কিছুক্ষণ পরে জানতে পারলাম ফুটবল খেলবার ছলে দশবারো জনের একটা দল আক্রমণ করে পুলিশ ক্যাম্পে। দরজায় একজন রাইফেলধারী পুলিশ পাহারায় ছিল, অন্যরা ছিল ভিতরে শোয়া। সেইসময় ওরা অতর্কিত হামলা করে তিনখানা রাইফেল একটা রিভালবার নিয়ে পালিয়েছে। যারা বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল সব আহত, নিহত।
যখন এইসব ব্যাপার ঘটছিল তখন সোনারপুর জি.আর.পির চার কনস্টেবল পেট্রোল ডিউটি সেরে ট্রেন ধরে সোনারপুরে ফিরে যাবে বলে এসে বসেছিল দু নাম্বার প্লাটফর্মে। তাদের চোখে পড়ে একদল ছেলে রাইফেল নিয়ে পালাচ্ছে। তারা তখন এলোপাথারি গুলি চালিয়ে বাধা দেবার একটা চেষ্টা করে। তবে সফল হতে পারেনি। তাদের ছোঁড়া একটু এসে লেগেছে নিরীহ বিজয়ের পেটে।
এরপর যা হবে তা কারও অজানা নয়। একটা বিশাল পুলিশ বাহিনী আসবে। চারদিক থেকে ঘিরে ধরে হৃত অস্ত্রের সন্ধানে শুরু হবে চিরুনি তল্লাশি। হবে ব্যাপক ধরপাকড়। সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই চালিয়ে দেবে গুলি। কত যে মরবে কত যে আধমরা হবে তা কে জানে। ইতিমধ্যেই যাদবপুর থানা থেকে কিছু পুলিশ এখানে পৌঁছে গেছে। তারা তাদের সীমিত ক্ষমতায় সেই কাজ শুরুও করে দিয়েছে। প্রথম ধাক্কায় সন্ধ্যা বাজারের “রাতকানা জ্যোতে” শেষ। রেল লাইনে পাড়ে ঢোলকমলি ঝোপে পায়খানায় বসেছিল। পুলিশের মনে হয় লুকানো নকশাল। তাই গুলি চালায়। এতক্ষণ আমি রিকশার আড়ালে, বটগাছের পিছনে, জলের ট্যাঙ্কের পাশে নানাভাবে নিজেকে রক্ষা করেছি। বড় বাহিনী এসে গেলে আর তা পারা যাবে না। এখনই এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কোনদিকে পালাব তার কোন দিশা যে নেই। এক পালানো যায় পালবাজার সেলিমপুরের দিকে। কিন্তু নকশাল ছেলেরা সব সেইদিকে গেছে। পুলিশ তো ওইদিকে ধাওয়া করবে। আর এক যাওয়া যায় সন্তোষপুরের দিকে। কিন্তু সেদিকে যাব কেমন করে। একটা পুলিশ বাহিনী ওদিকে গিয়ে গুলি চালাচ্ছে। জ্যোতের পরে রাজাপুরের তপন শেষ। আর একটা পথ আছে স্টেশন রোড ধরে যাদবপুর মোড়ে গিয়ে বিজয়গড়ে ঢুকে পড়া। কিন্তু এখনই যদি সেই বড় বাহিনী আসে, আসবে তো ওইদিক থেকেই। যদি সামনে পড়ে যাই, যদি চিনে ফেলে, যদি কেউ আমাকে চিনিয়ে দেয়, তখন কী হবে?
