বাবলু সারাদিন কোথায় লুকিয়ে থাকত তা জানি না। তবে বিকেল হলে সে চলে আসত টিবি হাসপাতালের ময়লা পোড়ানো চুল্লির কাছে। অনেক রাত পর্যন্ত সেখানে আমাদের আড্ডা চলত। আড্ডায় প্রায়ই বাবলু আক্ষেপ করে বলত–শালা পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়েস হয়ে গেল। এখনও একটা মেয়ের শরীর কেমন তা জানা হল না। পুলিশের হিট লিস্টে আছি। আজ যদি বুকে একটা গুলি লাগে আর কোনদিন জানা হবে না।
যদিও তখন আমরা বাবলুকে নানারকম ঠাট্টা তামাশা করতাম। বলতাম মরার পরে ভগবানকে বলিস তোকে যেন পরের জন্মে মোরগ বানায়। তাহলে এ জীবনে যা পাওয়া বাকি রইল মোরগ জনমে একশোগুণ বেশি পেয়ে যাবি। কিন্তু সত্যি এটাই যে ওই আক্ষেপ আমাদের মনেও ছিল। টের পেতাম আমার বুকেও তৃষ্ণা, প্রবল তৃষ্ণা আছে। কেউ আমাকে ভালোবাসুক, আমি কাউকে ভালোবাসি। সে আমাকে তার সবকিছু দিক। আমার সব কিছু চেয়ে কেড়ে নিক। তখন চারদিকে পাইকারি হারে মানুষ খুন হচ্ছিল। মনের মধ্যে তখন এমন একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গিয়েছিল আমিও খুব বেশিদিন বাঁচব না। খুব বেশি হলে এই দশক। জীবনটা, যৌবনটা নারী শরীরের স্বাদ থেকে বঞ্চিত রয়ে যাবে। এই ধারণা–ওই তৃষ্ণা, তীব্রতর হয়ে উঠেছিল বাবলু বুকে গুলি লেগে মরে যাবার পর। মনের সেই দুর্বলতার ফোঁকর গলে সেই সময় আমার জীবনে অনুপ্রবেশ করে গেল একটা মেয়ে। না মেয়ে নয়–এক মহিলা। গোলাবাড়ি থানার গোলক সরদারের পরিত্যক্ত স্ত্রী, বারুইপুর থানার পাগলা সরদারের মেয়ে। যে বয়সে আমার চেয়ে দু-তিন বছরের বড় মনের দিক থেকে অনেক পরিণত এবং সাহসী।
সেদিন জমাদার বস্তিতে কী যেন এক পরব ছিল। শুয়োর মারা হয়েছিল। নানুর ঠেকে খুব মদ বিক্রি হচ্ছিল, চলছিল তাসের জুয়া। একজন আশি টাকা জিতেছিল। যা থেকে মুড়ি চানাচুর খাবার জন্য আমাদের দু-চার টাকা দিয়েছিল। একটা খবরের কাগজের উপর মুড়িমাখিয়ে আমরা খাচ্ছিলাম। আমরা বসেছিলাম চুল্লির সামনে সেই ডোবা আর পুকুরের মাঝের সরু পথটার উপরে। তখন সন্ধ্যে ঘনাচ্ছিল। চারদিকে ছেয়ে গিয়েছিল একটা আবছা অন্ধকার। চেনা মুখগুলোকে অচেনা বলে মনে হচ্ছিল। আর অচেনা মানুষগুলোকে চেনা। সেই সময় যাদবপুর থানার ওসি ছিলেন জনৈক পালবাবু। শোনা যায় উনি নাকি একশো গজ দূর থেকে গুলি করে মাটিতে রাখা আধুলি উড়িয়ে দিতে পারেন। লোকাল ইনফর্মারের মাধ্যমে খবর পাওয়া মাত্র একটা জিপে চার জন সাদা পোষাকের সঙ্গী নিয়ে পৌঁছে গেলেন টিবি হাসপাতালের গেটে। সেখানে জিপ থেকে নেমে আবছা অন্ধকারে গা ঢেকে হেঁটে হেঁটে গিয়ে থামলেন চুল্লির এপাশে। আমাদের একেবারে একশো গজের মধ্যে।
আমি বসেছিলাম রাজা সুবোধ মল্লিক রোডের দিকে পিঠ রেখে কামারপাড়ার দিকে তাকিয়ে। ওদিকে আমার ভয়। কার্তিকের ভাই, মণি, শিবশংকর এলে ওদিক থেকে আসতে পারে। বাবলুর পিঠ ছিল কামারপাড়ার দিকে। চোখ খাল যেখানে গিয়ে রাজা সুবোধ মল্লিক রোডে মিশেছে। ওর ভয় ছিল বিজয়গড়ের ছেলেরা ওদিক থেকে আসতে পারে। নানুর পিঠ রামকৃষ্ণ উপনিবেশের কালী মন্দিরের দিকে। চোখ চুল্লির ওপাশে যেখানে লাশঘর সেদিকে। নানুর চোলাইঠেকে খদ্দের যাচ্ছে, আসছে। মাল বিক্রি করছে বাচ্চা দিলীপ। কেউ কোন ঝামেলা পাকাচ্ছে কিনা সেটা নজর রাখছে সে। যেদিকে কারও দৃষ্টি ছিল না, বিপদ এসেছে সেইদিক থেকে।
