মাঝে মাঝে ওকে গোলাম গাঁজিও খাওয়াতে নিয়ে যেত। এটা সেটা কিনে দিত। তখন সেটা কারও মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক করেনি। হঠাৎ একদিন স্টেশন থেকে যাদব উধাও হয়ে গেল। কেতাকে নিয়ে গেছে কেউ কোনদিন জানতেই পারতনা যদিতাকে রেলকলোনির এক কামানেখানে বালা’ মেয়ে-ঘুটিয়ারি শরিফের পনের টাকা ভাড়ার ভাঙা ঘরের জানালা দিয়ে দেখে না ফেলত। তখনই তার একটা সন্দেহ হয়েছিল। কাপড় চোপড় পরে বাবুর কাছ থেকে পারিশ্রমিক বুঝে নিয়ে যখন সে ঘর থেকে বের হতে পারল–পাখি পালিয়ে গেছে।
গোলামগাঁজি জানত যে যাদব কোন সাধারণ বাচ্চানয়।এ বাচ্চা নিখোঁজ হলে স্টেশন তোলপাড় হবে। তাই দুর থেকে পুরো পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিল। যে দু-চারটি মুসলমান মেয়ে ঘুটিয়ারি শরিফ থেকে যাদবপুরে কাজে আসে তাদের মাধ্যমে খবর নিচ্ছিল। ফলে সে জেনে যায়–অনেকে তাকে খুঁজছে। এখন যাদবপুরে গেলে বিপদ আছে। তাই সে ট্রেন থেকে যাদবপুরে নামত না। ভেন্ডার কামরার এককোণে মুখ লুকিয়ে চলে যেত পার্কসার্কাস। আবার লাস্ট ট্রেনে ওই কামরায় ফিরত ঘুটিয়ারি শরিফে। আজ তাকে দেখে ফেলেছে যাদবপুর স্টেশনের লোক আর টেনে নামিয়েছে ট্রেন থেকে।
খবর পেয়ে দেখতে গেলাম। তখন তাকে রেল সাইডিংয়ে স্টোন চিপসের গাদার আড়ালের অন্ধকারে নিয়ে বসানো হয়েছে। মুখ দেখে বোঝা যায় যে খুব গভীর জলের মাছ। সোজা আঙুলে এর পেট থেকে কথা বের করা মুশকিল। তখন বাধ্য হয়ে আঙুল বাঁকানো শুরু করা হল। একটা আমি একটা গণেশ দুই গোপাল দুটো একটা কালিয়া, দশ আঙুল বাঁকাবার আগেই সে স্বীকার করল–দাদারে, আল্লার কিরে আগের বাচ্চাগুলোর কথা আমি কিছু জানিনে। তবে এরে আমি নে গেছি। ফুলের মতোন বাচ্চা আস্তায় আস্তায় ঘোরে, তেমন কোন যত্ন পায়নে। তা দেখে মোনে বড় কষ্টে হয়েছেল। তাই ওরে নেগে বৃন্দাবন বাবুর বাড়ি দে এসেছি! বাবুর পাকা বাড়ি। নেই নেই করে একশো বিঘে জল জমি, পাঁচ পাঁচটা পোনা পুকুর। তবে ওই–আল্লা দশদিকে দে এ্যাকদিকে খালি করে রেখেছে। বউটা বাঁজা। বারো বচ্ছর বে হয়েছে তেবু ছাবাল পান হয়নি। আমার কতা বিশ্বেস করো, বাচ্চাটা সেখেনে সুখেই মানুষ হবে।
যে কটা আঙুল এখনও বাঁকা হয়নি আমরা সেদিকে হাত বাড়াতে কবুল করে গোলামগাঁজি–না সে যাদবকে ঠিক বিক্রি বলতে যা বোঝায় তা করেনি। বাবু খুশি হয়ে বারোশো টাকা দিয়েছে।
রাত দশটা সাড়ে দশটায় গোলামগাঁজিকে ধরা হয়। দেড় দু-ঘণ্টার চেষ্টায় তার মনের গোপন গহুর থেকে সব কথা বের করা সম্ভব হয়। জানা যায় বেন্দাবন বাবু নয়, শেখ আনোয়ার নামে একজনকে দিয়েছে বাচ্চা। সে এতদিনে তাকে নিয়ে বোম্বাই চলে গেছে। সেখান থেকে অন্য কেউ সাগর পার করে আরবে নিয়ে যাবে। তার আর কোনভাবে ফিরে আসবার উপায় নেই।
