আমি এখন এক এক পা টেনে এগিয়ে চলেছি, মাথায় কাটার মুকুট কাঁধে ক্রুশকাঠ নিয়ে হেঁটে চলা যিশুখৃষ্টের মতো। চারদিক তাকিয়ে কাতর চোখে দেখে নিচ্ছি আকাশ সূর্য রোদ মাটি মানুষ। যা আর কোনদিন দেখার সুযোগ পাবো না। এই পৃথিবী নিষ্ঠুর নির্দয় পৃথিবী অনাহার অপমান অত্যাচার ছাড়া আমাকে আর কিছুই দেয়নি। তবু একে ছেড়ে যেতে বড় কষ্ট হচ্ছে। এই পৃথিবীর এককোণে বাস করে আমার বাবা মা ভাই বোন। যাদের প্রতি আমার অনেক দায়িত্ব কর্তব্য ছিল। তার কিছুই পালন করা হলো না।
কামারপাড়ার কার্লভাটের উপর এখন গিজগিজ করছে তোক। তাদের সংখ্যা অনেক। কেউই তারা স্থির নয়, উত্তেজনায় সব ছটফট করছে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে–দেড় দুশো গুলির আওয়াজ। নানা এলাকা থেকে যা তাদের টেনে নিয়ে এসেছে মূল ঘাটিতে। এত গুলিগোলা চলছে কেন। তবে কী জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূলঘাটি, দক্ষিণবঙ্গের লেলিনগ্রাদ, কামারপাড়া বিপন্ন। প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস দ্বারা আক্রান্ত! সব এখন রণসাজে সজ্জিত। তেমন হলে শেষ সংগ্রাম হবে এই মাটিতে। শত্রুপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে–এ মাটি দুর্জয়ঘাটি। এখানে দাঁত বসাতে গেলে দাঁত ভেঙে যাবে।
খবর এসে গেছে এই কিছুক্ষণ আগে। না, সে সব কিছু নয়। এতে আমাদের খুব একটা ভয়ের কিছু নেই। এটা হচ্ছে নকশাল আর পুলিশের ব্যাপার। আমরা নিরাপদ। তবে পাশের ঘরে আগুন লাগলে একটু তাপ তো লাগেই। সেই জন্য সতর্কতার প্রয়োজন আছে।
আমাকে দেখে এখন এখানকার বেশ কয়েকজনের চোখ ছানাবড়া। ওরা যে আমাকে চেনে। সেই চিনে ফেলাটাই আর লক্ষে বড় বিপদের। আরে তুই। বস বস ওইখানে।
কালর্ভাটের পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। জ্বলছে কয়লার উনুন। দোকানদারের ভাবলেশহীন পাথর পাথর মুখ। সে জল ঢেলে চায়ের গেলাস ধুচ্ছে। গেলাসে চিনি দিচ্ছে। ছাঁকনিতে গুড়ো চা পাতা ফেলে তার উপর গরম জল ঢালছে। তারপর এক হাতে চায়ের গেলাস খদ্দেরের দিকে এগিয়ে দিয়ে অন্য হাতে উনুনের পাশে রাখা ডজন খানেক থ্রি নট থ্রি বুলেট নেড়েচেড়ে গরম করছে। এ সব অতি স্বাভাবিক, রুটিন মাফিক ব্যাপার। দোকানদার পার্টির জঙ্গি কমরেড়। তার কাছে রুটি কাটা আর গলা কাটায় কোন প্রভেদ নেই। দুটোতেই সে সমান দক্ষ।
