একদিন বিকেলে সবে নারকেল এনে ফুটপাতে সাজিয়ে বসেছি এমন সময় পেটটা চিনচিন করে উঠল। গতরাতে যে আলুর তরকারি রুটি খেয়েছি এ তারই অ্যাকশান। তখন পাশের এক সবজিঅলাকে বলি–ভাই আমার মালটা একটু দেখো। আমি পায়খানা করে আসি। পায়খানা কোলে মার্কেটের মধ্যে। সে এমন নোংরা যে গা ঘিন ঘিন করে। যাতে সর্বদা পড়ে থাকে লম্বা লাইন। লাইন দিয়ে তিনচার জনার পরে যখন ক্লেশমুক্ত হয়ে ফিরে এলাম, দেখলাম, ফুটপাতে বহু মালপত্র ছড়ানো ছিটানো, আর আমার নারকেল কটা নেই। সে সব “হল্লাগাড়ি” এসে তুলে নিয়ে চলে গেছে। আমার পাশের দোকানদার তার নিজের ঝুড়ি মাথায় তুলে ছুটে পালিয়েছিল। তবু সবটা রক্ষা করতে পারেনি। আমারটা সামলাবে কী করে? এখন মুচিপাড়া থানায় গিয়ে গোটা পনের টাকা ঘুষ দিয়ে ওগুলো ছাড়িয়ে আনা যায়, না হলে সব বাজেয়াপ্ত। কিন্তু আমার কাছে তখন যে পনের পয়সাও নেই। তাই শেষ হয়ে গেল ব্যবসা। বেকার হয়ে গেলাম আবার।
.
এবার আবার আমার এখানে ওখানে শুরু হল পুকুরের পানার মতো ভেসে বেড়ানো। ভাসতে ভাসতে একদিন পৌঁছে গেলাম গড়িয়ার বোড়াল রোডে। এখানে একটা পাম্পে বহু ট্রাক থাকে। যারা ইট বালি মাটির ট্রিপ মারে। কিছু ট্রাক ট্রান্সপোর্টে খাটে। ট্রাকে কাজ করা এক চেনাজানা বন্ধু যে আগে রিকশা চালাত তার মাধ্যমে আমিও একটা ট্রাকে খালাসির কাজ পেয়ে গেলাম। এই গাড়ির মালিকের নাম কাল্টু মুখার্জী। গাড়ির নাম্বার ডব্লু.এম.কে ৪৮১০। এই গাড়ি ট্রান্সপোর্টের মাল বয়। আসামে যায় মাল নিয়ে ফেরে মাল নিয়ে।
একদিন চলেছি আসাম। পোস্তা থেকে রওনা দিয়ে বেলা দুটো নাগাদ পৌঁছেছি আমডাঙার পেট্রলপাম্পে।হঠাৎ মনে পড়ে গেল ড্রাইভারেরমস্ত ভুল হয়ে গেছে। আসামের যে রোড পারমিট সেটি বাড়িতে রেখেই চলে এসেছে। এই কাগজ কাছে না থাকলে আসামে ঢোকাই যাবে না। তখন সে আমাকে বলে–গাড়ি পাম্পে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি। তুই গিয়ে কাগজটা নিয়ে আয়।
তখন বিকেল। আমডাঙা থেকে চেপে বসলাম একবাসে। কোথা থেকে কীভাবে কলকাতায় পৌঁছানো যাবে। সে সব বলে দিয়েছে ড্রাইভার। তার নির্দেশমত একটা মোড়ে এসে বাস থেকে নেমে পড়লাম। এখান থেকে অন্য বাস ধরতে হবে। এখানে একটা ধাবা আছে যার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দশবারোটা পাট বোঝাই ট্রাক। যখন এখানে পৌঁছেছি সন্ধ্যা উত্তরে গিয়েছিল। বাতাসে একটু শীত শীত ভাব। কিন্তু অপেক্ষায় থেকে থেকে রাত বেড়ে গেল। কলকাতা যাবার মতো কোন বাস এল না। ফলে রুটি তরকা খেয়ে বাবার এক খাঁটিয়ায় পড়ে রইলাম সারা রাত।