আর একটা পথ আছে, টিবি হাসপাতালের যে দেওয়াল, স্টেশনের দিকে তার কিছুটা ভাঙা। সেই ফোকর গলে হাসপাতালের মধ্যে ঢুকে পড়া। এরপর হাসপাতালের সেকেন্ড গেট থেকে বের হয়ে রাজা সুবোধ মল্লিক রোড় পার হয়ে সেন্ট্রাল রোডে গিয়ে কোথাও ঘাপটি মেরে থাকা।
এই পরিকল্পনা করে ঢুকেছিলাম হাসপাতালের মধ্যে। কিন্তু সেকেন্ড গেটে আর পৌঁছাতে পারলাম না। হাসপাতালের মেইন গেট থেকে শুরু হয়ে কামারপাড়া পর্যন্ত পৌঁছানোর যে রাস্তা সেটা পার হয়ে এপারে এসে সেকেন্ড গেটের দিকে বাঁক নিতেই হুংকার-হল্ট। হাত উপরে তোল। পালাবার চেষ্টা করেছিস কী মাথার খুলি উড়িয়ে দেব। একজন বলেছিল কামারপাড়া ছাড়া আর কোথাও কোন সি.পি.এম নেই। আমার বোঝা উচিৎ ছিল যে তারা মাঝে মাঝে গুহা ছেড়ে শিকারে বের হয়।
মেইনগেট থেকে আসা আর সেকেন্ড গেটে যাওয়ার সংযোগস্থলের বাঁদিকে একটা ক্যান্টিন, তার পাশে আছে হাসপাতাল কর্মচারী ইউনিয়ন অফিস। আর আছে কিছু আম কদম সেগুন গাছ। কিছু আকন্দ ঝোঁপ ঢোলকমলি আর ঝাটি গাছের ঝোঁপঝাড়। সেই ঝোঁপের আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছে দু দুটো মূর্তি। যাদের দেখে পা দুটো অবশ হয়ে গেল আমার, গেথে গেল মাটিতে। ওরা এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল। তখন পিঠের উপর অনুভূত হল একটা ধাতব নলের কঠিন স্পর্শ। ওই রকম আর একটা কুঁচকুচে কালো নল ঠেকে গেল বুকে। যার ছয়টা ছিদ্র থেকে উঁকি দিচ্ছে ছয়টা বিষাক্ত দাঁত। যা এক তর্জনির ইশারায় যে কোন মুহূর্তে দংশন করে দেবে আমার বুকের হাড়মাংসে।
এই দুই মুর্তি আমার চেনা। এর একজন তাতা দত্ত আর একজন নানু দাস। এরা দুজনও আমাকে চেনে। সে চেনা শব্দের, আগুন বারুদ আর রক্তের। এরা রণসাজে সেজে আসত স্টেশনের এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মে, আমরা আসতাম দুনাম্বারে। রেল লাইনকে মাঝখানে রেখে দুদিকে দাঁড়িয়ে আমরা একে অপরকে অকথ্য গালাগালি দিতাম, বোমাগুলি ছুড়তাম। এবং দু পক্ষই ভাবতাম বিপ্লব করছি।
তাতা দত্ত আমার পিছনে রিভলবারের গুতো দিয়ে হুকুম দিল, কামারপাড়ায় চল।
কামারপাড়া। এ কোন একটি পাড়ার নাম নয়। একটা ঘাটি, একটা বিশেষ ধরনের লোকদের দ্বারা পরিপূর্ণ স্থান। একটা পরিকল্পিত কার্যক্রম। এ এমন এক নাম যা অতি বড় সাহসীর বুকেও কাঁপন ধরিয়ে দেয়। সারা অঞ্চল দখল করে নিয়েছে তবু এত পুলিশ সি.আর.পি নিয়েও কংগ্রেসিরা এ পাড়ায় ত্রিসীমানায় আসার চেষ্টা করেনি। প্রবাদ আছে, কামারপাড়ায় যে আসে হেঁটে ফিরে যায় খাটে। এখন আমাকে সেই পাড়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
টিবি হাসপাতাল থেকে কামারপাড়ার কার্লভাট মাত্র এক কিলোমিটার পথ। এই পথটা কী আমি সেদিন হেঁটে যেতে পেরেছিলাম? যে হেঁটে গিয়েছিল সে কী আমি? অনেক দিনের অনাহারী অর্ধমৃত অবশ অচৈতন্য একটা দেহ যেন ছ্যাচড়াতে ছ্যাচড়াতে পার হয়ে এসেছিল জীবনের সব চেয়ে দুর্গম কঠিন পথ। যেভাবে ভোর বেলায় কসাইখানার পথে হেঁটে যেতে দেখা যায় বুড়ো, আধমরা জীর্ণশীর্ণ গরুর পাল। ধুলিধূসর দেহকে অতিকষ্টে টেনে টেনে সামনে আগায়। প্রতি পদক্ষেপে যার ঝরে ঝরে পড়ে সীমাহীন ক্লান্তি-অবসাদ। যার প্রতিটা পদক্ষেপে জীবন থেকে খসে খসে যায় বেঁচে থাকার মেয়াদ।কতরাত কতদিন যে সে এইভাবে কত পথ পার হয়ে এসেছে, কতপথ আর যে বাকি সে তার কোন হিসেব জানে না। ঘোলা চোখে চারদিকে তাকায় আর কেবল হাঁটে। অবসন্ন শরীরটা পথের ধুলোর উপর লুটিয়ে পড়তে চায়। পা যেন আর শরীরের ভার বইতে পারছে না। তবু উপায় নেই, হাঁটতেই হয়। চলার গতি সামান্য শ্লথ হলেই পিঠের উপর আঘাত হানে ক্রুদ্ধ কসাইয়ের নিমর্ম লাঠিচল্ চল্ হেট হেটু। গরুর মুখ থেকে গাঁজলা গালের কষ বেয়ে গড়িয়ে নামে। জল আর পিচুটি ভরা চোখের কোণ খোঁচায় ডাশ মাছি। শরীরের ক্ষত খোবলায় আঁড়িপাতাকাক। লেজ তুলে সেকাউকে ঝাঁপটাও মারতে পারেনা–শরীর এতশক্তিহীন। তবু হাঁটতে হয়। নিজের জীবনকে নিজে বয়ে নিয়ে যেতে হয় বধ্যভূমির দিকে।