যারা আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে, তাদের কাজ শেষ। পুলিশ অপরাধীকে ধরে কোর্টে নিয়ে এসেছে। এখন যা করার তা বিচারপতি করবে। জহাদ করবে। তাতা দত্ত আর নানু দাস দু জনে এখন পরম নিশ্চিন্তে বসে লেবু চা খাচ্ছে। তারা বসে আছে রাস্তার ওপারে এক বিল্ডিংয়ের ছায়ায়। আমাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে চচঁড়ে রোদে এপারের চা দোকানের বেঞ্চিতে। আমার সামনে পিছনে সচেতন জনগণের জমায়েত। আমি এক যুদ্ধপরাধী। আমার সাজা কী হবে সে মোটামুটি সবারই জানা। এ বিষয়ে বিচারক, জুরি, এবং জনগণের কোন মতভেদ নেই। মতভেদ হচ্ছে দণ্ড কার্যকর করবার পদ্ধতির বিষয়ে। এখানে মারা হবে না অন্য কোনখানে নিয়ে, এখন মারা হবে, না, রাতে, গলার নলিকাটা হবে না কী গুলি করা হবে, ছোট ছোট ভাগ হয়ে তারা সেই আলোচনা করছে।
কে কী বলছে আমার শোনার কথা নয়। শুনে বা আমি কী করতে পারি। মাংসের দোকানের খুঁটীতে বাঁধা পাঠা তো দেখে, পাঠাকে কী করা হয়। তাকে কী করা হবে। সব জেনে বুঝে তার কী বা করার থাকে? আমি তো যখনই ধরা পড়েছি তখনই বুঝে গেছি কামারপাড়ায় আমাকে কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু কি করার ছিল আমার? একে তো আমাশায় আক্রান্ত অসুস্থ শরীর। তার উপর অনাহারে দুর্বল। শস্ত্রধারী দুজন সবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কী করে লড়াই করে জয় পেতাম।
এখন আমার ভয় করছে। সারা বুক জুড়ে হিমশীতল এক আতঙ্কের নিঃশব্দ চলাচল। ওরা যদি এতক্ষণ আমাকে চড় ঘুষি লাঠি চালাত তাহলে শরীরের কষ্ট হোত কিন্তু ভয় করত না। ওই সব ক্রিয়ার দ্বারা ওদের ক্রোধ খানিকটা নির্গত হয়ে গেলে আমার বেঁচে যাবার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল। ওরা তা করছে না। সব ক্রোধ রাগ আগলে রেখে দিয়েছে মোক্ষম মার দেবে বলে। এটাই ভয়ের। খুবই ভয়ের। যার অপরাধ অতি অল্প তাকে মেরে মেরে আধমরা করে দেওয়া হয়। যার অপরাধ বিশিষ্ট শ্রেণির তাকে মারা হয় অতি বিশিষ্ট মার–মৃত্যু।
এক একজন এসে আমার আগাপস্তলা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। কেউ কোন কথা বলছে না, কিছু জিজ্ঞাসা করছে না। শুধু নির্মম নির্নিমেষ দৃষ্টি দিয়ে আমাকে দেখে চলে যাচ্ছে।
কত দেরি? কে যেন কাকে জিজ্ঞাসা করে। জবাব দেয় সেখোকা দা এসে গেলেই। আবার প্রশ্ন–কখন আসবে? জবাব–খবর তো অনেকক্ষণ আগে পাঠানো হয়েছে।
তাহলে আর কিছুক্ষণ থেকে দেখেই যাই কী বল?
খোকাদা মানে খোকা দাস। কামারপাড়ায় সেনাদলের সর্বাধিনায়ক। লোকে বলে সে নাকি এককুড়ি খুন করেছে। আঙ্গুলিমাল-এর মত সে যাকে মারে, প্রাণেই মারে। মানুষ মারা তার প্রিয় খেলা। ছুরিচাকু নাকি তার হাতে শিল্পীর তুলির মতো সাবলীলভাবে চলে। চোখের পলক পরার আগে পেট চিরে দ্যায়, নলি কেটে দ্যায়। সে এলেই আমার হয়ে যাবে। যতক্ষণ সে না আসে আমার পরমায়ু ততক্ষণ। আঃ। বেঁচে থাকার এমন অতলান্তিক আনন্দ এমন অনিঃশেষ স্বাদ, এক একটা নিঃশ্বাস যে এত মূল্যবান, আরাম দেয়, আগে কোনদিন এমনভাবে জানা হয়নি। এর জন্য এখন খুব মায়া হচ্ছে।