এখন গোলামগাঁজিকে কী করা যায়! এতবড় অপরাধের সাজা কে দেবে! আমি জানি, পুলিশে দিলে কোন লাভ হবে না। তারা ঘুষ খেয়ে কোন হালকা কেস দিয়ে ওকে ছেড়ে দেবে। তখন সবাই পরামর্শ করে ঠিক করা হয়–গোলামগাঁজি যখন এক মুসলমান, আমাদের সাথী জলিল যা বলবে তাই হবে। জলিল জানায় যে কোরানের নির্দেশ দাঁতের বদলে দাঁত চোখের বদলে চোখ। তখন ধরে নেওয়া হল যে উটের দৌড়ের পরে যাদব মারা যাবে না, পঙ্গু হবে। তাই শরিয়তি বিধান মেনে গোলাম গাঁজির পায়ের নিচে ইট দিয়ে শাবল চালিয়ে তাকেও পঙ্গু বানানো হল।
এরই মাসখানেক পরে আমাকে আর একবার কামারপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হল। যে কামারপাড়ায় যেতে হয় হেঁটে, ফিরতে হয় খাটে। যে কারণে কিছু লোকের মনে সন্দেহ হয়–এর পিছনে গোলাম গাঁজির নিশ্চয় বেশ কিছু টাকার গোপন যোগান আছে।
এক মাস্তানের নাম কার্তিক। সে থাকে কামারপাড়ার সামনে, রেল লাইনের এপারে তালতলা রেলকলোনিতে। আগে সে চুরি ছিনতাই এইসব করত। পরে পার্টিতে ঢুকে খোকা দাসের ডানহাত হয়ে যায়। হাত তার দশটা, তবে ডানহাত চারটে। চান্দু, ভাইয়া, বিশু আর এই কার্তিক।
এখন এই সময়ে কামারপাড়া একেবারে ফাঁকা। পার্টির নির্দেশে যত নেতাকর্মী-এ্যাকশানার সব আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে গেছে। কামারপাড়ার তাত্ত্বিক নেতা শিবু রায় চৌধুরি এবং মোহিত বর্মন পাড়া ছেড়ে শিয়ালদহ গিয়ে পুরানো জামা কাপড় বেঁচছে। রামঠাকুর আশ্রমের যতীন বিক্রি করে কলা। তাতা দত্ত আর হাতকাটা ভাইয়া পালিয়েছে আসামে। খোকা দাস কোথায় গেছে কে জানে।
এই সময় কংগ্রেস আর পুলিশের যৌথ আক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। যে কারণে কামারপাড়া একেবারে বীরশূন্য হয়ে পড়েছিল। এই সময় এক দেড় বছর জেল খেটে কার্তিক সেখানে ফিরে এল। এবং ফাঁকা মাঠে গোল বলে যে বাংলায় একটা কথা আছে সেটা চরিতার্থ করার জন্য নিজস্ব একটা দল গড়ে ফিরে গেল পুরানো চুরি ডাকাতির পথে। চোলাই মদঅলা ছোট ছোট হকার দোকানদারের কাছ থেকে তোলাও তোলে। যে কারণে সি.পি.এম পার্টি তাকে ঘোষণা করে–আউট অব কন্ট্রোল।
ধর্মে অছে–যদি কেউ গঙ্গা স্নান করে নেয়, তার সব পাপ ধুয়ে যায়। যে হেতু জেলখানার আর এক নাম সংশোধনাগার, পুলিশ মনে করে যদি কেউ একবার জেল খেটে আসে সেসংশোধিত হয়ে যায়। যতক্ষণ তার নামে আর একটা লিখিত অভিযোগ জমা না পড়ে তার দিকে কুদৃষ্টি দেয়না। তাই কার্তিক নিরাপদে পাড়ায় ছিল।