যখন ভোর তিনটে তখন দেখি একটা পাটবোঝাই ট্রাক রওনা দিচ্ছে কলকাতার দিকে। তখন ড্রাইভারকে বলি–আমি গাড়ির খালাসি। কলকাতায় যাব। আমাকে একটু নিয়ে যাবে? গাড়ির লাইনে পারস্পরিক সহযোগিতার ভাবনা বড় প্রবল! সব শুনে সে রাজি হয়ে গেল। আমি গিয়ে বসলাম ড্রাইভার কেবিনের বাঁদিকের দরজার কাছে। সারারাত ঘুমাইনি। একটু ঘুম ঘুম পেয়ে গেল যখন চোখ খুললাম তখন দেখি ট্রাক কলকাতা পৌঁছে গেছে। এখন পার হচ্ছে গিরিশ পার্ক। আমি জানি, এখান থেকে এইট বি বাস ধরা যাবে। এটা ধরে যাদবপুর যাওয়া যাবে। সেখান থেকে অন্য কোন বাস ধরে গড়িয়া পৌঁছাতে পারব। তাই চিৎকার করে উঠলাম–থামো থামো। আমি নামব।
তখনও ভোরের আলো ঠিকমত ফোটেনি। চারদিকে জমে আছে একটা ছাইছাই পাতলা অন্ধকার। যার উপর আবার কুয়াশার হালকা আস্তরণ। সকাল বেলার হিম বাতাসে ড্রাইভারের চোখেও হয়ত একটু ঘুমের ঘোর লেগে গিয়ে থাকবে। সেই ঘোরে সে ব্রেকের উপর পা তুলে দিল। গাড়ি পুরো থামাবার দরকার ছিল না। একটু গতি কমে যেতেই আমি লাফিয়ে নিচে নেমে গেলাম। সাথে সাথেই ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে দিল।
গিরিশ পার্ক পার হয়ে ট্রাক যেখানে থেমেছিল সেটা একটা চৌরাস্তার সংযোগস্থল। আমরা যাচ্ছিলাম পশ্চিম থেকে পূর্বে। আর আমাদের দক্ষিণদিকের রাস্তা ধরে উত্তরে যাচ্ছিল একটা ট্রাম। ট্রামের চালক ট্রাকের গতি কমে যেতে দেখে মনে করেছে এটা বোধহয় থেমে যাবে। তাই সে ট্রামের গতি হ্রাস বা থেমে যাবার প্রয়োজন আছে মনে না করে দ্রুত পার হয়ে যাবার চেষ্টা করল রাস্তাটা। পার হয়ে প্রায় চলেও গিয়েছিল কিন্তু শেষরক্ষা হল না। তার আগেই ট্রাকটা গিয়ে ঠুকে দিল ট্রামের পিছনে। খুবই ছোট ধাক্কা দিয়ে ট্রাকের চালক একটু ডানদিকে কাটিয়ে সামনে ছুটে চলে গেল।
ভোরবেলার ফাঁকা ট্রাম। এ ধাক্কায় তার বিশেষ কোন ক্ষতি হয়নি। শুধু লাইনচ্যুত হয়ে গড়িয়ে গেল সামনে-ডানদিকে কিছুটা। এ সময় উত্তরদিকের রাস্তা ধরে দ্রুত ছুটে আসছিল একটা বারো সি বাস। যার পেটে ঠাসা ছিল বহু যাত্রী। এরা সবাই বস্ত্র ব্যবসায়ী। সব যাচ্ছিল মঙ্গলার হাটে যে যার সম্ভার নিয়ে বিকিকিনি করবে বলে। কে জানে, যে ভুল ট্রামের চালক করেছিল, সম্ভবতঃ একই ভুল বাস চালকও করে থাকবে। ভেবে থাকবে ট্রাক থেমে গেছে। কুয়াশা আর আবছা আলোয় দৃষ্টি বিভ্রম ঘটে গিয়ে থাকবে তার। ভেবে থাকবে এই ফাঁকে পার হয়ে যেতে পারবে পথটা। তাই গতিবেগ না কমিয়ে দ্রুত ছুটে এসেছিল। কিন্তু তখন তার পথ আটকে দিয়েছে লাইনচ্যুত ট্রাম। সে গড়িয়ে গিয়ে গুতো মেরে দিল বাসের পেটে। দুবার পাক খেয়ে বাসটা উল্টে গিয়ে পড়ল বাদিকের ফুটপাতে, একটা লাইট পোস্টের উপরে। সেটা বেঁকে নুয়ে পড়ল। মুহূর্তে উগ্র ডিজেলের গন্ধের সাথে মানুষের রক্তের ঢল নামল রাস্তার উপর। বাসের ছাঁদে রাখা কাপড়ের গাঠরি, কন্ডাক্টরের ব্যাগের রেজগি টাকায় ছড়াছড়ি। আহত মানুষের আর্ত চিৎকার। পথচারী মানুষের ছোটাছুটি। চোখের পলকে সকাল বেলায় শান্ত পরিবেশ ছিন্নভিন্ন বিদ্ধস্ত।
