এই রকম অস্থির সময়ে কি মানুষ আর কি পুলিশ কদিন আর যাদবপুর স্টেশনের ঘটনা মনে করে মুহ্যমান হয়ে থাকবে। থাকেনি। দিন দশেকের মধ্যে স্টেশন ফিরে গিয়েছিল স্বাভাবিক ছন্দে। স্টেশন ঘিরে গড়ে ওঠা চোলাই মদের ঠেকগুলোয় সন্ধ্যের পরে আবার শুরু হয়েছিল খদ্দেরের জমজমাট ভিড়। রেল সাইডিংয়ে, গোডাউনের আড়ালে আবার বসতে শুরু করেছিল তাসের জুয়া। রেল বস্তির কামিনী কমলারা আবার মনোমত সঙ্গী নিয়ে যাওয়া আরম্ভ করেছিল মালগাড়ির খালি বগিতে।
যা কোনদিন এর আগে ঘটেনি–কামারপাড়া থেকে ফিরে এসেছি। যা অনেকের কাছে। আমার পুনর্জন্ম। এরপর “ঠেক” নিয়েছি রেল স্টেশনে। কিন্তু আমি এখন করব কী? কিছু একটা করে তো পেটের অন্ন যোগাড় করতে হবে। পরামর্শ দিল তাতা দত্ত-রিকশা চালা।রিকশা চালাব। গাধা মোট বয়, গরু ঘোড়া গাড়ি টানে, মানুষ পালকি বয়, রিকশা চালায়। ধনতান্ত্রিক এই ব্যবস্থা মানুষকে নামিয়ে এনেছে গরু গাধার পর্যায়ে। এই ব্যবস্থা এত আটোসাটো মজবুত যে হাজার হাজার মানুষের আপ্রাণ চেষ্টায়ও এর গায়ে আঁচড় কাটা গেল না। আর যে কিছু করা যাবে সে প্রত্যয় একটু একটু করে পিছু হটছে।
রিকশাঅলা! শহরের বাবুশ্রেণির কাছে যারা মদ খায়, জুয়া খেলে, ঘন ঘন বউ বদলায়, সুযোগ পেলে ঠকিয়ে ভাড়া বেশি নেয়, বেপরোয়া রিকশা চালিয়ে পথচারীর পায়ে চাকা তুলে দেয়, যখন মানুষের রিকশা চাপার খুব প্রয়োজন, তখন যাব না বলে ঘাড় ঘুরিয়ে বসে থাকে। যে কারণে এরা অভদ্র অসভ্য পিটুনিযোগ্য জীব হিসাবে চিহ্নিত।
জীবন আমাকে বাধ্য করছে সেই জীব হতে। তাতা দত্তের বেশ কটা রিকশা আছে। তারই একটা দিনে আড়াই টাকা ভাড়ায় আমাকে চালাতে দেয়। সে এখন জেনে গেছে আমি টিবি রোগী নই। আমাকে দিয়ে তার অনেক কাজ হতে পারে।
একমাত্র হাঁস, যে সারাদিন জলে থাকে তবু গায়ে জল লাগে না। এই জন্য রামকৃষ্ণদেব মানুষকে বলেছেন হাঁসের মত হতে। মানুষ কি তা পারে? পারে না। এই মানুষই বনে গিয়ে দীর্ঘদিন থাকলে বনমানুষ হয়ে যায়। পবিত্র গঙ্গাজল নর্দমায় ঢাললে নর্দমা গঙ্গা হয় না, গঙ্গা নদৰ্ম হয়ে যায়। সোনাকে কয়লার মধ্যে রেখে দিলে, সোনা কয়লা যদিনাও হয় তার ঔজ্জ্বল্য ঢেকে যায় কয়লার কালিমায়।
আমি কী কোনদিন মানুষ ছিলাম পবিত্র ছিলাম সোনা ছিলাম? কোন সদগুণ কী আমার ছিল? আমি জানি না। কোনদিন খোঁজ করিনি। এখন পরিবেশ পরিস্থিতি আমাকে পুরোপুরি গিলে নেয়। আমি রিকশাঅলা হই। মদ খাই, মাতলামো করি। মারামারি করি। মনের মধ্যে তখন কী এক ক্রোধ যেন গনগন করে। কতগুলো সোনার টুকরো ছেলে এই দেশটার জন্য, মানুষের জীবন সুখময় করার চেষ্টায় প্রাণ দিয়ে গেল। আর মানুষ–সেইমানুষ, বাজার করছে, বউ নিয়ে সিনেমায় যাচ্ছে, রাতে বাচ্চা পয়দা করছে, চায়ের দোকানে, রকে গুলতানি মারছে। তাদের আত্মত্যাগ মনেও রাখছে না। আমি এই মানুষ নই। ইমানুষ আমার কেউ নয়। শত্রু সব শত্রু।
