দম এখন যেন বন্ধ হয়ে আসছে আমার। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। চোখ ঘোলা ঘোলা হয়ে আসছে, ঝাপসা দেখাচ্ছে চারদিক। ঘুরপাক খাওয়া মানুষদের কেমন যেন প্রেতপুরির ছায়া মানুষ বলে মনে হচ্ছে। কান আর মাথার মধ্যে আঁ আঁ করছে। যেন বেসুরে ভেপু বাজাচ্ছে কেউ। চারপাশের লোকজন, মাথার উপরের নীল আকাশ উজ্জ্বল রোদ, সবুজ গাছপালা সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমি যেন কোন দ্বীপে পৌঁছে গেছি। আমার চারপাশে বৃত্ত করে বসে আছে হায়না চিতা সাপ বাঘ। এখানে আমার আপনজন কেউ নেই।
এক সময় মনে হয় আমি মারা গেছি। জাগতিক যাবতীয় হিসাব নিকাশ–সব চাওয়া পাওয়া বন্ধুত্ব বৈরিতা নিচে ফেলে দেহমুক্ত আত্মা এখন মহাশূন্যে উড়ে গেছে। নিচে যে আমি বসে আছে সে বহুকাল আগে মরে যাওয়া “আমির” মৃত শরীরটাকে মমি করে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
একজন একটা দোনলা বন্দুকেদুটো এল.জি.কার্তুজ ভরে সেটা রাস্তার ওপাশে এক গ্যারাজের লোহার দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। তাহলে কী আমাকে গুলি করে মারবার সিদ্ধান্ত হয়েছে? বর্তমান দুর্মুল্যের বাজারে এক একটা গুলির কত দাম। ওরা কী আমার প্রতি এতটা সদয় উদার হবে? যদি হয়, সেটা খুবই উত্তম। গলা কাটা, পেট চিরে ফেলা, সাপের মত পিটিয়ে পিটিয়ে মারা, ইট দিয়ে থেত করা–এসবের চাইতে সেটা উভয় পক্ষেরই আরামদায়ক। এতে সময় এবং শ্রম দুটোরই সাশ্রয় হবে।
–এ্যাই ছোঁকড়া কী যেন নাম তোর। চা খাবি? বড় নরম বড় মোলায়েম গলায় একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, খাবি চা? লোকটার দিকে এক অবুঝ চোখে তাকিয়ে থাকি আমি। আমাকে চা খাওয়াবে। কিন্তু কেন? আমি তো তার কোন পূর্ব পরিচিত কেউ নই। তবে?
লোকটার পরিধানে পরিষ্কার ধুতি, পাঞ্জাবি। বয়স বছর চল্লিশ। ফরসা গোলগাল, কাপড়ের দোকানের মালিকের মতো চেহারা। আমি মাথা নাড়ি-না। সে নাছোড়–চা খাবি না! বেশ, তবে এক গেলাস দুধজল খা। তা-ও খাবি না! তবে কী খাবি? ডাব এনে দিই একটা?
