লেখক আর মাস্তানদের মধ্যে একটা বিষয়ে মিল আছে। তাহল অনবরত তাদের কিছু না কিছু করে যেতে হবে। যদি কর্মে কিছু ছেদ পড়ে আলস্য আসে মানুষ তাকে ভুলে মেরে দেয়। কার্তিক কিছুদিন জেলে চলে গিয়েছিল, অর্থাৎকর্মে ছেদ পড়ে গিয়েছিল। এখন পুলিশের ভয়ে “পাবলিকের” সাথে “ধমাকাদার” কিছু করারও সুযোগ পাচ্ছিল না। যার ফলে কামাই তেমন একটা হচ্ছিল না। সেই কবে জেলে যাবার আগে কী করেছিল এখন আর মানুষ তাতে ভয় পাবে কেন! সে চাইছিল একটা কিছু করে দেখাবার।
ঠিক এই সময় আমার কেসটা তার কাছে যায়। অংক কষে বুঝতে পারে আমি অতীব নিরাপদ এক শিকার। ঘরবাড়ি নেই, হোটেলে খাই আর স্টেশনে ঘুমাই। পুলিশ আর পাবলিকের চোখে আমি এক ক্রিমিনালও বটে। কোন পার্টিরও সাথে কোন যোগ নেই। এমন মানুষকেটসকে দেওয়ার কোন অসুবিধা নেই। বিশেষ করে তার জন্য যখন মজুরি পাওয়া যাচ্ছে।
এক জুন মাসের আগুন দুপুরে এক নাম্বার প্লাটফর্মের পূর্বপ্রান্তে ওরা তিনজনে ঘিরে ধরল আমাকে, কামারপাড়ায় একটু চল তো। কথা আছে। এদের সাথে আমার কখনও কোন শত্রুতা ছিল না। তাই ওদের কথায় একটু আশ্চর্য বোধ করি। এরা আমাকে নিয়ে যেতে চায় কেন! জানতে চাই–কী কথা?
-গোপন কথা। এখানে বলায় অসুবিধা আছে। চল, দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসবি। ভয় পাচ্ছিস নাকি?
-ভয় কেন পামু! তোমাগো লগে আমার তো কোন বিরোধ নাই।
-তবে চল।
জুনমাসের নিদাঘ দুপুর। ঠিক মাথার উপর জ্বলছে রাগী সূর্য, যেন দশগুণ দহনতেজ নিয়ে। রোদে শরীরে চামড়া যেন ঝলসে যেতে যায়। আমি হাঁটি ওদের সাথে। জীবন আমাকে অনেকবার অনেক রকম পরীক্ষায় ফেলেছে। এবার আর একটা পরীক্ষার সময় সমাগত। এখন অবশ্য এক ছুটে পালিয়ে যেতে পারি। কিন্তু পালিয়ে চলে গেলে পিছনে কী ফেলে গেলাম আর তা জানবার কোন উপায় থাকবে না। ওরা হয়ত সত্যিই কোন গোপন কথা বলতে চায়। বন্ধু হতে চায় আমার। বন্ধুর অভ্যর্থনার জন্য কিছু রাখা আছে কামারপাড়ায়। কী আছে সেখানে না গেলে জানব কেমন করে?
