পাশার দান এখন উল্টো পড়ছে। অতি দ্রুত ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মণি হত বিহ্বল। শেষে কী করতে হবে বুঝতে না পেরে একটা ইট তুলে আমার দিকে ছুঁড়ে মারে। সেটা আমার নয়, লাগে কার্তিকের মাথার পিছনে। আমার যা করার ছিল মণি করে দ্যায়। কার্তিক গড়িয়ে পড়ে মেঝেয়। এবার আমি খোলা চাকু নিয়ে মনির দিকে ধাওয়া করে যাই। পাঁচিল টপকে সে পালায়। শিবশংকর ছোটে গলি ধরে। ওর পিছন পিছন দৌড়ে কামারপাড়ার সেই কালভার্ট পর্যন্ত আসি। আর আমার ধাওয়া করার দরকার নেই। জমাদার কোয়ার্টার বাঁদিকে রেখে টিবি হাসপাতালের খাল পার ধরে সুবোধ মল্লিক রোডের দিকে ছুটি।
ভারতীয় সংবিধানে যে কোন মানুষের আত্মরক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আমি যা করেছি সেটা নিজের প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে। কিন্তু সে সাফাই দেবার জন্য আমার বিচারব্যবস্থার সামনে যাবার পথ খোলা নেই। পুলিশের খাতায় আমি কোন সুনাগরিক নই। আমার পরিচয়–আমি এক সমাজবিরোধী। তাই থানায় যাওয়া হল না।
লোকে বলে কার্তিকের নাকি কচ্ছপের প্রাণ। কেটে টুকরো করলেও মরে না। না হলে ওই ভাবে কোপ খেয়ে কেউ বাঁচে! বহুদিন, তা বোধহয় মাস তিনেক হাসপাতালের চিকিৎসার পরে সেরে উঠেছিল সে। তবে মাস্তানি আর করতে পারেনি। শরীরেও মনের সে জোর আর ছিল না।
এরপর সে একটা চোলাই মদের ঠেক খুলেছিল। মদ খেতে খেতে লিভার পচে একদু বছরের পরে বীরগতি প্রাপ্ত হয় তার।
কার্তিকের ঘটনা সে সময়ে জনমানসে একটা ব্যাপক আলোড়ন যে ফেলেছিল সে কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে। কামারপাড়ার মধ্যে ঢুকে কাউকে মেরে অক্ষত বের হয়ে আসা এটাই ছিল জনগণের কাছে আশ্চর্য এক আলোচ্য বিষয়। তবে এই ঘটনায় সিপিএমের নেতা বা কর্মী আমার উপর বিশেষ বিরূপ হয়নি। অনেকে তো এমনও বলেছে বেশ করেছিস। খুব বাড় বেড়েছিল। এটা যে সময়ের কথা তখন এই দল ক্ষমতায় আসেনি। দূষণ ঘটেনি। ফলে তখন ওই দলে বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন সত্যিকারে কিছু ভালো সংবেদনশীল মনের মানুষ ছিল। এখন যাদের বয়েস পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে সেই নবীন প্রজন্ম অবশ্য আমার কথা মানতে চাইবে না, আজকে এই দলের কার্যকলাপ দেখে ধারণাও করতে পারবে না। এই পার্টির কিছু লোক আমার বিরাট ক্ষতি করে দিয়েছে, ওদের জন্যই আমার জীবন তছনছ হয়ে গেছে, এক সামাজিক মানুষ থেকে অসামাজিক জীবে পরিণত হয়ে গেছি। তবু আমাকে বলতে হবে, এক সময় এইদলে ভালো মানুষ ছিল। যদি এরা কোনদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে না পৌঁছাত আজও জনগণের বড় বন্ধু হয়ে থাকত। ক্ষমতার লোভই এদের অধঃপতিত করেছে। হয়ত বিলুপ্ত করে দেবে।
০৪. কার্তিকের ব্যাপারটা