স্টেশনে সারাদিন প্রায় পাগলের মত ঘুরি। মদ খেয়ে ঘুরি, মদ না খেয়ে ঘুরি। ঘুরি আর খুঁজি কাকে মারা যায়। মানুষকে মেরে মনের আক্রোশ যদি কিছুটা কমে।যদি কোন চোর, কোন পকেটমার, নারী পাচারকারী, শিশু পাচারকারী নাগালে পেয়ে যাই, যদি কোন রঙিন মেজাজের রোমিও সেজেগুজে গরিব মেয়েদের বিরক্ত করতে স্টেশনে আসে, ধরতে পারলে বেধরক ঠ্যাঙাই। যে কারণে স্টেশন এলাকায় বদমাশ শ্রেণির লোকের কাছে আমি ত্রাস হয়ে উঠি। আবার উল্টোদিকের কিছুলোক আমাকে ত্রাণকারীও ভাবতে থাকে। বিশেষ করে বাবুদের বাসায় বাসন মাজতে আসা গ্রাম বাংলার গরিব মেয়েরা। এই সময়ে নানা কারণে ট্রেন চলাচলে খুবই বিঘ্ন হোত, বৃষ্টিতে লাইনে জল জমে গেলেওভারহেডের তার ছিঁড়ে গেলে, তার চুরি করে নিলে আর ট্রেন চলতে পারত না। তখন এই সব মেয়েদের স্টেশনে রাত কাটাতে হতো। সেই বিপন্ন সময়ে ওরা আমাকে খুঁজত। কম বয়েসের মেয়েদের বিপদ তো শুধু দুষ্কৃতীদের কাছ থেকে নয়, স্টেশনের পুলিশের দিক থেকেও আসে। পুলিশের হাতে আগেও প্রচুর ক্ষমতা ছিল এখনও আছে পরেও থাকবে। ওরা জিজ্ঞাসাবাদের নামে বলাৎকার করলে সেটা অপরাধ হয় না।
এদের ভয়ে মেয়েদের কোন নিরাপদ স্থানে নিয়ে রাখি। রাত জেগে পাহারা দিই। স্টেশনের কিছু ছেলে, যার মধ্যে কেউ রিকশা চালায় কেউ মদের দোকানে কাজ করে কেউ কাগজ কুড়ায়, বাজারের মাছের আঁশ ছাড়ায় এরা সব সাথী হয় আমার। এক বাড়িতে একটা কাজের মেয়েকে রেপ করে, গলা টিপে মেরে, ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানো হয়। রেলবস্তির মেয়েদের নিয়ে গিয়ে আমরা সেই বাড়িতে ইট পাটকেল ছুঁড়ে আসি। রাজনীতি সম্বন্ধে গভীর কোন জ্ঞান নেই, যদিও তাতা দত্ত আমাকে জ্ঞানবান করার চেষ্টায়, সঞ্চয় পুততুণ্ডু নামে এক নেতার পলিটিক্যাল ক্লাশে মাঝে মাঝে ধরে নিয়ে যায় তবু আমার কিছু শেখা হয় না। এক সময় অল্প কিছুদিন এক উগ্রবাম দলের সঙ্গে ছিলাম। এখন আর তাদের সাথে যোগাযোগ নেই। আছে শুধু তাদের কাছ থেকে পাওয়া উগ্রতাটা। সেই উগ্রতা দিয়ে যা করি তা শুধু আমার বদনামই বাড়িয়ে দেয়।
স্টেশনের সবচেয়ে পুরানো রিকশা চালক হরেন ঘোষ। যার মাথার চুল সব সাদা, মুখে একটাও দাঁত নেই, গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে। আমরা সবাই তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলি। সে রিকশা ইউনিয়নের লাইন সেক্রেটারী।
