এখন আমার চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠছেনিহত বন্ধুদের মুখগুলো।কত তাদের নাম। সব নাম এখন মনেও আসে না। কী যেন নাম তার যাকে কুচিকুচি করে কেটে বস্তায় ভরে হোগলা বনে কারা যেন ফেলে এসেছিল। সকাল হবার আগে অর্ধেকটা শেয়ালে খেয়ে যায়। অনেকদিন আগে অপরিণত আবেগে মনে একবার মৃত্যু বাসনা জেগেছিল। দুইপক্ষে ঘোরযুদ্ধ হবে। বুকে গুলি এসে লাগবে। দুই মিনিটে সব যন্ত্রণার উপশম। বন্ধুরা আমাকে কাঁধে করে বয়ে ঘাটিতে নিয়ে আসবে। আমার মৃতদেহ ছুঁয়ে শপথ নেবে-কমরেড আমরা তোমার রক্তের ঋণ রক্ত দিয়ে সোধ করর। কোথাও আমার একটা শহীদ বেদী হবে। জমায়েত জনতা শ্লোগান দেবে–অমর শহীদ লাল সেলাম। সে মৃত্যু কত না মহান। তখন মৃত্যুর এমন বিভৎসকদাকার, কষ্টদায়ক রূপ আমার দুরতম কল্পনাতেও ছিল না। আমাকে শেয়ালে শকুনে খাবে।
এখন আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল অনুভূতি ঢেউয়ের মত দৌড়ে বেড়াচ্ছে। নাভিকুন্ডলি, পায়ের পাতা, হাতের তালুতে অদ্ভুত একটা শিরশিরানি। উঁচু বাড়ির খোলা ছাদে দাঁড়ালে যেমন হয়। বুক বোঝাই আমার এখন এক মরুভূমির পিপাসা। আঃ আর কোনদিন আমার মা বাবা ভাই বোন কারও সাথে দেখা হবেনা। তারা নিশ্চয় আমার শেষ পরিণতির খবরটাও পাবে না। সেটা মন্দের ভালো। অকারণে তাদের কাঁদিয়ে কোন দরকার নেই। মা, মাগো। আমাকে ক্ষমা কোরো মা। তোমাদের কাছে অনেক ঋণী রয়ে গেলাম। দুধের ঋণ অনেক বড় ঋণ। তার বিনিময়ে কিছুই করা হল না।
সেই লোকটা আবার এসেছে। কী যেন নাম? বেনু সেন। যে এক মৃত্যু পথযাত্রীকে পানীয় পরিবেশ করে নিজের পরকালের ঝোলায় কিছু পুণ্য সঞ্চয় করে রাখতে চায়। বলে সে, এই যে, কোন কিছু চাই তো সময় থাকতে বল। মনে কোন শেষ আশা! খোকা এসে গেলে আর বলার সময় পাবি না। বলি, একটা বিড়ি দিবার পারেন! বিড়ি! বিড়ি তো আমি খাই না। দাঁড়া, তোকে একটা সিগারেট খাইয়ে দিই। বলে সে একটা চারমিনার এনে নিজের হাতে দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে দিয়ে আমার পাশে বসে বলে–বাড়িতে কে কে আছে? সে প্রশ্নের উত্তর শোনার পর জানতে চান, তুই বড়? বলি হ্যাঁ। আবার প্রশ্ন–বাবা কী করে? সে প্রশ্নের উত্তর শুনে নিদারুন বেদনায় মাথা ঝাঁকান তিনি-ছিঃ ছিঃ। এমন বোকার মত কাজ কেউ করে। বাপের বড় ছেলে তুই। কোথায় খেটেখুটে এনে মা বাপকে খাওয়াবি। তা না করে গেলি পাটি করতে!–ছিঃ গরিব লোকের কী এসব করা সাজে! রাজনীতি মানে রাজার নীতি। রাজ্য চালাবার নীতি। বুঝলি কিছু। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফের বলেন তিনি, যাকগে যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন আর আপশোষ করে কী করবি। ভগবানকে ডাক। সে-ই সবার মালিক।
