রাখালের যে রাজা সে তো রাখালই। আদিবাসীর রাজা আদিবাসী। রিকশাঅলার সেক্রেটারি রিকশাঅলা। রিকশাঅলা মানে-ছোটলোক। কবে কোন ছোট লোককে বাবুশ্রেণির লোক সম্মান দিয়ে কথা বলে? এখানেও তার ব্যতিক্রম হবার নয়। ফলে এক যাত্রী–যা তাদের চিরকালের অভ্যাস–যে ভাষায় তার পূর্ব পুরুষ তাকে বলতে শিখিয়েছে তাই বলে–এ্যাই রিকশো, যাবি নাকি রে? আমরা যখন শ্যামা কলোনিতে থাকতাম, রামকৃষ্ণ উপনিবেশের জনৈক কেষ্টবাবু আমার বাবাকেও ঠিক এই ভাষায় সম্বোধন করতেন।তখন আমি ছোট ছিলাম। কানে খুব খারাপ লাগলেও কিছু বলতে পারিনি। এখন পারলাম। আসলে মানুষের এক সময় এমন একটা বয়স আসে যখন তাকে বাবা বাবা মনে হয়। অন্য কারও হয় কিনা তা জানি না। তবে আমার হয়। যে কোন বুড়ো লোককে দেখলেই আমার বাবার মুখটা মনে পড়ে। এখন হরেন ঘোষ নয়, মনে হল যেন আমার বাবাকেই আর একবার অপমান করা হচ্ছে। আমি তার পাশের রিকশায় বসেছিলাম। আমার উচিত ছিল লোকটাকে বলা–মহাশয়, অনুগ্রহ করে আপনি আপনার ভাষাটা সংশোধন করে নিন। উনি বয়স্ক মানুষ। বলতে গেলে আপনার বাবার বয়েসী। ওনাকে তুই তোকারি করাটা ঠিক নয়। কিন্তু ওই যে রাজনৈতিক বিচ্যুতি–যার মূলে আছে অশিক্ষা, সে আমাকে দিয়ে অন্যকথা বলিয়ে নিল–এ্যাই, কোথায় যাবি রে তুই?
এই শব্দ বাবুর গায়ে যেন লঙ্কাবাটা লেপে দিল–কী কী বললি তুই?
-–ঠিক যা তুই শুনেছিস। আমার দুবির্নীত জবাব।
–মারব এক চড়।
–মারা তো অনেক দূর, গায়ে আঙুল ঠেকালে হাত ভেঙে দেব।–ব্যস এরপর তর্কাতর্কির পর একটা মারামারি হয়েই যায়। পরে জানতে পারি উনি এক নেতার দাদা। তখন গা ঢাকা দিতে হয় আমাকে। আর রিকশা চালাতে পারি না। বালিগঞ্জ-কসবায় এই রকম “বাবুদের গায়ে হাতে তোলা” এক রিকশাঅলাকে প্যাসেঞ্জার সেজে নিয়ে গিয়ে কারা যেন কেটে রাজডাঙার খালে ফেলে দিয়েছিল। যাদবপুরে অবশ্য এতবড় ঘটনা এখনও ঘটেনি। তবে মদের বোতল ভেঙে গলায় চালিয়ে দেওয়া, পিঠে খুঁর মারা এসব হয়ে গেছে। তাই একটু ভয় পাই! এইসব নানা কারণে সেভাবে রিকশা চালানো হয় না। হাতে টাকা পয়সা জমে না। মা বাবাকে কিছু পাঠাতে পারি না।
এবার আমি যখন স্টেশনে এসে ঘাঁটি গেড়েছিলাম আমার চোখে পড়েছিল লোকটা। যার নাম গোলাম গাঁজি। যে দুনাম্বার প্লাটফরমে বসেনানা রকম মাদুলি কবচ পাথর গাছ গাছড়া বিক্রি করে। আমি জানি, এসব মাদুলি কবচ একটা লোক ঠকানো ব্যবসা, কিন্তু জানতাম না, এটা আসলে তার একটা ভেক। তার সত্যিকারের পরিচয় সে একটা ছেলে পাচার চক্রের চাই। এই সব বিক্রির বাহানায় সে কোন রেল স্টেশনে গিয়ে কিছুদিন ঘাঁটি গাড়ে তারপর সুযোগ বুঝে বাচ্চা নিয়ে পালায়।