কার্তিকের ব্যাপারটা নিয়ে পুলিশও খুব একটা তৎপর হয়নি। হলে আমাকে ধরে ফেলা তাদের কাছে কঠিন কিছু ছিল না। আমি তো এই যাদবপুরেই ছিলাম। হয় স্টেশন, নয় টিবি হাসপাতাল। আমি তখন টিবি হাসপাতালেই বেশি সময় কাটাতাম। টিবি হাসপাতালের পূর্বদিকে একেবারে শেষ মাথায় ময়লা পোড়ানো চুল্লি। চুল্লির সামনে থেকে একটা সরু রাস্তা যার বাঁদিকে একটা পুকুর, এতে নানু মাছ চাষ করে, আর ডান দিকে একটা ডোবা, এতে হাসপাতালের যত নোংরা জল এসে পড়ে। ফলে ডোবায় বিজবিজ করে নানারকম পোকা, সাপ, ব্যাঙ। ডোবার মধ্যে কিছু হোগলা বনও আছে, কিছু গানাও।
এই পুকুর আর ডোবার মাঝখান থেকে সরু পথটা গিয়ে মিশেছে রাজা সুবোধ মল্লিক রোডের পাশ থেকে যে বড় জল নিকাশি নালা কামারপাড়া থেকে ধাপার দিকে চলে গেছে সেই নালার পাড়ে। যার ওপারেই সেই রামকৃষ্ণ উপনিবেশের কালী মন্দির। যে মন্দিরের যজ্ঞের কাঠ আমার কপাল পুড়িয়ে ছিল।
এই ডোবার পাশে, নালার ধারে ঢোল কমলিসহ নানা আগাছা পূর্ণ। পাশে আছে একটা জমাদার বস্তি। তারা শুয়োর পোষে, কুকুর পোষে, মদ খায়, ঝগড়া মারামারি করে। পরিবেশটা সবদিক থেকে নোংরা, প্ৰদূষিত। ফলে মানুষ এই দিকটায় পারতপক্ষে আসতে চায় না। আমি আসি। অন্য জায়গার চাইতে আমার এই জায়গাটা সবদিক থেকে নিরাপদ মনে হয়। নানু তো আছেই, এ ছাড়া আমার আর কয়েকজন বন্ধু হয়েছে, যারা হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় সুইপার। ওয়ার্ডবয় বন্ধুরা রোগীদের জন্য খাবার ঘর থেকে যে খাবার নিয়ে আসে, রোগীদের মুখে রুচি থাকে না বলে তা প্রায়দিনই অল্পসল্প বেঁচে যায়। যা ফেলে দেবার নিয়ম। ওরা কায়দা করে আমার পাতে ফেলে দেয়। নানুর চোলাই মদের ঠেক আছে। সেখান থেকে এক আধ গেলাস আমাকে দেয়। গণেশ গোপাল জলিল মাঝে মধ্যে পাঁচদশ পয়সা উঁদা তুলে আট আনা এক টাকা আমাকে সাহায্য করে। দিন আমার এভাবে কাটে। রাত কাটে আগে যে ঘরে মৃতদেহ রাখা হোত, এখন নানুর মদের ঠেক সেই লাশ ঘরের ভিতরে বা ছাদে।
টিবি হাসপাতালের পিছন থেকে যে নোংরা নালাটা রাজা সুবোধ মল্লিক রোডে গিয়ে মিশেছে, সেটা ধরে যাদবপুরের দিকে এসে বাঁদিকে যে পাড়া আগে এখানে বেশ কিছু মিস্ত্রি বাস করত। যে কারণে এর নাম হয়েছিল মিস্ত্রি পাড়া। এখন সেখানে বাবুশ্রেণির কিছুলোক বড়বড় বিল্ডিং করেছে। তারা মিস্ত্রি পাড়ায় থাকি বলতে খুবই বিব্রত বোধ করে। তারা এর নাম দিয়েছে কালীবাড়ি লেন। এই একই কারণে শ্যামা কলোনির লোকও পাড়ার নাম বদলে শ্যামাপল্লী করে নিয়েছে। তো সেই মিস্ত্রি পাড়ায় থাকে একটা ছেলে যার নাম বাবলু। ফরসা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বাবলু আগে টিউবয়েল মিস্ত্রির কাজ করত। কীভাবে কে জানে ও সিপিএম পার্টিতে ভিড়ে যায়। বড় মাপের দু-তিনখানা কেস চাপে ওর নামে। যার ফলে এখন পুলিশ আর কংগ্রেস ওকে হন্যে হয়ে খোঁজে। সিপিএম পার্টির নেতাকর্মী যারা আর্থিক দিক থেকে সবল তারা তো সব এলাকা ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু যাদের কোথাও গিয়ে থাকা খাওয়ার জায়গা নেই প্রাণ হাতে করে রয়ে গেছে পাড়ায়। নানু, বাবলু এবং কার্তিক সেই রকম লোক।