এই লোকটার নাম ধরে নিচ্ছি বেনু সেন। একজন এসে তাকে থামাতে চায়-আঃ বেনুদা কেন ফালতু ওকে ডিসটার্ব করছ। হাসে বেনু নামের নোকটা–না মানে, ওকে একটু জলটল খাওয়াতাম। আফটার অল আমরা তো হিন্দু। শাস্ত্রে আছে মৃত্যুপথযাত্রীকে জলদান খুবই পুণ্যের কাজ। বলে সেইজন–তুমি এ সব মানো! জোর দিয়ে বলে বেনু সেন–নিশ্চয়! হাজার হাজার বছর এসব রয়েছে। তন্ত্র শাস্ত্র বলে একটা জিনিস আছে। জানিস তন্ত্রের কী অসীম শক্তি? যদি পারিস শনি কিংবা মঙ্গলবারে অপঘাতে মরা চণ্ডালের বুকের একখানা হাড় নিয়ে আয়। তারপর দেখবি।
আজ কি বার! শনি না মঙ্গল! তাহলে আর কোনভাবে আমার অপমৃত্যু রোধ করা যাবে না। আমি নমঃশূদ্র, যাদের আগে চণ্ডাল বলা হোত। আমার বুকের হাড় যে বহুমূল্য বস্তু।
মোহিত বর্মন এসেছে এখন। মোহিত বর্মন খোকা দাসের ঘনিষ্ট সহযোগী। সহযোগী, নাকি ওই “কুড়িকাণ্ডের” রেকর্ড ভেঙে দেবার প্রবল প্রতিযোগী। এ যেন ব্র্যাডম্যান আর ও শচীন তেন্ডুলকার। ও বলে আমি গ্রেটেস্ট এ বলে আমি।
মোহিত বর্মনের হাতে একগোছা ইলেকট্রিকের সরু তার। যার একমাথায় ঝুলছেডিটোনেটর। সে একবার আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নেয়। দৃষ্টিতে কোন দাহ দ্বেষ নেই, আছে সুমহান কর্তব্যের কঠিন দৃঢ়তা। দয়া মায়া স্নেহভালোবাসা এসব বড় কোমল অনুভূতি। পাছে কোন কোমলতা তাকে ছুঁয়ে দ্যায়, দুর্বল মনের বলে বদনাম রটে যায় তাই নিজের চারপাশে তৈরি করে রেখেছে একটা বিভৎসতার অদৃশ্য বলয়। যে কারণে মানুষ মারতে প্রচলিত অস্ত্রের ব্যবহার সে খুব একটা পছন্দ করে না। শোনা যায় কাকে যেন বস্তায় ঢুকিয়ে প্রচুর সময় নিয়ে ইট দিয়ে থেঁতলে মেরেছিল। কার যেন মাথার তালুতে ঢুকিয়ে দিয়েছিল আস্ত একটা গুজাল। কার যেন গলার নলি দাঁত দিয়ে কামড়ে ছিঁড়েছিল।
মোহিত বর্মনের চোখ দুটো এখন আলোহীন-আধবোজা-ইসমাইল কসাইয়ের চোখের মত। যে সকাল বেলা খোয়াড় খুলে ভেড়া ছাগল গুলোর দিকে নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর একটাকে টেনে এনে গলার নলিতে চাকুর পোঁচ মারে। এটা তার নিত্যকর্ম। এবং সে জানে এটা কোনমতেই হত্যা নয়। আল্লাহ তাকে এই কাজ করবার জন্যই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। যার যা কাজ সেটা করাই আল্লার কাজ করা।
নিজের কাজ করবার জন্য মোহিত বর্মনের আর তর সইছে না। বলে-ফালতু ফালতু দেরি করে কী হচ্ছে। এটাকে নিয়ে নারকেল গাছে বাধা ডিটোনেটরটা পেটে বেধে বাস্ট করে দিই। একজন বলে–খোকাদাকে খবর দেওয়া হয়েছে। সে না এলে। মোহিত বর্মন বিরক্ত–তোরা পারিসও। সব কথা খোকার কানে দেবার কী দরকার। নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে শেখ। ফালতু দেরি হয়ে যাচ্ছে। স্টেশনে রাইফেল ছিনতাই হয়ে গেছে। এদিকেও পুলিশ রেড করতে পারে। তখন লাশ লুকানো সমস্যা হবে।
রোদ বাড়ছে। সুর্য প্রায় মাথার উপরে উঠে গেছে। সারা শরীর রোদের তাপে জ্বলে যাচ্ছে আমার। শরীরের প্রতিটা লোমকুপ থেকে কলের জলের মত ঘাম গড়াচ্ছে। গায়ের ময়লা ছেঁড়া গেঞ্জিটা ভিজে জবজবে। নাক মুখ থেকে ছুটছে গরম হলকা। চারপাশের দৃশ্যপট দুলছে। বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি পড়ার শব্দ–টিপ টিপ টিপ টিপ। যেন পাথর ভাঙছে কেউ। নিম্নাঙ্গ কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে। চোখ দুটো জ্বালা জ্বালা করছে। একটা মরা গাছের ডালে বসে একটা কাক বড় কর্কশ গলায় ডাকছে খাঃ খাঃ খাঃ খাঃ খাঃ। ওরা নাকি মৃতের ঘ্রাণ পায়। তবে কী খবর পেয়ে গেছে এখানে একটা মহাভোজের আয়োজন চলছে।