বাবলুর পরিধানে লুঙ্গি আর গায়ে গলাবন্ধ সাদা গেঞ্জি। যে গেঞ্জি অন্ধকারে চর্চ করে। ফলে পাল বাবুর নিশানা করতে কোন অসুবিধা হয়নি। বাবলুর চওড়া বুকে একশো গজ দূর থেকে নির্ভুলভাবে গেঁথে দিতে পেরেছেন থ্রি এইট ক্যালিভার রিভালবারের এক গুলি। গুলি খেয়ে ওহঃ আওয়াজ করে বাবলু উল্টে গেল পোনাপুকুরের নীল জলে। পালবাবু একটু এগিয়ে আর একটা গুলি চালালেন। নীল জল লাল করে বাবলু তলিয়ে গেল জলের তলায়।
আমি মুহূর্তের বিহ্বলতা কাটিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম আমার পিছনের সেই পুঁজ রক্ত পায়খানা প্রস্রাব পোকামাকড় পানা হোগলা বোঝাই ডোবায়। পচাপাকে শরীর ডুবে গেল আমার। তবে পালবাবুর খতম তালিকায় আমার নাম ছিল না। তাই আমার দিকে কোন গুলি ছোড়েনি। ধরবারও চেষ্টা করেনি। গুলির আওয়াজ শুনে মেনগেটে থেমে থাকা জিপ দ্রুত চলে এল চুল্লির কাছে। যাকে মারার টার্গেট ছিল মারা হয়ে গেছে, পালবাবুরা জিপে চেপে ফিরে চলে গেলেন। চারঘন্টা মরার মত পড়েছিলাম সেই পুতিগন্ধময় নরকে। লাশ কাটা ঘরের বেওয়ারিস লাশের মত পোকা কুরে কুরে খেয়েছিল আমাকে। জোঁক লেগেছিল গায়ে পনের কুড়িটা। জীবিত অবস্থায় যেন সেদিন। লাশ হয়ে গিয়েছিলাম।
পরের দিন সকালে নানু পালিয়ে চলে গিয়েছিল তার বোনর বাড়ি মেদিনীপুরে। প্রায় ছয়মাস সে আর যাদবপুরের দিকে আসেনি। পালাতে তো আমাকেও হবে। যার সব চেয়ে বড় ভরসায় হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেইনানু নেই। আমি কী করে থাকি। একজন লোকের সহায়তায় এবার আমি “ঠেক” নিলাম শিয়ালদহে।
আমার পদবি ব্যাপারী। কিন্তু আমি তো আমি, আমার বাপ পর্যন্ত কোনদিন ব্যবসা করেনি এবার আমি ব্যবসায় নামলাম। পুঁজি মাত্র কুড়ি টাকা। এই কুড়ি টাকা দিয়ে কোলে মার্কেট থেকে কুড়িটা নারকেল কিনে এনে গির্জার সামনে ফুটপাতে বিক্রি করি। যা দু-এক টাকা লাভ হয় তা দিয়ে কোনদিন মুড়ি আলুর দম কোনদিন ঘুগনি রুটি খেয়ে ওই ফুটপাতে গামছা বিছিয়ে শুয়ে থাকি। এই সময়ই এখানে আমার সাথে দেখা হয় শিবু রায়চৌধুরি, মোহিত বর্মন, যতীনের। আর দেখা হয় সেইসব কিছু মেয়ের যারা আগে যাদবপুরে বাবুদের বাসায় কাজ করত। এখন কুখ্যাত “হাড়কাটা” গলিতে মুখে পাউডার হাতে কাঁচের চুড়ি পরে সন্ধ্যা বেলায় লাইটপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। লেখক সুবোধ দাস এই সব যৌনকর্মীদের যন্ত্রণা লাঞ্ছনা নিয়ে প্রচুর লিখেছেন। কিন্তু উনি যাদের দেখেছেন তারা সেইসব মেয়ে যারা একরাতের পারিশ্রমিক দিয়ে ফ্রিজ-কালার টিভি কিনতে পারে। উনি দেখেননি সেই অভাগা মেয়েগুলোকে যারা বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গলিতে দাঁড়িয়ে থেকে আমার কাছে এসে কাঁদত–দাদারে, আজ বউনি হয়নি, একটা পাউরুটি কিনে দিবি? কে লিখবে তাদের কথা?
