেন ধরে গিয়ে নামি গড়িয়া স্টেশনে। তারপর হেঁটে হেঁটে গিয়ে পৌঁছাই গড়িয়ার পেট্রল পাম্পে। যেখানে আমাদের গাড়ি থাকে।
তখন খবর পেয়ে গাড়ির মালিক এসে গেছেন। থানায় যাবার তোড়জোর করছেন। সেটা তো তাকে করতেই হবে। এমন সময় সশরীরে আমাকে উপস্থিত হতে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন। সবার মুখে যা শুনেছেন তাতে তার ধারণা হয়েছিল যে আমি এতক্ষণে হাড়গোড় ভেঙে ‘দ’ হয়ে কোথাও পড়ে আছি। একটু ধাতস্থ হবার পরে বলেন তিনি আমার সাথে থানায় চল। একটা ডায়েরি করে রেখে আসি। এটা খুব দরকার।
থানা মানে সোনারপুর থানা। এখন সময়টা বদলে গেছে। যে শ্যামাকলোনির দাদা আমাকে মেরেছিল, নকশাল আমলের সেই প্রবল মত্ততার দিনে যাকে আমি বাগে পেয়ে পেটে চাকু ঠেকিয়ে পুরাতন অপরাধের জন্য ক্ষমা যাচনা এবং প্রাণভিক্ষা চাইতে বাধ্য করেছিলেম, শুনেছি, সে এখন চাকরি পেয়ে সোনারপুর থানার এ.এস.আই। এখন তার হাতে প্রচুর ক্ষমতা। যদি সে এখন থানায় থাকে যে সম্ভাবনা বড় প্রবল, আমাকে নাগালে পেয়ে আর যদি না ছাড়ে? এই কেসে না হোক অন্য কোন কেসে নিশ্চয় জুড়ে দিয়ে জেলে পাঠাবে। এ সব পুলিশেরা করে থাকে। তার আগে গায়ের ঝাল মেটাতে খানিকক্ষণ প্রাণভরে পিটিয়ে নেবে।
এইসব কথা ভাবছিলাম মালিকের সাথে থানার দিকে যেতে যেতে। ফলে থানা থেকে কিছুটা দূরে পা থমকে গেল আমার। বলি–আমি থানায় যাব না। কেন রে? মালিকের অবোধ জিজ্ঞাসার জবাবে আমি বলি–অসুবিধা আছে! কী অসুবিধা? বলা যাবে না। তারপরই এক ছুটে মিশে গেলাম পথচলা জনতার ভিড়ে। মালিক অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল পলায়নপর আমার দিকে। শেষ হয়ে গেল আমার ট্রাক চালক হবার সব সম্ভাবনা।
এবার আমার ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
এটা সেই সময়ের কথা। তখনও বাবলু মারা যায়নি। এক সন্ধ্যায় প্রচুর মদ খেয়েছিলাম। আসছিলাম স্টেশনের দিক থেকে। তখনই দেখা হয়ে গিয়েছিল সেই মহিলার সাথে। ও নব নগরে দুই তিন বাড়িতে ঠিকা ঝিয়ের কাজ করে। টিবি হাসপাতালের সেকেন্ড গেট থেকে ঢুকে ওপাশের ভাঙা পাঁচিল গলে স্টেশনে পৌঁছাবার ইচ্ছা ছিল তার। তখনই আমার সাথে দেখা হাসপাতালের ক্যান্টিনের সামনে। যারা রোজ গ্রাম থেকে শহরে আসে রোজ ফিরে যায় সেই ট্রেন যাত্রী কমবেশি সবাই আমাকে চেনে। তাদের কোন সমস্যা হলে আমাকে বলে। সাধ্যমত তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করি। তবে পুরুষের তুলনায় মেয়েদের সমস্যা বেশি বলে তাদের সাথে আমার নৈকট্যও বেশি। এই মহিলার মাসি একদিন এসেছিল আমার কাছে তার স্বামীকে একটু সাইজ করার জন্য। যে তাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য একটা মাগি নিয়ে এই যাদবপুরে ঘরভাড়ায় রয়েছে। সেদিন মাসির সাথে এ-ও ছিল। তখন থেকে চেনা। মাঝে মাঝে একটা দুটো কথাবার্তা।
