কী বিভৎস জীবন আমার। আমি চাই না। তবু রক্ত ধ্বংস চোখের জল মৃত্যু এসব যেন আমার পিছনে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যা থেকে মুক্তি নেই। বিপদাপন্ন মানুষের সম্মিলিত কান্না গোঙানি, সাহায্য প্রার্থনার সেই অশুভ সকাল, অনেককটা মৃত্যু বেশ কিছু মানুষের পঙ্গুত্বের দায়ভার আমার কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে গেল বিনা কারণে।
.
গাড়ির লাইনে দুর্ঘটনা, মৃত্যু এসব তো দৈনন্দিন ঘটনা, এছাড়া আছে চোর ডাকাত। হাইরোডে চলাচল করলে এসব ঝুঁকি নিয়েই চলতে হবে। দিন কয়েক আগে লালি নামের এক ডাকাত চার চারজন লোককে খুন করে এক গাড়ি চা পাতা ডাকাতি করে ধরা পড়ে গেছে। একগাড়ি চা পাতার দাম দেড় লক্ষ টাকা। সেই ৭৩-৭৪ সালে এটাকা অনেক টাকা। সে তুলনায় এক ড্রাইভার আর এক খালাসির জীবনের দাম আর কতটুকু। ওরা দুজনকেই মারবে ভেবেছিল সেই ভেবেই গাড়িটা ধরেছিল। জানত না, আর একটা দুর্ঘটনায় পড়া গাড়ির চালক ও মালিক মাঝপথে এই গাড়িতে উঠে পড়েছে। বাধ্য হয়েই চারজনকে।
আসাম যাবার পথে এক জায়গায় তিরিশ কিলোমিটার লম্বা ঘন জঙ্গল পড়ে। যতদূর মনে আছে খুব সম্ভব হাতিমারা বা হাসিমারা নামে। রাত আট-নটার পরে সেই জঙ্গলের পথে কারও একা যাবার সাহস হয় না। এখানে কত যে গাড়ি উল্টে দিয়ে ডাকাতরা সব মাল নিয়ে চলে গেছে তার কোন হিসেব নেই। আমাদের গাড়িতেও আসাম থেকে চা পাতা আসে। যে কোন সময়ে কোন লালি পথরোধ করে দাঁড়াতে পারে। এত ভয় এত বিপদ মাথায় নিয়ে মাত্র পচাত্তর টাকা মাইনে আর ছয়টাকা খোরাকিতে কাজ করছিলাম। যে কাজে চব্বিশ ঘণ্টা নিযুক্ত থাকতে হয়, সারারাতে তিনচার ঘণ্টার বেশি বিশ্রাম মেলে না। আশা করেছিলাম কোনমতে ড্রাইভারিটা শিখে যদি একটা লাইসেন্স বানিয়ে নিতে পারি তাহলে হয়ত আগামী দিনগুলো একটু ভালোভাবে কাটবে। এ গাড়িতে সে সুযোগ মেলে না। কিন্তু এ জন্যে ড্রাইভারকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে না। কলকাতা থেকে আটটন মাল ভর্তি করে ট্রাক আসামে যায়, ফেরেও আটটন নিয়ে। ভর্তি গাড়িতে এক নতুন শিক্ষার্থীর ট্রেনিং কী করে দেবে? সেটায় বেশ ঝুঁকি। তাই সে বলে একদিন–ড্রাইভারি শিখতে চাইলে তোকে লাইনের গাড়ি ছেড়ে লোকাল গাড়িতে উঠতে হবে। এতে সুযোগ পাবি। যাবে মাল নিয়ে আসবে খালি, তখন।
এবার সে গাড়ি ছেড়ে যে গাড়িতে উঠলাম সেটা বেডফোর্ড কম্পানির পুরানো জে. সিক্স মডেলের একটা লরঝরে গাড়ি। এই গাড়িতে বেশির ভাগ দিন সিঙ্গুর তারকেশ্বর থেকে বালি আসে। বালি নিয়ে বাবুঘাটে দাঁড়িয়ে থাকলে যার দরকার দরদাম করে কিনে নিয়ে যায়। এ গাড়ির অবস্থা খুবই খারাপ। রোজ বালি নিয়ে ফেরার সময় পথে একবার চাকা লিক হবে, না হয় স্টার্ট নেবে না। ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে কেনা এই গাড়ি নতুন অবস্থায় যতট্রিপ মেরেছে, সব দুহাতে খরচ করেছে গাড়ির মালিক। এখন আর গাড়ি মেরামত করবার পয়সা নেই। তাই এই দশা।
