কী করিস তুই। কাগজ কুড়াইস নাকি?
আমার চেহারা পোষাক সব সেই রকমই। তাই তার জিজ্ঞাসার জবাবে বলি-এহন আর কুড়াইতে পারি না। সব্ব সোমায় জ্বর জ্বর ভাব। বুকে ব্যথা। কাশলে দলাদলা রক্ত বাইরায়। সেই জন্য।
খোকা চক্রবর্তীর মন ভিজে যায়। তিনি ভিড়ের দিকে প্রশ্ন ছোড়েন–এই, এডারে কোড়া আনছে রে?তাতা দত্ত মাথা নিচু করে সামনে এসে দাঁড়ায়। তার দিকে তাকিয়ে প্রখর গলায় বলেন। তিনি–তুই! তুমি হালায় কাউয়া কোন কামের না। হাসপাতালের বেড থিকা এট্যা রুগী তুইল্যা নিয়া আইয়া পড়ছ। মিনমিন করে বলে তাতা দত্ত-কী করে জানবো যে–। তখন তো কিছু বলেনি। আগে তো একটা জিনিস ছিল। হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করতে দেখে আমি ভাবলাম। এবার আমাকে তাড়া দেন খোকা চক্রবর্তী–এ্যাই, যাঃ, ভাগ! এতক্ষণে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল আমার। মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত বন্দী মুক্তির আদেশ পেয়েছে। তবে সত্যি সত্যি পেল কী? মনের সন্দেহ যে যাচ্ছে না। আবার তাড়া দেন তিনি, পালা, পালা। কিন্তু কী করে পালাব। পায়ের উপরে যে পাহাড়। এখনও যথাস্থানে রয়েছে সেই গুলিভরা বন্দুক। আমি হাঁটা দিলেই যদি কেউ পিছন থেকে গুলি চালিয়ে দেয়। এমনভাবে তোক মারা হয়েছে। এখন যে হবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে!
এই যে খোকা চক্রবর্তী–যিনি আজ আমাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছেন, মাত্র এক মাসের মধ্যে পুলিশ ওনাকে ধরে লায়েলকার মাঠে নিয়ে গিয়ে এইভাবে পিছন থেকে গুলি করে মারবে। আর কে কদবে তা জানি না। আমি সেদিন কাঁদব এই মানুষটার জন্য।
এখন আবার বলেন খোকা চক্রবর্তী-কামারপাড়ার খোকা এসে পড়বার আগে পালিয়ে যা। ও ওসব রুগী ফুগি মানে না। কথা বলারই সময় পাবি না, পালা পালা।
পালিয়ে তোত যেতে চাই, কিন্তু পালাই কোন পথে। আছে উপায়? একটা আছে। সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই স্বপন–আলু স্বপন। যে দেওয়ালে “এল” লিখে ছিল। আমি মার খাবার পরে যে গিয়ে সি.পি.এম চলে নাম লিখিয়েছে এখন এই দলের এক মূল্যবান সম্পদ। নারকেল বাগানে এ্যাকশনে গিয়ে পেটে কংগ্রেসিদের গুলি খেয়ে ছয়মাস হাসপাতালে ছিল। তাকে কাছে ডাকি আমি। জড়িয়ে ধরি বুকের মধ্যে।–”ভাইরে, কতদিন তোরে দেহিনা, চল তোর লগে দুইটা সুখদুঃখের কথা কই।” আমার গায়ে ঘামের বোটকা গন্ধ। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে। আমি ছাড়ি না। ধৃতরাষ্ট্রর বাঁধনে বুকে বেঁধে ওকে টেনে নিয়ে যাই আমার সাথে। মনে এবার সাহস ফিরে আসে। আর এখন বন্দুক ব্যবহার করা চলবে না। যতবড় দক্ষ নিশানাবাদ হোক নিজের লোককে জখম করার ঝুঁকি নিতে চাইবে না। ওকে টেনে প্রায় একশো গজ দুরে জমাদার কোয়ার্টারের কাছে নিয়ে গিয়ে বলি–তোর মনে আছে স্বপন, ভাদুড়িগো দেওয়ালে নকশাল লিখিছিলি? বলে সে–সে আমি তারপরদিনই জলপোচড়া দিয়ে পুছে দিয়েছি।