এখন দেখা হতেই বলে সে তোমার সাতে আমার এটা গোপন কথা ছেলো। বলি, বলো কী কথা?–এখেনে নয়, এটু ফাঁকার দিকে চলো। সেখেনে গে বলবো।
তখন সন্ধ্যা হচ্ছে। এই সময়ে আর তেমন ফাঁকা কোথায়? সে আছে এক সেই বড় নালার পাড়ে। সেখানেই নিয়ে বসাই তাকে। বলল কি বলবা? তখন একটু লাজুক হেসে চোখে কটাক্ষ হেনে বলে সে–আমি ঠিক করিচি এট্যা লাবমেরেজ করবো। একটা কেন সে দশটা করতে পারে। তবে তার কপালে সিঁদুর হাতে শাখার বদলে সস্তার সাদা চুড়ি। যা বিবাহিত হিন্দু রমণীর চিহ্ন। তাই বলি–তোমার তো বিয়া হইয়া গ্যাছে। আবার বিয়া?
মুখ বাঁকিয়ে বলে সে–যা হয়েছে তারে বে বলে নাকি! এ্যাক মাসও সোমসার করিনি। খানকির ছাবাল পেলিয়েছে।
এটা সে মিথ্যা বলেনি। সত্যিসত্যি তার বিবাহিত জীবনের সময়কাল একমাসের বেশি নয়। এর বাপ পাগলা সরদার প্রতিবছর চাষের সময় দুমাস যে বাড়িতে চাষের কাজ করে সেই বাড়িতে বারোমেসে ছিল গোলাবাড়ির গোলক সরদার। পাগলা সরদারের চেয়ে গোলক সরদার বয়েসে কিছু ছোট হলেও দুজনের ছিল গভীর বন্ধুত্ব। রোজ কাজের পরে একসাথে বসে তাড়ি খায় আর সুখ দুঃখের কথা বলে। তখন একদিন গোলকের মনে হয় তাদের এই বন্ধুত্বকে একটা চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া দরকার। তাই বলে সে-পাগলা দা, আজ থেকে তোরে আর দাদা বলবুনি। বাপ বলবো। যদি তুই মত দিস, এ্যাক পয়সা পন নিবুনি, তোর মেয়েরে আমি বে করবো। পাছে নেশা কেটে গেলে বেঁকে বসে তাই তখনই তাড়ি অলাকে সাক্ষী রেখে পাকা কথা হয়ে যায়। আর সেই রাতেই পাড়ার পাঁচজনকে ডেকে মা মনসার থানে গিয়ে এর মাথায় সিঁদুর তুলে দেয় গোলক। আইবুড়ো নাম ঘুচে যায় ওর। নরক ভোগের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যায় এক কন্যাদায়গ্রস্থ বাপ।
যখন এর বিয়ে হয়, বয়েস চৌদ্দ পনেরোর বেশি নয়। একটু লম্বা বেশ রোগা এই মেয়ের কাছে পুরুষ এক ভীতিজনক জীব। সে যা করে তা অত্যাচার। ফলে সে মাঝরাতে কান্না চিৎকার জুড়ে দিত। ঘর থেকে ছুটে পালাত। আর তখন ঘরের সামনে লোক জড়ো হয়ে যেত। তারা মাঝবয়সী, কামুক ধৈয্যহীন গোলককে যা-তা বলত। একরাতে তো এমন হল পাগলা সরদার বাঁশ নিয়ে জামাইকে পেটাতে ছুটে গেল। পরদিন সকালে কাউকে কিছু না বলে গোলাবাড়িতে পালিয়ে চলে গেল গোলক।