লোকটা ভালো ভালো কথা বলছে তবু তাকে ভালো লাগছে না। তার উপদেশ সব আমার কাছে এখন অনাবশ্যক–অর্থহীন কথার কচকচানি। লোকটাকে আমার সাপের মত খল, শেয়ালের মত ধুর্ত বলে মনে হয়। আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখা জোড়া জোড়া ঠান্ডা চোখগুলো থেকে তার চোখ দুটোকে কিছু অন্যরকম বলে মনে হয়। সে যেন আয়োজিত এই নরমেধ যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত। সমস্ত ঘটনার কেন্দ্রে তার অনুতাপরহিত নির্বিকার উপস্থিতি।
অবশেষে সবার সব প্রতিক্ষার অবসান, এসে গেল সেই চরমক্ষণ। চারিদিকের জনসমুদায় চঞ্চল হয়ে উঠল। জনকণ্ঠে ধ্বনিত হল প্রবল উচ্ছ্বাস-খোকাদা আসছে। হাত পা সব শিথিল হয়ে গেল আমার। মাথার মধ্যে লাট্রর বনবন ঘূর্ণি। আর আমার কোন বোধশক্তি নেই। চেতনা অসাড়-নিষ্ক্রিয়। শিরা উপশিরা, ধমনিতে কোথাও কোন স্পন্দন নেই। সব যেন একসাথে হরতাল করে দিয়েছে। শব্দ, স্রেফ একটা শব্দের আঘাতে আমার মন-মস্তিষ্কের কোষে কোষে ধ্বস নেমে গেছে।
খোকাদা আসছে।
এখন আমি আমার ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহটা অগ্রিম দেখে নিতে পারছি। বাঁচবার অদম্য আকাঙ্খয় শেষ সময়ে আঁকড়ে ধরেছিলাম ঘাসমাটি। আমার দুই হাতের দশনখের মধ্যে এখন ঘাস রক্তের কাদা। শুকিয়ে কালচে মেরে যাওয়া রক্তের মধ্যে উল্টে পড়ে থাকা শরীরটা মাছিতে চাটছে। কাক খোবলাচ্ছে। আমার ঠেলে বের হওয়া চোখ দুটো শেষ দৃশ্য দেখবার পরেও, আরও কিছু দেখবে বলে বিস্ফারিত হয়ে আছে।
খোকাদা এসে গেলেন।
এখন আমি অবাক। এ কোন খোকাদা! এই খোকাদা তো কামারপাড়ার সেই কুড়ি কান্ডের মহানায়ক নন! এই খোকাদা খোকা চক্রবর্তী বিজয়গড়ে থাকেন। বর্তমানে পাড়া থেকে পলাতক। আছে কামারপাড়ার সেন্টারে। ইনি সি.পি.এম পার্টির এক উঁচুদরের নেতা। শোনা ছিল আমার, এই খোকাদা কামারপাড়ার খোকার মত নিষ্ঠুর প্রকৃতির নয়। এনার একটা নরম কোমল দরদিমন আছে। আছে কী?তাহলে একবার একটা শেষ চেষ্টা করে দেখাই যাক। বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়ালাম আমি। খোকা চক্রবর্তী আমার কাছে আসবে তার আগেই আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম তার সামনে–”খোকাদা আমারে বাঁচান। আমারে মাইরা ফালাবে বইল্যা ধইরা নিয়া আইছে।” থোকা চক্রবর্তী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দুপা পিছনে সরে গেলেন–”এ্যাই, এ্যাই, কেডারে তুই”!–আইজ্ঞা আমি এ্যাক টিবি রুগী। রোগ চিকিচ্ছার জইন্য হাসপাতালে আইছিলাম। এনারা আমারে ধরছে।
খোকা চক্রবর্তী বেশ মনোযোগ সহকারে আগাপাস্তালা দেখলেন আমাকে। গায়ে আমার ময়লা একটা ছেঁড়া গেঞ্জি। নিচে আন্ডারওয়ারের উপর জড়ানো একটা গামছা। মাথায় তেলহীন রুক্ষ চুল। খালি পা। চোখের কোণে পিচুটি। অনাহারী পেট। অতিকষ্টে নিঃশ্বাসটানা, হাড় বের করা নির্জীব বুকের খাঁচা।