সে তো দেখতেই আছি। বলি আমি–তোরা লেখতেও পারোস পোছতেও পারোস। আমরা না জানি লেখতে, না পারি পোছতে।
জমাদার কোয়াটার বন্দুকের রেঞ্জের বাইরে। বলি স্বপনকে–এবার তুই যাঃ গিয়া। এরপর সামনে পা বাড়াই আমি। যখন আমার মনে হয় বিপদসীমার বাইরে এসে গেছি, আর কোন ভয় নেই, এবার নিরাপদে ফিরে যাওয়া যাবে তখনই পিছন থেকে আবার হুংকার–দাঁড়া। দেখি, যার কোমরে মেডইন চায়না সেই তাতা দত্ত এগিয়ে আসছে। তবে কী বানিয়ে বলা রোগের গল্পটা বুঝে ফেলেছে।
এখন এই মুহূর্তে বাঁচবার মাত্র একটা পথ খোলা আছে, জীবন আর মৃত্যুর মাঝে ব্যবধান আছে পঞ্চাশ কি ষাট গজ, সময় আছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। আর দু চার সেকেন্ডের মধ্যে তাতা দত্ত আমাকে রিভালবারের রেঞ্জের মধ্যে পেয়ে যাবে। দৌড়, এখন প্রাণপনে একটা দৌড় দিতে পারলে প্রাণটা বেঁচে যাবে। কিন্তু দৌড় দিতে গিয়ে আর দেওয়া গেল না। সামনের দিক থেকে একটা বিশাল পুলিশ বাহিনী এদিকে এগিয়ে আসছে। সহকর্মীর শোকে উন্মত্ত পুলিশের রাইফেল থেকে মুহুর্মুহু গুলি ছুটছে। ওরা আজ লাশগাদায় মানুষের স্তূপ দেখতে চায়। অপরাধ নিরপরাধ ওদের বিচার্য বিষয় নয়, শুধু চায় সংখ্যা। একের বদলে দশ।
তাতা দত্ত এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। এ হাত আগের মত কঠোর কঠিন নয়। নরম কোমল মোলায়েম। বললেন–শিগগির পিছন দিকে পালিয়ে চল।
পুলিশ দ্রুত এগিয়ে আসছে। ওদের সামনে একটা চেনবাধা কালো কুকুর। কুকুরই মানুষকে টেনে নিয়ে আসছে। আমরা পিছন দিকে ছুটতে শুরু করি। যেখান থেকে ভয় পেয়ে পালাতে চেয়েছিলাম, পরিস্থিতি আবার সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এরপর আমি তাতা দত্ত নানু আর স্বপন এ গলি সে গলি ধরে পৌঁছে যাই রাজাপুর খালধারে। সেখান থেকে ঢোলকমলি, কচুগাছ পার্থেনিয়াম জঙ্গল হোগলাবন সব ঠেলে গিয়ে আমি আনন্দ পরমানিকের ভেরির পাড়ে। এখানে একটা প্রাচীন বটবৃক্ষ আছে, চারজনে বসে পড়ি তার তলে।
.
এটা যাদবপুর বা কলকাতা নয়, সারা পশ্চিমবঙ্গ এখন এক গভীর সংকট জনক সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একটা ঘটনা এসে আছড়ে পড়ছে আর একটা ঘটনার উপর। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আর একটা। প্রথম ঘটনার ভয়ংকর অবস্থা চাপা পড়ে যাচ্ছে পরের ভয়াবহতার নিচে। রোজ খবরের কাগজ খুলে মানুষ দেখছে কোথাও পুলিশ নকশালদের খুন করেছে কোথাও নকশালরা পুলিশকে। কোথাও সি.পি.এম মেরেছে কংগ্রেসকে কোথাও কংগ্রেস সিপিএমকে। জেল ভেঙে নকশালরা পালাচ্ছে, আবার পালাতে না পারলে কারারক্ষীরা তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলছে। যতদূর মনে পড়ে এটা বোধহয় সেই সময় যখন ডায়মন্ডহারবারে পাওয়া গিয়েছিল এক জায়গায় বারোটা লাশ। বরাহনগর কাশীপুরে হয়েছিল গণ সংহার।