একবার এই গাড়ি ভাড়ায় নিয়ে কিছু সবজি ব্যাপারী–এখন আর নামটা মনে নেই, সেই হাটে গেছে সবজি কিনতে। ওখানে পাইকারি বাজারে সবজি খুবই সস্তা। যাবার সময়ে গেছি বেশ ভালো কিন্তু ফেরবার সময়ে এসে গেল এক মহাসমস্যা।
রাত তখন মনে হয় প্রায় দশটা-এগারোটা। উত্তর চব্বিশ পরগণার সেই হাট থেকে রওনা দিয়ে আমরা পৌঁছেছি দমদমে। তখন সবাই স্থির করল পরে কোন হোটেল পাওয়া যাবে কী যাবে না, এখানেই খেয়েদেয়ে নেওয়া যাক। হোটেল একটা সামনেই ছিল। আমরা যখন খেয়েদেয়ে গাড়িতে উঠেছি, গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ছয় আট জনের একটা দল। তাদের দাবি একশো টাকা দিতে হবে। কীসের চাঁদা ভাই? ”রাম” বাবুর পূজা! আমাদের গাড়ির চালকের নাম বৈশাখু। সে সাদাসিধা লোক বলে কুড়ি টাকা দিতে পারি। এর বেশি আমার কাছে নেই। কিন্তু তারা মানবে না। এতলোক আমরা কুড়ি টাকায় কী হবে। এক সময়ে তাদের সাথে আমার তর্কাতর্কি বেধে গেল আর তখন তারা আমার গেঞ্জি ধরে টেনে আমাকে কেবিন থেকে নিচে নামাতে চাইল।
আমি বসে আছি ড্রাইভারের বাঁদিকে। আমার পায়ের কাছে সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় প্রস্তুত রাখা রয়েছে জ্যাক তোলা রডখানা। আমি সেটা নিয়ে নিচে নামি। আর সামনের জনের ঘাড়ে বসিয়ে দেই সজোরে। একজন পড়ে যেতেই বাকিরা ছুটে পালায়। আমি তখন চিৎকার করে ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট করতে বলি। কিন্তু হায় আমার কপাল, সেলফ স্টার্টর তখন ফেল মেরে গেছে। আর স্টার্ট নিচ্ছে না। যতবার ড্রাইভার চাবি ঘোরায় খরর খর খরর খর করে থেমে যায়।
পালিয়ে গিয়েছিল যারা, দূরে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখে তাদের মনে সাহস ফিরে এল। আর তারা তখন হাতের কাছে লাঠিসোটা যে যা পায় নিয়ে ফিরে আসে। নিচে তো আমি একা, গাড়ির আরোহীরা সব হুডের উপরে বসে কাঁপছে। কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না। ওরা প্রবল উৎসাহে একযোগে আমার উপর হামলা করে দেয়। আমি একা ওদের সাথে পেরে উঠি না। লাঠির একটা আঘাত লেগে আমার ডান হাতের মাঝের আঙুলটা ফেটে যায়। হাতের রডটা ছিটকে যায়। আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে না পেরে আমি পেছোতে পেছোতে গাড়ি থেকে বেশ খানিকটা পিছন দিকে সরে যাই। আর তখনই গাড়ি স্টার্ট হয়ে গেল। এবং সেই রাতের অন্ধকারে শুনশান সড়কে একদল মারমুখি লোকের সামনে আমাকে একা ফেলে তারা উধাও হয়ে গেল।