আরব দেশের যারা তৈলকুবের তাদের প্রধান শখ দুটো অনেকগুলো বিবি রাখা আর উট দৌড় করানো। এই দৌড়ে একটা ছোট বাচ্চাকে উটের পেটের কাছে না গলায়, কোথায় যেন বেঁধে দেওয়া হয়। উট দৌড় শুরু করলে সেই বাচ্চা ভয়ে-ঝাঁকুনিতে, ব্যথায় যত কাঁদে-চেঁচায়, উট তত জোরে ছোটে।দীর্ঘদৌড় শেষ করে উট যখন থামে কোন বাচ্চা মরে যায় কোন বাচ্চা পঙ্গু হয়ে পড়ে চিরদিনের মতো। তখন সেই বাচ্চাকে মক্কার পথে পথে নিযুক্ত করা হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে হজ যাত্রার মতো পুণ্যকর্ম আর কিছু নেই। হজযাত্রার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং অবশ্য পালনীয় কর্মের নাম জাকাত। সে সারা জীবনে যত ধন সম্পদ সঞ্চয় করেছে। তার ছয়ভাগের এক ভাগ দান করে দিতে হয়। এইসব অভাগা বালক সেই দান সংগ্রহ করে নিয়ে জমা করে নির্দিষ্ট স্থানে। এর বিনিময়ে সেদুবেলা দুমুঠো আহার আর আশ্রয় পায়। একটা পিতৃমাতৃহীন বালক বিনা অপরাধে একদল নরপশুর ক্রীতদাস হয়ে সেই দূর বিদেশে এই রকম নারকীয় জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়।
তখনকার সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর এত সুলভ প্রাপ্তির সুযোগ ছিল না। ফলে রেল স্টেশনে জারজ, অবৈধ, পরিত্যক্ত বা গৃহ পলাতক গাদা গাদা বেওয়ারিস বাচ্চা ঘুরে বেড়াত, ভিক্ষা করত। যাদের হারিয়ে গেলে খোঁজবার মরে গেলে কাঁদবার মতো কোন লোক ছিল না। এই রকম একটা দুটো বাচ্চা স্টেশন থেকে মাঝে মাঝে কেউ কিছু বোঝবার আগে নিঃশব্দে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিল। এখান থেকে সর্বশেষ যে বাচ্চাটা হারিয়ে গেল তার নাম যাদব। এই নাম তাকে দিয়েছিল স্টেশন কেন্দ্রিক জীবন যাপক মুটে মজুর হকার রিকশঅলা মানু্ষ।
একাত্তরের যুদ্ধের সময় ওর মা ওকে কোলে নিয়ে এসে পৌঁছায় এপার বাংলায়। তারপর নানাঘাটে জল খেতে খেতে একদিন এসে যায় যাদবপুরে। আশ্রয় নেয় দু-নাম্বার প্লাটফর্মের সিঁড়ির নিচে। তারপর একদিন এখানকার জল খেয়ে ভেদ বমি হয়ে মরে পড়ে থাকে। সেই মৃতদেহ রাস্তায় পেতে রেখে রেল কলোনির ভজার দলবল এত দান পায় যে তা দিয়ে দেহটি কালীঘাটে নিয়ে দাহ করবার পর যে টাকা বেঁচে যায় তাতে পাঠার নাড়িভুঁড়ির চচ্চড়ি সহ চোলাই খেতে অসুবিধা হয় না। তখন এই ছোট্ট ছেলেটাকে পালন পোষণের দায়িত্ব নেয় স্টেশনের সেইসব মানুষ, যাদের নিজেদেরই ঠিকমত খাওয়া জোটে না।
স্টেশনের রিকশা লাইনের পাশে বিহারের আরা জেলার বাসিন্দা ছেচন সাউয়ের হোটেল। এখানে যে সব মুটে মজুর রিকশাঅলা খেতে আসে, ডাল তরকারি ভাতের একটাকা দশ পয়সার প্রথম প্লেট নেবার পর পঁচিশ পয়সার একটা পরের ভাত’ চেয়ে নেয়। একা না পারলে দুজনে, তিন বা চারজনে। সেটা ওই যাদবের জন্যে।