ওরা তিনজন। কার্তিক মণি আর শিবশংকর। চলতে চলতে চোখে ইশারায় ওরা কিছু কথা সেরে নেয়। আমি তার মানে ধরতে পারি না। সবার সামনে কার্তিক। তার পিছনে আমি। আমার পিছনে অন্য দুজন। ওদের চোখ লাল, পা টলোমলো, মনে হয় আমাকে ধরবার আগে খানিকটা মদ গিলেছিল। রোদের তাপে মদ পেটের মধ্যে ফুটছে। নেশার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যেখানে এসে আমাদের চলা থামে সেটা একটা তেমাথার মোড়। সামনে একটা তিনতলা বাড়ি। বাড়িটা পুরনো, তবে এখন তাতে লোক থাকে না। কিছু মেরামতির কাজ চলতে চলতে বন্ধ আছে। দুপুরের রোদে ক্লান্ত এই মধ্যবিত্ত অঞ্চলটা এখন দরজা জানালা বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে আছে। পথে কোন লোকজন নেই। এখন ওদের গলার আওয়াজ বদলে গেছে। কঠিন গলায় আমাকে বলে কার্তিক-বাড়ির ভিতর ঢোক। নির্দেশমত ভিতরে ঢুকি আমি। বাড়িটার নিচের তলায় তিনচার খানা ঘর। যার কোনটায় দরজা জানলা নেই। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠার বাপাশে বড় বাথরুম। এরও কোন দরজা নেই। আমার প্রতি কুম হয়–বাথরুমে ঢোকবার। আমি আগে ঢুকি। আমার পিছনে ঢোকে কার্তিক। মণি দাঁড়িয়ে যায় বাথরুমের দরজার কাছে। শিবশংকর বাড়িতে ঢোকবার প্রধান দরজার সামনে। এবার কার্তিক মণির দিকে হাত বাড়ায়–দে। মণি কোমর থেকে কানপুরি বের করে তার হাতে দেয়। চাকু বের করতে দেখে আমি সত্যিই অবাক। আমাকে চাকু মারবে! কিন্তু কেন? মনে ভাবি হয়ত আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। এটা যে মজার নয় বুঝলাম তখন, যখন সে চাকুটা আমার বা কাঁধে গেথে দিল। যেভাবে চাকুটা এসেছিল এক আঘাতে আমার মারা যাওয়াও অসম্ভব ছিল না। কণ্ঠার হাড় আর গলার মাঝে যে খোদল ওখান থেকে চাকু ঢুকে হৃদপিন্ড ফুটো করে দিলে মানুষ বাঁচে না।
আবার চাকু চালাল সে। এবার আড়াআড়ি। মাথাটা চকিতে একপাশে সরিয়ে গলার নলিটা বাঁচালাম আমি। ফের চাকু চালাল, লক্ষ্য সেই গলার নলি। আমার পিছনে পিছোবার কোন জায়গা নেই, পিঠ বাথরুমের দেওয়ালে ঠেকে গেছে। অগত্যা বাঁ হাত উঁচু করে গলা আড়াল করলাম। চাকু এসে বিঁধে গেল বাঁহাতের কনুইয়ের কিছু নিচে। ফিনকি দিয়ে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল মেঝেয়।
তিনবারের ব্যর্থ চেষ্টার পর কার্তিক এবার একটু পিছনে সরে ফের চাকু উঁচু করল। এবার তার লক্ষ্য আমার পেট।
মনের মধ্যে এখন আমার উথাল পাথাল–মরে যাব! মেরে ফেলবে ওরা এইভাবে? না না মরব না। আমি লড়ব এবং বাঁচব। এখনও সময় আছে। চেষ্টা করলে নিশ্চয় বাঁচা যায়। দরজা জানলা বন্ধ আক্রান্ত বেড়ালের মত আমার মধ্যে জন্ম নেয় আক্রমণাত্মক মনোভাব। হতে পারে কার্তিক অনেক খুন করেছে। কিন্তু সে কোন অতি মানব তো নয়। তার বুকের বাঁদিকে চাকুর চোট পড়লে সেও লাশ হয়ে যাবে। আমার চেয়ে কার্তিক শারীরিক সক্ষমতায় অনেক কম। শুধু হাতে চাকু থাকায় কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওর পেটের মাদক তরল তো ওকে টলোমলো করে দিয়েছে। এটা আমার পক্ষে মস্ত সুবিধার। এক ঝটকায় যদি চাকুটা কেড়ে নিতে পারি, মুহূর্তে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি বদলে দেওয়া যাবে। দেওয়ালে পিঠ রেখে আমি প্রস্তুত হই–এসো।
কার্তিক আমার মনোভূমির এই শক্তিপুঞ্জের বিস্ফোরন অনুধাবন করে উঠতে পারেনি। তার মস্তিষ্কের মাদক প্রভাব তাকে বোধহীন করে দিয়েছে। সে এলোমেলো হাতে আমার পেটে চাকু চালিয়ে দিল। বিদ্যুৎ বেগে বাঁদিকে বেঁকে গেলাম আমি। চাকুর ধারালো ডগা পেটের চামড়ায় হাল্কা আঁচড় কেটে গেল। সাথে সাথে সেই হাতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এক মোচড়ে ওর হাত থেকে চাকু আমার হাতে চলে এল। আর দেরি করা ঠিক নয়, চাকু ঘুরিয়ে চালিয়ে দিলাম ওর পেটে। বাপরে। বলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। এ কোন প্রিয় আলিঙ্গন নয়। এখনই বাধনমুক্ত করা দরকার, না হলে মনি এসে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই বাঁ হাত দিয়ে ওকে বুকে চেপে রেখে ডানহাতে ওর পিঠের উপর মারতে রইলাম চাকুর খোঁচা। প্রতি খোঁচায় আধ ইঞ্চি এক ইঞ্চি গর্ত হচ্ছে–রক্ত ঝরছে।
